মেইন ম্যেনু

হাস্যকর যুদ্ধের গল্প

আধিপত্য বিস্তার, বিদ্বেষ, হিংসা, পেশীশক্তি প্রদর্শন ইত্যাদি কারণে প্রাচীন কাল থেকেই মানুষ একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে। আদিতে মানব প্রজাতি বিস্তারের কথা যদি স্মরণ করি তাহলে সেখানে যুদ্ধের ইতিহাসই প্রাধান্য পাবে। প্রথমে গোত্রে-গোত্রে তারপর রাষ্ট্রব্যবস্থা হবার পর রাষ্ট্রের সঙ্গে রাষ্ট্রের যুদ্ধ হয়েছে। এভাবেই চলে আসছে শুরু থেকে এ পর্যন্ত। অনেক বড় কারণে যেমন যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে তেমন তুচ্ছ কারণেও ঘটেছে ভয়াবহ যুদ্ধ। কিছু যুদ্ধ আবার খুবই হাস্যকর। পৃথিবীর সেরকম এক হালি হাস্যকর যুদ্ধ নিয়ে আমাদের এই আয়োজন।

যুদ্ধের কারণ যখন গরু :
১২৭৫ খ্রিস্টাব্দ। বেলজিয়ামের জ্যালেট নামক একটি রাজ্য। লর্ড জীন গাসনেস ছিলেন জ্যালেটের শাসনকর্তা। জ্যালেট রাজ্যের এক কৃষক পাশের রাজ্য কনড্রসে গিয়ে গরু চুরি করার সময় ধরা পড়ে যায়। চুরির অপরাধে কনড্রস রাজা তাকে দিলেন মৃত্যুদ্ণ্ড। এ রকম এক সামান্য অপরাধে এত বড় শাস্তি আইনের চোখে শোভন নয়। এতে করে ক্ষুব্ধ হলেন জ্যালেটের রাজা জী ডি গাসনেস। তিনি এতোটাই রেগে গেলেন যে, সঙ্গে সঙ্গে যুদ্ধ ঘোষণা করলেন। তিনি বললেন, এতো বড় স্পর্ধা রাজা কনড্রসের। এ অপরাধে বড়জোর তিন চার মাসের জেল হতে পারে, তার বদলে মৃত্যুদণ্ড! না কিছুতেই এ অন্যায় মেনে নেওয়া যায় না।

আত্মসম্মানে প্রচণ্ড আঘাত লাগে গাসনেসের। তিনি মনে করেন, তাকে বোধহয় অপমান করার জন্যই এ কাজ করেছে রাজা কনড্রস। কনড্রসকে উচিত শিক্ষা দিবেন এ ভেবেই প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলেন। তারপর দুদেশের মধ্যে শুরু হলো ভয়ানক যুদ্ধ। সামান্য গরুকে কেন্দ্র করে এ যুদ্ধ সত্যিই হাস্যকর। তাদের এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ল পাশের মিত্র দেশগুলোতেও। দু’দেশেরই ক্ষতি হলো প্রচণ্ড। যুদ্ধে মোট চারটি রাজ্য সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেল। দেড় লাখ সৈন্য এ যুদ্ধে নিহত হলো। বেলজিয়ামের ইতিহাসের পাতায় এখনো এই ভয়াবহ যুদ্ধের কথা লিপিবদ্ধ রয়েছে।

লাউয়ের খোসার জন্য যুদ্ধ :
পাকা লাউয়ের ভেতরের নরম অংশটা ফেলে দিয়ে শক্ত পাত্র বানানো যায়। আফ্রিকার আদিবাসী মেয়েরা জলের কলসি হিসেবে এ পাত্র ব্যবহার করতো। এ জলের পাত্র নিয়েই ঘটেছিল এক মজার কাণ্ড। আফ্রিকার বরনু রাজ্যের শাসক আমীর আলী ইবন আল হাজের সময়কার কথা। তার রাজ্যের এক গরিব আদিবাসী মহিলার লাউয়ের কলসির ঢাকনা একদিন চুরি হলো। জানা গেলো পাশে সীমান্তের ওপারের রাজ্য আহিরি গ্রামের এক চাষি চুরি করেছে। এ ঘটনা সোজা চলে গেল রাজার কানে। তিনি এতে প্রচণ্ড রেগে গেলেন। আহিরির লোক তার রাজ্যে এসে চুরি করাতে মান-সম্মানে লাগল খুব। রাজার এই রাগ দেখে এক মন্ত্রী বললেন, ‘বাদ দেন বাদশাহ নামদার, সামান্য একটা কলসির ঢাকনাই তো। তারচেয়ে বরং রাজ্যকোষ থেকে একটা স্বর্ণমুদ্রা দিলেই তো গরিব প্রজা এ রকম হাজারটা কিনতে পারবে।’ কিন্তু রাজা এ প্রস্তাবে আশ্বস্ত হলেন না। তিনি বললেন, ‘না, তুমি বুঝতে পারছো না মন্ত্রীবর। এর সঙ্গে দেশের মান-সম্মান জড়িত। আহারিদের অবশ্যই এ রকম অপকর্মের জন্য শাস্তি পেতে হবে।’

এরপর আমীর আলী আহিরি যুদ্ধ ঘোষণা করলেন। এক হাজার অশ্বারোহী নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লেন শত্রুর ওপর। উভয় পক্ষের মধ্যে শুরু হলো তুমুল যুদ্ধ। প্রচুর হতাহত হলো সেই যুদ্ধে। আমীর আলী যুদ্ধে জয়লাভ করলেন। চোরকে গ্রেফতার করে আনা হলো। শাস্তিস্বরূপ তার শিরোচ্ছেদ কার্যকর করা হলো। তবে আমীর আলীরও যে ক্ষয়ক্ষতি হয়নি তা নয়। এই যুদ্ধে তার ৭০ জন সৈন্য প্রাণ দিয়েছে। আহত হয়েছিল শতাধিক। কিন্তু এতেও তিনি খুশি। কারণ পাশের রাজ্যের রাজাকে যে চরম শাস্তি দিতে পেরেছেন এটাই তার বড় প্রাপ্তি।

মেষ করলো যুদ্ধজয় :
সালটা ১৪৯৯। সুইজারল্যান্ডের গ্রুয়ার নামক একটি রাজ্যে ঘটল এক ব্যতিক্রম ঘটনা। গ্রুয়ার শহর আক্রমণ করল পাশের শহরের বার্নিজ উপজাতিরা। নিজের দেশ রক্ষার জন্য গ্রুয়ার রাজ্যের জনগণও ঝাঁপিয়ে পড়ল যুদ্ধে। সব পরিবারের পুরুষরাই ঘর ছেড়ে যুদ্ধে যোগ দিল। প্রাণপণ যুদ্ধ করেও তাদের অবরোধ কিছুতেই ভাঙতে পারছিল না গ্রুয়াররা। বার্নিজ উপজাতিরা ক্রমশ এগিয়ে আসতে লাগল তাদের দিকে। গ্রুয়ার শহরটা ছিল একটা পাহাড়ের উপর। আর বার্নিজদের অবস্থান ঠিক পাহাড়ের নিচে। ওখান থেকেই তারা ধীরে ধীরে সামনের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। ওদিকে গ্রুয়ায় প্রত্যেক বাড়িতে মেয়ে ও শিশুরা মহা চিন্তায় পড়ে গেল। রাতে শহরের সব মেয়েরা একটা গোপন বৈঠক করল। কী করে এই বিপদ থেকে রক্ষা পাওয়া যায় বৈঠকের এটাই ছিল মূল প্রতিপাদ্য। অবশেষে তারা এক মজার সিদ্ধান্ত নিল।

