মেইন ম্যেনু

হাড়-শিং : ১শ কোটির বাজার ২০ কোটিতে ঝুলছে

কোরবানির চামড়া নিয়ে টানাটানি, খুনোখুনির ঘটনা বেশ পুরনো। কিন্তু পশুর যে একটি হাড়ও ফেলনা নয়। হাড়, শিং, দাঁত ও খুর রপ্তানি ও এগুলোর দ্বারা তৈরি পণ্য বাজারজাত করে বর্তমানের ২০ কোটি টাকার বাণিজ্য ১শ কোটিতে নিয়ে যাওয়া সম্ভব বলে মনে করছেন ব্যবসায়িরা।

মূলত পাকিস্তান আমল থেকে এদেশে এ ব্যবসার চল শুরু হয়েছে। কিন্তু স্বাধীনতা পরবর্তী কোনো সরকার শিল্প উদ্যেক্তাদের মধ্যে এ ব্যাপারে আগ্রহ সৃষ্টির কোনো উদ্যোগ নেয়নি। যেটুকু কাজ হয় তা চামড়াকে ঘিরেই। তাই আড়ালে পড়ে থাকা এ ব্যবসার আকার এদেশে খুব বেশি বাড়েনি।

সঙ্গত কারণেই হাড় ব্যবহার করে বিভিন্ন পণ্য উৎপাদনে উদ্যোক্তার প্রচুর অভাব রয়েছে এদেশে। সেইসঙ্গে রয়েছে সরকারি সহযোগিতারও অভাব। এসব কারণে দেশীয় হাড় থেকে তৈরি পণ্যের যথেষ্ট চাহিদা থাকার পরও কাজে লাগানো যাচ্ছে না সে সুযোগ।

এখানে হাড় ও শিং থেকে সামান্য পরিমানে চিরুনী, বোতাম, হস্তশিল্প তৈরি করা হলেও চাহিদার অধিকাংশই আমদানি করা হয় বিদেশ থেকে। অথচ দেশে শিল্প প্রতিষ্ঠা করা গেলেই আমাদনি বন্ধের পাশাপাশি রপ্তানির জন্য পড়ে রয়েছে বিশাল বাজার।

বাংলাদেশে গরু, মহিষ, ছাগলের সব রকমের হাড়, পায়ের খুর, দাঁত, শিং সবটুকু অংশই ব্যবহার করা হয়। বিভিন্ন ক্যাটাগরির হাড়ের মধ্যে দেশে ক্র্যাশবোন- ৩/৮, ৫/৮ নামের ভালোমানের একটি হাড় প্রক্রিয়াজাত করা হয়, যার প্রধান ক্রেতা গ্লোবাল ক্যাপসুল লিমিটেড। কোম্পানিটি বছরে ৩৪টি হাড় রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে প্রায় ১২ কোটি টাকা মূল্যের হাড় কেনে। এ দিয়ে তৈরি হয় উন্নতমানের ক্যাপসুল (ওষুধের নমনীয় মোড়ক) । প্রতিষ্ঠানটি টনপ্রতি ২৮ হাজার টাকা দড়ে প্রতি বছর প্রায় ৪ হাজার টন হাড় ও শিং সংগ্রহ করে থাকে।

হাড় প্রক্রিয়াজাতকারী কোম্পানিগুলো বছরে ৭-৮ কোটি টাকার হাড়, শিং বিদেশে রপ্তানি করে। জাপান, জার্মানি, ভারত ও চীনে সাধারণদ রপ্তানি করা হয়। কিছু জটিলতার কারণে ইরান, ইন্দোনেশিয়াতে ব্যপক চাহিদা থাকা সত্ত্বেও রপ্তানি সম্ভব হয় না। এ জায়গাতে সরকারের একটু সহযোগিতা পেলে এসব দেশে হাড় রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রার আয় বাড়ানো সম্ভব।

বাংলাদেশ বোন এক্সপোর্টার্স অ্যান্ড মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের দেয়া তথ্যে জানা যায়, হাড় থেকে তৈরি হয় বোতম। কিন্তু ভালো মানের বোতাম তৈরির কোনো কারখানা দেশে নেই। চাহিদার সবটুকুই মেটানো হয় আমাদনি থেকে। অথচ বোতাম তৈরির কাঁচামাল বিদেশে রপ্তানি করা হয়। ইউরোপে আবার প্রচুর চাহিদা রয়েছে ভালোমানের বোতামের।

