মেইন ম্যেনু

হিজড়ারা কি শুধু বিরক্তই করে?

ড. বদরুল হাসান কচি: তৃতীয় লিঙ্গ আমরা যাদের বলি সাধারণের কাছে তারা হিজড়া নামেই বেশি পরিচিত। এই লিঙ্গের মানুষ দেশে হাতেগোনা, তারপরও সাধারণের চোখে তারা চিহ্নিত। তার কারণ এদের চলাফেরা, বেশভূষা ঠিক স্বাভাবিক বলা যায় না, একটু অন্যরকম। যার ফলে সাধারণকে সহজে আকৃষ্ট করে। লিঙ্গভিত্তিক এরা না-পুরুষ না-নারী। তবে এদের মধ্যে নারীত্ব প্রকাশ পায়। নারীর মতো সেজেগুজে থাকতে পছন্দ করে। পাশাপাশি এরা সংঘবদ্ধ থাকে। সমাজহীন এই মানুষ দেশের বেশিরভাগ লোকের কাছে হাসির পাত্র। এরা প্রতিনিয়তই হাসি-ঠাট্টা-তামাশার উপাদেয়। এতসবের পরও তারা বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখে। জীবন-জীবিকার তাগিদে কর্মহীন এই মানুষ নেমে পড়ে রাস্তায়। হাত বাড়ায় প্রতিনিয়ত তাদের তাচ্ছিল্য করা মানুষের কাছেই, পাঁচ-দশ টাকার আশায়। কি করা বাঁচতে হবে তো! কেউ সায় দেয়, কেউবা গালমন্দ করে।

অনেকে হয়ত ভাবে এরা এত টাকা নিয়ে না জানি কি করে ফেলছে। অথচ আমরা ভাবি না, এরা যে সমাজ থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন বাসিন্দা। এরা না পায় থাকার জন্য কোথায়ও ভালো একটি জায়গা কিংবা খাওয়ার জন্য কোনো ভালো স্থান। বেঁচে থাকার অন্যান্য মৌলিক চাহিদার কথা তো বাদই দিলাম। এরা ভদ্র সমাজে অনেকটা ছোঁয়াচে রোগীর মতো অবস্থায় থাকে। তাহলে ভাবুন, এমন পরিস্থিতিতে এদের পক্ষে, কি জানি কি করে ফেলার মতো কোনো সুযোগ আছে কি? আমাদের এই বোঝার ভুলের কারণেই ঘটে নানা রকমের অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা। আগেই বলেছি হিজড়াদের হাত বাড়ানোতে সবাই সায় দেয় না। প্রায় উভয় পক্ষে তৈরি হয় কথা কাটাকাটির ঘটনা। অনেক সময় তা বড় আকার ধারণ করে। মারামারিও বাধে। শুধু যে সাধারণ মানুষ তা নয়, সম্প্রতি দুই পুলিশ সদস্যকেও পিটিয়ে রক্তাক্ত করেছে কিছু হিজড়া।

আমরা অনেকে ভুলে যাই, হিজড়াদের শারীরিক অসম্পূর্ণতা যেমন আছে, তেমনি ওদের মানসিক বৃদ্ধিটাও অপূর্ণ আছে। তাছাড়া এরা কখনো পড়াশোনা করেনি। শিক্ষার আলো বঞ্চিত মানুষ অন্যের সঙ্গে আচার ব্যবহার কীভাবে করতে হয় সেটাও ঠিক তাদের জানা থাকে না। তাছাড়া হিজড়ারা ক্রমাগত অন্যের কাছ থেকে তাচ্ছিল্য হতে হতে তাদের মানসিক পরিস্থিতি স্বাভাবিকভাবেই একটু অস্বাভাবিক থাকে। আমরা শুধু এদের খারাপ দিকটিই দেখি। মানুষ হিসেবে তাদেরও নিশ্চয়ই একটি ভালো মন আছে। একটি উদাহরণ হয়ত এখানে টেনে আনতে পারি, বছরখানেক আগে রাজধানীর হাতিরঝিলে চাপাতির আঘাতে খুন হন ব্লগার ওয়াশিকুর রহমান বাবু। কিন্তু খুনিরা পালিয়ে যেতে পারেনি। অসীম সাহসিকতা নিয়ে কয়েকজন হিজড়া দৌড়ে ধরে ফেলেছেন বাবুর খুনিদের। এই যে অপরের প্রতি ভালোবাসা, দায়িত্ববোধ তারা দেখিয়েছে তারপরও কি আমরা সভ্য সমাজের লোকজন বলব হিজড়ারা শুধু বিরক্তই করে?

কিছুদিন আগে শুনেছিলাম, সরকারও চায় এদের পুনর্বাসন হোক। আর তাই আপাতত ট্রাফিক পুলিশের কাজে হিজড়াদের ব্যবহার করা হবে। এই ঘোষণায় দেশজুড়ে মানুষের প্রশংসাও শুনেছি। কিন্তু সেই ঘোষণার বাস্তবায়ন আর আলোর মুখ দেখল কই! কিন্তু যেই করেই হোক এদের পুনর্বাসন যে জরুরি হয়ে পড়েছে। শেষে এইটুকু বলতে চাই, বেঁচে থাকার তাগিদেই হিজড়ারা চাঁদা তোলে। বাস্তবতা ভুলে আমরা সভ্য সমাজের মানুষ তাতে বিরক্ত হই! যতক্ষণ না রাষ্ট্র এদের পাশে দাঁড়ায় ততক্ষণ না হয় আমরা একটু বিরক্ত সহ্য করি।

লেখক : আইনজীবী ও নির্বাহী পরিচালক, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘সপ্ন’।