মেইন ম্যেনু

হঠাৎ করেই ছেলে হয়ে যায় যে গ্রামের মেয়েরা

জনি একজন পুরুষ-শারীরিক ও মানসিক সবদিক থেকেই তিনি লম্বা চওড়া দশাসই একজন পুরুষ। কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে, ১২ বছর পর্যন্ত তিনি কিন্তু মেয়ে হয়েই ছিলেন। তার কোনো পুরুষাঙ্গ ছিল না।

ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জের দেশ ডোমেনিকা প্রজাতন্ত্র। এখানকার দক্ষিণপশ্চিমাঞ্চলীয় অঞ্চলের একটি বিচ্ছিন্ন গ্রাম সালিনাসে অদ্ভূত এক ঘটনা ঘটে। সেখানকার মেয়েরা একটা নির্দিষ্ট বয়সে এসে ছেলে হয়ে যায়। যেমনটি হয়েছিল জনির বেলায়। শারীরিক এবং মানসিকভাবে তিনি জন্ম নিয়েছিলেন মেয়ে হয়েই। কিন্তু কৈশোরে অবতীর্ণ হওয়ার পর শেষ পর্যন্ত তিনি ছেলেতে পরিণত হন।

ওই এলাকার লোকজনের জন্য এটি কোনো ব্যাতিক্রমী ঘটনা নয়। কেননা সালিনাসি গ্রামে ১২ বছর বয়সে এসে অনেক ছেলেই মেয়ে হয়েছে। কাজেই এ নিয়ে সেখানে কেউ কৌতূহল দেখায়নি। যেন, ১২ বছর বয়স হলেই গ্রামের কোনো কোনো মেয়ে ছেলে হয়ে যাবে-তাদের জন্য এটাই যেন স্বাভাবিক ঘটনা।

বছরের জনির আগের নাম ছিল ফেলেসিশিয়া। আদরের মেয়েটিকে তার বাব-মা এ নামেই ডাকতেন। বিবিসি-২’কে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বলছিলেন জনি। ‘কাউন্টডাউন টু লাইফ-দা এক্সট্রা অর্ডিনারি মেকিং অব ইউ’ নামক প্রোগ্রামে তিনি জানান,‘আমার বেশ মনে আছে আমি তখন ছোট ছোট লাল রংয়ের ফ্রক পরতাম। আমার জন্ম হয়েছিল বাড়িতে। যদিও জন্মের সময় আমার লিঙ্গ কি ছিল তা আমার জানা নেই।’

‘আমি স্কার্ট পড়ে স্কুলে যেতাম। যদিও মেয়েদের পোশাক আমার একদম পছন্দ ছিল না। আমার জন্য মেয়েদের খেলনা আনা হত। কিন্তু ওগুলো দিয়ে আমার খেলতে ইচ্ছে হত না। আমি ছেলেদের সঙ্গে খেলতে চাইতাম।’ একনাগাড়ে বলে চলেন জনি।

শিশু গর্ভে থাকা অবস্থায় একটি বিরল প্রজনন সমস্যার কারণে এনজাইম নামের এক জৈবিক অনুর ঘাটতি দেখা দেয়। ফলে গর্ভের শিশুর পুরুষ হরমোন গঠনে বিঘ্নতা তৈরি হয়। যার কারণে ছেলে শিশুটির পুরুষাঙ্গ যথাসময়ে তৈরি হয়না। গর্ভের শিশুটি ছেলে বা মেয়ে যাই হউক না কেন, সবারই গোনাডস নামের একটি আভ্যন্তরীণ গ্রন্থি থাকে। এটি থাকে তাদের দু পায়ের মধ্যবর্তী স্থানে। পিণ্ড আকৃতির এই গ্রন্থটির নাম টুবারসেল। গর্ভের ‘ওয়াই’ ক্রমোজম বহনকারী শিশুটি ছেলে হলে ওই পিণ্ডটি বড় হয় এবং একসময় পুরুষাঙ্গের রূপ নেয়। আর মেয়ে শিশুদের ক্ষেত্রে এটি নারী অঙ্গে অর্থাৎ ভগাঙ্কুরে পরিণত হয়।

তবে কিছু ‍কিছু ছেলে শিশুর এনজাইম ঠিকমত বাড়ে না। ফলে তাদের দেহে লিঙ্গ থাকেনা। তারা মেয়ে হিসেবে জন্ম নেয়। পরে কিশোর বয়সে তাদের শরীরে হঠাৎ করেই পুরুষ লক্ষণ জাগ্রত হতে তাকে। অর্থাৎ মার্তৃগর্ভের বৃদ্ধিটাই ১২ বছর পরে সম্পন্ন হয়। তখন নতুন করে পুরুষাঙ্গ তৈরি হয় এবং গলার স্বরভঙ্গ হয়।

