মেইন ম্যেনু

ঢাকা মেডিকেলে অনিয়ম ১

হাসপাতালের ওষুধ প্রায় অর্ধেক পাচার হয়

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে নিয়মিত ওষুধ চুরি হচ্ছে। চুরির সঙ্গে কর্মচারী, নার্স, ওয়ার্ড বয়, আয়া ও দালাল জড়িত। রক্ষণশীল হিসাব বলছে, বছরে প্রায় ১০ কোটি টাকার ওষুধ হাসপাতালের বাইরে পাচার হয়।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এ হাসপাতালের ওষুধ আশপাশে থাকা বেশ কয়েকটি দোকানে নিয়মিত বিক্রি করা হয়। পুরান ঢাকার মিটফোর্ড এলাকার বাজারেও ঢাকা মেডিকেলের ওষুধ যায়। বিনা মূল্যে পাওয়ার কথা থাকলেও রোগীরা অনেক ওষুধ পাচ্ছেন না। হাসপাতালের ভেতরেও রোগীর কাছে ওষুধ বিক্রি করা হচ্ছে।

বছর দেড়েক আগে সরকারের একটি গোয়েন্দা সংস্থা হাসপাতালের ওষুধ চুরি নিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করেছিল। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) ২০১৩ সালের নভেম্বরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সেবা নিয়ে যে গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে, তাতেও ওষুধ সরিয়ে ফেলার তথ্য আছে।

হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মিজানুর রহমান ১০ জুলাই বলেন, ‘বড় ধরনের ওষুধ চুরি হয় না। ফাঁকফোকর দিয়ে হয়তো সামান্য কিছু চুরি হয়।’

দোকানে সরকারি ওষুধ: ৩ জুলাই বেলা দুইটার পর ঢাকা মেডিকেলের ডিএমসিএইচ-১ ভবন (পুরাতন ভবন) থেকে দুজন ব্যক্তি আটটি কার্টন নিয়ে ডিএমসিএইচ-২ ভবন (নতুন ভবন) সংলগ্ন ফটক দিয়ে বের হন। প্রথমজন ফটকের বাঁ দিকের একটি ওষুধের দোকানে একটি কার্টন নিয়ে ১৫ হাজার ৯২৫ টাকা বুঝে নেন। লোক দুজন এরপর পাশের দুটি দোকানে দুটি করে কার্টন দেন। এরপর ফটকের ডান পাশের দোকানে আরেকটি বড় কার্টন বিক্রি করেন। তিন দোকান থেকেই তাঁরা টাকা নেন। তবে টাকার পরিমাণ জানা গেল না। দ্বিতীয়জন ফটকের বাঁ দিকের একটি দোকানে একটি কার্টন বিক্রি করেন। নেন পাঁচ হাজার টাকা। বাকি কার্টন অন্য এক ব্যক্তির হাতে দেন।

যেসব দোকানে কার্টন রেখে টাকা নেওয়া হলো, পরে মুঠোফোনে সেসব দোকানে যোগাযোগ করা হলে প্রতিটি দোকানের মালিক ওষুধ কেনার কথা অস্বীকার করেছেন।

পর্যবেক্ষণ থেকে এবং একাধিক চিকিৎসক ও নার্সের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, হাসপাতালের নার্স ও ওয়ার্ড বয়রা বিভিন্ন ওয়ার্ডে ওষুধ নেওয়ার পথে এবং ওষুধ ওয়ার্ডে পৌঁছানোর পর একটা অংশ সরিয়ে ফেলেন। এরপর তা এক জায়গায় জড়ো করা হয়। বেলা দুইটা-আড়াইটার দিকে কাজ শেষে কর্মকর্তা ও চিকিৎসকেরা চলে গেলে এসব ওষুধ হাসপাতালের বাইরে নেওয়া হয়। একটি সূত্র জানিয়েছে, অনেক সময় বর্জ্য রাখার প্লাস্টিকের ড্রামে করে ওষুধ বাইরে নেওয়া হয়।