গ্রুয়ার রাজ্যের সবাই ছিল মেষপালক। তাদের আয়ের প্রধান উৎসই ছিল পশুচারণ। সবার ঘরে দশ-বিশটা করে ছাগল থাকত। মেয়েরা করল কী, সবাই মিলে হাজারখানেক ছাগল একত্র করল। পাহাড়ি ছাগল। শিংগুলোও বেশ বড় বড়। মেয়েরা প্রত্যেক ছাগলের মাথায় বড় শিংয়ের সঙ্গে দুটো করে মশাল দিল বেঁধে। এরপর গভীর রাতে মশালে আগুন ধরিয়ে সেগুলোকে ছেড়ে দিল বাইরে। ছাগলগুলো দৌড়াতে লাগল। অনেকদিন ধরে তারা মাঠে চরতে পারে না। ছাগলগুলো ভাবলো, নিশ্চয় তাদেরকে মাঠে পাঠানো হচ্ছে। মনের খুশিতে ছাগলগুলো পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নিচে নামতে লাগল। এ দৃশ্য দেখে বার্নিজরা বেশ ভয় পেয়ে গেল। তাদের ভেতরে ছিল প্রচুর ভূতের ভয়। দূর থেকে কিছু বোঝারও উপায় নাই। হাজার হাজার আলোকে এভাবে আসতে দেখে তারা এটাকে ভূতের আক্রমণ ভেবে বসল। তখনই ঘটল একটা বিস্ময়কর ঘটনা ! শয়তান ভেবে তারা যে যার মতো দিল ভৌ দৌড়। সব্বাই গেলো পালিয়ে অস্ত্র-শস্ত্র সব ফেলে। সকালে গ্রুয়াররা দেখলো, বার্নিজরা সব উধাও। আর তাদের ছাগলগুলো মনের আনন্দে ঘাস খেয়ে বেড়াচ্ছে। তাদের শিংয়ে তখনও মশালগুলো বাঁধা ছিল। বাড়ি ফিরে নিজেদের স্ত্রীদের কাছ থেকে ঘটনার পুরোটা জানতে পেরে শহরজুড়ে হাসির রোল পড়ে গেল।

মানুষ থাকলো নীরব, যুদ্ধ করল বুনো মহিষ :
সাধারণত আমরা দেখি, যুদ্ধে সৈন্যরাই অংশ নেয়। আর ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় মাঝে মাঝে দুদলের প্রধান সেনাপতিদ্বারাও যুদ্ধের মীংমাসা হয়েছে অনেক সময়। উদাহরণ হিসেবে আমরা স্মরণ করতে পারি, সোহরাব-রুস্তম ও বাংলার ঈশা খাঁ ও মানসিংহের মধ্যকার যুদ্ধের কথা। এ রকম যুদ্ধে সাধারণ সৈন্যরা মাঠে নামে না। তবে এগুলোর কোনটিই নয়, একেবারে ভিন্ন ধরনের একটা যুদ্ধের বিষয় জানা যায় ইতিহাস ঘেটে। যুদ্ধটি ঘটেছিল, জাভা এবং মালয়ের মধ্যে। সুমাত্রা দ্বীপের অধিকার নিয়ে দ্বন্দ্ব নিয়েই যুদ্ধটা সংঘটিত হয়। দুপক্ষের সৈন্য মোতায়েন শেষ। অস্ত্রের ঝনঝনানিতে প্রকম্পিত হচ্ছে যুদ্ধের ময়দান। নিজ নিজ সেনাপতির আদেশ পেলেই ঝাঁপিয়ে পড়বে একে অন্যের ওপর। কিন্তু সেনাপতিরা নীরব।

হঠাৎ সেনাপতিদের মধ্যে সিদ্ধান্ত হলো, অযথা রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ করে কী হবে? তখন স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন চলে আসে তাহলে কি সন্ধি হবে? না সেটাও সম্ভব নয়। তাহলে হবেটা কি? অবশেষে সিদ্ধান্ত হলো, যুদ্ধ হবে তবে মানুষের মধ্যে নয়, মহিষের মধ্যে। দুদেশের সেনাপতি দুটো মহিষ বাছাই করে দেবে এবং তাদের মধ্যে সংঘটিত হবে যুদ্ধ। যে দলের মহিষ জিতবে তারাই হবে বিজয়ী। সিদ্ধান্ত মোতাবেক দুই পক্ষের দুই মহিষের মধ্যে শুরু হলো যুদ্ধ। সারাদিন বিরামহীন চলতে থাকল লড়াই। সন্ধ্যার একটু আগে ক্লান্ত হয়ে পড়ল জাভার মহিষটি। এই ফাঁকে মালয়ের মহিষ ক্ষীপ্রতা বাড়িয়ে দিলো এক গুঁতা। উল্টে পড়ে গেল জাভার মহিষ। সঙ্গে সঙ্গে ঢলে পড়ল মৃত্যুর কোলে। যুদ্ধের ফলাফল শর্ত মোতাবেক দুপক্ষই মেনে নিল। সুমাত্রা মালয়ের দখলে চলে এলো। সেদিন থেকেই সুমাত্রার জনগণকে ঠাট্টা করে আজও বলা হয়, `মিনাংকাবাউ` অর্থাৎ বুনো মহিষের বিজয়ী।