অবশ্য জনির পুরুষাঙ্গ দেখা দেয় সাত বছর বয়সে। তিনি দাবি করেন, শৈশবে তাকে মেয়েদের মত করে বড় করা হলেও তিনি নিজেকে কখনো মেয়ে ভাবতে পারেননি। অবশেষে শরীরে পুরুষের চিহ্ণ দেখা দেয়ার পর তিনি হাফ ছেড়ে বাঁচেন। এখন তিনি নিজের এই লিঙ্গ পরিবর্তন নিয়ে আনন্দেই আছে।

সম্প্রতি সালিনাসি গ্রামের কারলা নামের নয় বছরের এক মেয়ে পুরুষ হয়ে গেছে। তাকেও তার বাবা-মা মেয়ের মত করেই বড় করেছিলেন। তার মা একসময় লক্ষ্য করেন, তার পাঁচ বছরের মেয়েটি কেমন যেন, ছেলেদের সঙ্গে খেলতেই বেশি পছন্দ করে। এখন সে পুরোপুরি একজন বালক। তবে সে তার নাম বদলায়নি। অনেক মেয়েই লিঙ্গ পরিবর্তন হওয়ার পরেও আগের নামেই থেকে যান। এ কারণে সালিনাস গ্রামে আপনি ‘ক্রাথেরিন’ নামে অনেক পুরুষ দেখতে পাবেন। বাবামায়ের দেয়া নাম পুরনো পোশাকের মতই বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছেন তারা।

সেখানকার লিঙ্গজনিত জটিলতাটি প্রথম আবিষ্কার করেছিলেন কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের হরমোন বিশেষজ্ঞ ড. জুলিয়ানে ইম্পেরাটো। তিনি মেয়েদের ছেলে হয়ে যাওয়ার গুজবটা আগেই শুনেছিলেন। সত্তর দশকে ডোমেনিকা প্রজাতন্ত্রে ভ্রমণ করে তিনি এ বিষয়ে নিশ্চিত হন। পপুয়া নিউগিনিতেও এ ধরনের লিঙ্গ পরিবর্তনের ঘটনা দেখা যায়। ড. মোসলে বলেন,‘কৈশোরের বয়ঃসন্ধির সময়টি আমার কাছে খুবই বিরক্তিকর ছিল। স্বর ভেঙে যাওয়া নিয়ে বড় ভাইয়েরা আমায় খুব খেপাত। কিন্তু জনির সঙ্গে তুলনা করলে একে তো সাধারণই মনে হয়।’

এই মেয়েদের ছেলে হয়ে যাওয়া রোগটির ইংরেজি নাম গুয়েভেডোকস। এ রোগটিকে কখনো কখনো মাচিহেম্ব্রাস নামেও উল্লেখ করা হয়ে থাকে যার অর্থ ‘প্রথমে মেয়ে পরে ছেলে’। ড. ইম্পেরাটো গুয়েভেডোকস রোগটি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা চালিয়েছেন। গবেষণায় দেখা গেছে, জন্মের সময় পুরুষ জেনিটালিয়ার অভাবে এ ধরনের সমস্যা দেখা দেয়। ওই বিরল প্রজনন সমস্যার কারণে এনজাইম নামের এক জৈবিক অনুর ঘাটতি দেখা দেয়। ফলে গর্ভের শিশুর পুরুষ হরমোন গঠনে বিঘ্নতা তৈরি হয়। তার এই গবেষণার ওপর ভিত্তি করে আমেরিকার বৃহৎ ওষুধ কোম্পানি একটি নতুন স্টেরাইড ওষুধ বের করেছে যা শিশুর দেহে ৫-এ হ্রাস কমায়। এই ওষুধটি এখন ব্যাপক আকারে ব্যবহৃত হচ্ছে। ড. ইম্পেরাটো মনে করছেন, এটি ব্যবহারের ফলে কোনো পুরুষ আর মেয়ে হয়ে জন্ম নেবে না।

সালিনাস গ্রামের প্রতি ৯০টি শিশুর একজন এই গুয়েভেডোকস সমস্যার শিকার হয়ে থাকে। তারা দেখতে মেয়ে হলেও আদতে তারা পুরুষ। যদিও তাদের মুখে দাঁড়ি গোফ তুলনামূলক কম এবং প্রস্টেট গ্রন্থিও গড়পড়তা পুরুষদের তুলনায় অনেক কম থাকে। তবে যোগাযোগের দিক থেকে কিছুটা বিচ্ছিন্ন হওয়ায় ডোমেনিকার এই গ্রামটির লোকজন এখনো এই অসুস্থতা সম্পর্কে কমই জানে। এজন্য তারা মানুষকে তিনটি লিঙ্গে ভাগ করে থাকে পুরুষ, নারী এবং নারীরুপী পুরুষ।

দ্য টেলিগ্রাফ অবলম্বনে