৩০ জুন দুপুর ১২টায় ডিএমসিএইচ-২ ভবনের দক্ষিণ দিকের লিফটে করে একটি ট্রলি (ট্রলিতে রোগী আনা-নেওয়া ছাড়াও খাবার, ওষুধ বহন করা হয়) নিয়ে নিচে নামেন দুজন কর্মী। ট্রলিতে ছিল ওষুধ। ট্রলি নিয়ে ওই দুজন সোজা চলে আসেন নিচতলার ওষুধ রাখার কক্ষে। কক্ষে রাখা তিনটি ড্রামে তঁারা ওষুধগুলো রেখে দেন। একটি সূত্র বলেছে, ওষুধ ভর্তি এই ড্রামগুলো নার্স ও ওয়ার্ড বয়রা বেলা দুইটার পর বা রাতে হাসপাতালের বাইরে নিয়ে যান।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, হাসপাতালের ফটকে অপেক্ষমাণ দালাল চক্র ওই ওষুধ-সংলগ্ন ওষুধের দোকান, মিটফোর্ড হাসপাতালের ২ নম্বর গেট-সংলগ্ন পাইকারি মেডিসিন মার্কেট, বাবুবাজারের হাজী রানী মার্কেট ও জননী মার্কেটে পৌঁছে দেয়।

এসব মার্কেটে ওষুধ নিয়ে যান এমন একজন দালালের নাম ও মুঠোফোন নম্বর গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে আছে। রানী মার্কেটে গিয়ে জানা যায়, তিনি সেখানে ‘ব্রোকার’ (দালাল) নামে পরিচিত। মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে শুরুতেই তিনি জানতে চান, ফোনকর্তা হাসপাতালের ওয়ার্ড বয়, নাকি ‘সাপোর্ট’। পরিচয় দেওয়া হলে তিনি বলেন, তিনি কাপড়ের ব্যবসা করেন।

সূত্র জানিয়েছে, প্রতিটি ওয়ার্ডে ভর্তি থাকা সব রোগীর জন্য যে পরিমাণ ওষুধ, স্যালাইন, ইনজেকশন এবং অন্যান্য চিকিৎসা সরঞ্জাম দরকার, তার ইনডেন্ট (ফরমাশপত্র) তৈরি করেন নির্দিষ্ট ওয়ার্ডের সিস্টার ইনচার্জ। সহকারী রেজিস্ট্রারের স্বাক্ষর করা ইনডেন্ট অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের সিস্টার ইনচার্জ স্টোর থেকে ওষুধ ও অন্যান্য সামগ্রী সংগ্রহ করেন। স্টোর থেকে ওষুধ বের হয় ইনডেন্ট অনুযায়ী, তবে সেখান থেকে রোগীর কাছে পৌঁছানোর পথে সেটি সরিয়ে ফেলা হয়। রোগীকে বলা হয়, সব ওষুধ পাওয়া যায়নি। বাইরে থেকে সংগ্রহ করতে হবে।

গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদন বলছে, ‘ঢাকা মেডিকেল থেকে দৈনিক ৩০-৩৫ হাজার টাকার ওষুধ পাচার হয়।’ হিসাবে এর পরিমাণ আরও বেশি। তবে গোয়েন্দা সংস্থার রক্ষণশীল হিসাবটি মেনে নিলে বছরে ১০ কোটি টাকার ওষুধ হাসপাতালের বাইরে চলে যায়।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ২ হাজার ৬০০ শয্যার এই হাসপাতালে দৈনিক রোগী ভর্তি থাকে প্রায় সাড়ে তিন হাজার। এ ছাড়া বহির্বিভাগে সাড়ে তিন হাজারের বেশি রোগী আসে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) মো. শামিউল ইসলাম বলেন, দেশের এই বৃহত্তম হাসপাতালে ওষুধের জন্য বছরে ২২ থেকে ২৩ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়।

রোগীরা কী বলেন

হাসপাতালের পরিচালক মিজানুর রহমান বলেন, রোগীদের প্রয়োজনের ৯৯ শতাংশ ওষুধ হাসপাতাল থেকে বিনা মূল্যে সরবরাহ করা হয়, কোনো কোনো ক্ষেত্রে ১০০ শতাংশ।