হাড় থেকে এক ধরনের গুঁড়া তৈরি করা হয়। যা দিয়ে তৈরি হয় নিটবন নামের মুরগির খাবার। এটি লেয়ার-ব্রয়লার মুরগির খাবারে প্রতি কেজিতে ১৮-২০ শতাংশ মেশানো হয়। এটি পুরোপুরি বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়। দেশে ব্যপক চাহিদা এবং কাঁচামাল থাকলেও পুরোটাই আমদানি করা হচ্ছে। এটি আমদানিতে প্রতিবছর খরচ হয় ২শ-২৫০ কোটি ডলার।

এছাড়া চিরুনী, বোতাম, পুঁতি, লাঠি, বাটন, বয়স্কদের ব্যবহারের লাঠির দেশীয় বাজারে পর্যাপ্ত চাহিদা থাকলেও ভালো কোনো কারখানা নেই। সরকারি পর্যায়ে যথেষ্ট সহযোগিতা ও মনযোগের অভাবে এখানে তেমন কোনো উদ্যোক্তা নেই। এখন যাদের হাড়ের কারখানা রয়েছে তারা মূলত বংশের ব্যবসা হিসেবে তা টিকিয়ে রেখেছেন।

এ ব্যাপারে অ্যাসোসিয়েশনের আহ্বায়ক কমিটির প্রধান মো. জাকির হোসেন বলেন, দেশে-বিদেশে এ হাড়-খুর-শিং এবং এগুলো থেকে উৎপাদিত পণ্যের রয়েছে ব্যাপক চাহিদা; ভালো মানের কারখানা গড়ে উঠলে দেশ ও বিদেশের বাজার দুটোতেই বড় ধরণের সম্ভাবনা রয়েছে।

তিনি জানান, সারাদেশে প্রায় ৫-৬ হাজার এজেন্টের মাধ্যমে সংগ্রহ করা হয় এসব হাড়-শিং। টোকাইদের মাধ্যমে এজেন্টরা এসব সংগ্রহ করে। এজেন্টদের কাছ থেকে কারখানগুলো সাধারণত প্রতি কেজি ১৮-২০ টাকা দরে এসব কিনে। কিন্তু কোরবানি এলে এ দাম অর্ধেকে নেমে আসে। প্রচুর পরিমান অপরিষ্কার হাড় এ সময়টাকে কেনা হয় ১০-১২ টাকা কেজি দরে।

আর প্রতি মেট্রিক টন হাড় রপ্তানি করা হয় টনপ্রতি ৩৫-৪০ হাজার টাকায়। প্রক্রিয়াজাত করে ভালো মানের হাড় বাছাই করে রপ্তানি করলে তা ৪৫ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি করা যায় বলে জানান জাকির হোসেন।

তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশের যে পরিমান পণ্যের চাহিদা, বিদেশে হাড়-শিং ও এগুলো থেকে তৈরি পণ্যের যে চাহিদা রয়েছে তা নিয়ে কাজ করতে পারলে বছরে ২০ কোটির এ বাজারটিকে ১০০ কোটি ছাড়িয়ে নেয়ার প্রচুর সুযোগ ও সম্ভাবনা রয়েছে। এর জন্য অবশ্য সরকারের সহযোগিতা খুবই দরকার। একটি অ্যাসোসিয়েশন রয়েছে যার অনুমোদন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে ঝুলে আছে। সংগঠনটির অনুমোদন না থাকায় ব্যবসায়ীরা তাদের দাবি দাওয়াগুলো সরকারের কান পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে না। কিছু দেশে রপ্তানি বাণিজ্যের জটিলতা দূর করতে সরকার একটু কাজ করলে রপ্তানি বাড়ানো সম্ভব।’

এছাড়া টেকনিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে হাড় শিং দিয়ে পণ্য তৈরির প্রশিক্ষণ দেয়ার ব্যবস্থা করা হলেও দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করা সম্ভব হবে। এতে করে প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাইরে থেকে লোক আনতে হবে না বলে মনে করেন এ ব্যবসায়ী।

উল্লেখ্য, এক সময় হাড়-শিং রপ্তানির ওপর ১৫ শতাংশ হারে নগদ প্রণোদনা দেয়া হলেও এখন দেয়া হয় মাত্র ৫ শতাংশ। বাংলামেইল