তবে রোগীরা বলেছেন, বেশির ভাগ ওষুধই তাঁদের বাইরে থেকে কিনতে বলা হয়। ৮০২ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি কমলা বেগমকে হাসপাতাল থেকে দুটো ওষুধ দেওয়া হয়েছে। এগুলো হলো ট্যাবলেট ডমপেরিডন (পেট ফাঁপার ওষুধ) ও ক্যালসো-৫০০ এমজি (ক্যালসিয়াম)। ব্যবস্থাপত্রে আরও ছয়টি ওষুধের উল্লেখ আছে, যা তাঁকে দেওয়া হয়নি। কমলা প্রথম আলোকে বলেন, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলেছে, ওই ওষুধগুলো তাদের সংগ্রহে নেই। বাইরে থেকে কিনতে হবে।

একই ওয়ার্ডের আলো বেগমকে ব্যবস্থাপত্রে দেওয়া পাঁচটি ওষুধের দুটো (ইনজেকশন অ্যাকট্রাপিড ও ট্যাবলেট অ্যাটোভা) বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে। তাঁর মেয়ে রুনু বলেন, ‘সিস্টার কইছে, এই দুইডা ওষুধ নাই। তাই বাইরে থেইকা আনছি।’

জুনের শেষ সপ্তাহ এবং জুলাইয়ের দুই সপ্তাহ তিনজন প্রতিবেদক বিভিন্ন ওয়ার্ড ঘুরে রোগীদের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং তাঁদের ব্যবস্থাপত্র দেখেছেন। যত রোগী বা তাঁদের আত্মীয়ের সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়েছে, তাঁদের প্রায় প্রত্যেকেই বলেছেন, কোনো না কোনো ওষুধ বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে। ৫০২ নম্বর ওয়ার্ডের এক রোগীর ছেলে মো. শামীম বলেন, তাঁর মাকে হাসপাতাল থেকে শুধু প্যারাসিটামল আর স্যালাইন দেওয়া হচ্ছে। বাকি ওষুধ কিনতে হচ্ছে।

বার্ন ইউনিট, শিশু বিভাগ ও মেডিসিন বিভাগের তিনজন চিকিৎসক বলেছেন, হাসপাতালে ওষুধ থাকলেও রোগীর কাছ পর্যন্ত ওষুধ পৌঁছাচ্ছে না।

ভেতরেই ওষুধ বিক্রি

অনুসন্ধানে দেখা যায়, রোগীদের ওষুধ সরিয়ে রেখে বাইরে বিক্রির পাশাপাশি অনেক সময় হাসপাতালেই রোগীদের কাছে হাসপাতালের ওষুধ বিক্রি করা হয়।

১ জুলাই দুপুর ১২টায় ডিএমসিএইচ-২ ভবনের মহিলা ওয়ার্ড ৮০২-এ গিয়ে কর্তব্যরত একজন নার্সকে রোগীর আত্মীয়ের কাছে ওষুধ বিক্রি করতে দেখা যায়।

ওই নার্স রুম নম্বর বি-১৬-এর এক রোগীর স্বামী সিদ্দিকুর রহমানের হাতে স্টেশন কাউন্টার থেকে চারটি ইনজেকশনের শিশি তুলে দেন। তারপর নার্স রোগীর সেই আত্মীয়ের দেওয়া টাকা দ্রুত অ্যাপ্রনের পকেটে রাখেন।

ওষুধ কেনার বিষয়ে জানতে চইলে সিদ্দিকুর বলেন, ১০ দিনের ওষুধ হাসপাতাল থেকে পেয়েছেন। চার দিনের ওষুধ কিনতে হয়েছে।

প্রায় আধঘণ্টা পর রুম নম্বর বি-১৩-এর পাশে মেঝেতে শোয়া এক রোগীর ভাইয়ের কাছে দুই পাতা ট্যাবলেট বিক্রি করেন ওই নার্স।

মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে ওই নার্স অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ওষুধ বিক্রি করেন ওয়ার্ডের আয়ারা।প্রথমআলো