মেইন ম্যেনু

হিটলারের ফুলকন্যারা

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের খলনায়ক অ্যাডলফ হিটলারের রাজকীয় জীবনে ফুলকন্যাদের কদর-সমাদরের গল্পো হয়তো অনেকের কাছে অজানা। ইতিহাসে যুদ্ধের ডামাডোলের ফাঁকে ফাঁকে কখনো কখনো উঁকি দিয়েছে এসব গল্পো, যা ফুয়েরারের ভয়ংকর চরিত্রের আড়ালে বর্ণহীন হয়ে আছে।

ফুলকন্যা বা পুষ্পকন্যা। ইংরেজিতে ফ্লাওয়ার গার্ল। কারা ছিল এই ফুলকন্যা? হিটলার জার্মানির ক্ষমতা দখল করার পর ছোট-বড় যে অনুষ্ঠানেই যেতেন, তাকে বরণ করতে হতো তার পছন্দের ফুল দিয়ে। টকটকে লাল, বেগুনি অথবা সাদা রঙের ফুল ছিল হিটলারের খুবই প্রিয়। নির্দিষ্ট রঙের ফুল দিয়ে তাকে সংবর্ধনা বা অভ্যর্থনা জানানো ছিল প্রথা। এই প্রথা অনুযায়ী যেসব মেয়েরা হিটলারের হাতে ফুল তুলে দিতেন, তাদের সেই সময়ে বলা হতো ফুলকন্যা।

যেকোনো মেয়ে ফুলকন্যা হতে পারত- বিষয়টি মোটেই এমন নয়। এ ক্ষেত্রে আভিজাত্যের নিখুঁত মানদণ্ড মেনে চলতে হতো। নীল নয়না আর রুপালি কেশে বেণি করা মেয়েরাই (আরিয়ান গার্লস) শুধু পুষ্পকন্যা হতে পারত। বয়সের বাছবিচারও ছিল। ছোট মেয়েদের পছন্দ করতেন হিটলার। ঐতিহাসিক বিতর্ক থাকলেও যত দূর জানা যায়, জাতিগত বিশুদ্ধতার প্রতীক হিসেবে ফুলকন্যারা সমাদৃত হতো এই নাৎসি নেতার কাছে। পশ্চিমাদের দৃষ্টিতে বিষয়টি ছিল, এর মধ্য দিয়ে জার্মান জাতির পিতা হিসেবে নিজেকে জাহির করতেন হিটলার।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়েছে ৭০ বছর আগে। এর মধ্যে গঙ্গা, ভলগা, মিসিসিপি, নীল নদে অনেক জল গড়িয়েছে। বদলে গেছে হিরোশিমা, নাগাসাকি। নতুন চেহারায় হাজির হয়েছে ওয়াশিংটন, মস্কো, লন্ডন, বার্লিন। শত-সহস্র পরিবর্তন ঘটে গেছে বিশ্বে। তবু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ যেন চোখের সামনের ঘটনা। আজও চিরুনি অভিযান চালিয়ে খোঁজা হচ্ছে কে নাৎসি আর কে শান্তিকামী। কিন্তু সেই সময়ের মানুষগুলো আজ গত, নয়তো থুত্থুড়ে বুড়োবুড়ি।

123

হিটলারকে ফুল দেওয়ার কোনো ছবি সংরক্ষিত নেই ওলবার্টজের কাছে। তবে শৈশবে ও বর্তমানে তাকে দেখতে এমন

হ্যানেলোর ওলবার্টজ (ডাক নাম হোক)। দাম্ভিক হিটলারের তর্জন-গর্জনে তখন পুরো বিশ্ব থরথর। ১৯৩৫ সাল। সে সময়ে ওলবার্টের বসয় মাত্র ছয়। জার্মানির হ্যানোভারের স্কুলপড়ুয়া শিশুকন্যা। হঠাৎ একদিন ডাক পড়ল। হিটলারকে ফুল দিয়ে সংবর্ধনা জানাতে হবে। জার্মান শিশুদের জন্য এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি তখন আর ছিল না। খুশিতে আত্মহারা ওলবার্টজ। শেষ পর্যন্ত হ্যানোভারে হিটলারের হাতে ফুল তুলে দিয়ে খুশির ফোয়ারায় সিক্ত হলো সে। ফুলকন্যা ওলবার্টজ সেই ঘটনার আট বছর পর ‘হিটলার ইয়ুথ’ অর্থাৎ হিটলারের তরুণ বাহিনীতে যোগ দেয়। তখন তার বয়স ১৪ বছর।

সেই ফুলকন্যা ওলবার্টজ আজও বেঁচে আছেন। এখন তার বয়স ৮৬ বছর। তবে জার্মানিতে নয়, এখন তিনি থাকেন যুক্তরাষ্ট্রের মিজৌরি অঙ্গরাজ্যের স্প্রিংফিল্ডে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিটলারের পতন হওয়ার পর শৈশব, কৈশরের সেইসব গল্প মনের গহিনে চাপা দিয়ে রেখেছিলেন তিনি। না আত্মীয়-স্বজন, না বন্ধু-বান্ধব যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমানোর পর কাউকে ভুল করেও হিটলারের সঙ্গে তার সাক্ষাতের কথা বলেননি তিনি। কিন্তু জীবনের পড়ন্ত বেলায় সত্য বলে যাওয়াটা তার কাছে হয়তো বিবেকের দায়মুক্তি মনে হয়েছে। আর সে জন্যই হয়তো তিনি মনের গোপন দুয়ারের তালা খুলে দিলেন এত দিন পর। বললেন, ফুলকন্যা হয়ে হিটলারের মুখোমুখি হওয়ার সেইসব স্মৃতি।

হিটলারের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়েছিল যাদের, তাদের মধ্যে হাতে গোনা যে কয়জন এখনো বেঁচে আছেন, ওলবার্টজ তাদেরই একজন। ১৯৩৫ সালের স্মৃতি হাতড়ে তিনি বলেন, ‘নীল চোখ আর রুপালি চুল থাকায় হিটলারকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য আমাকে মনোনীত করা হয়। তখন আমার বয়স সবে ছয়। কিন্তু তখন আমরা জানতাম না, আজ যে হিটলারের কথা আমরা শুনি, তিনি-ই ছিলেন সেই ব্যক্তি, যাকে আমরা ফুল দিয়ে বরণ করতাম।’

‘আমার স্কুলের প্রিন্সিপাল আমাকে ও আমার কয়েক বন্ধুকে বাছাই করে নিয়ে হিটলারকে অভ্যর্থনা জানানোর কথা বললেন। যথাসময়ে হাজির হয়ে আমরা অপেক্ষা করতে লাগলাম। প্রায় তিন ঘণ্টা পর হিটলার এলেন। গাড়ি বহরের ৩ নম্বর গাড়ি থেকে নামলেন তিনি। পরনে খাকি পোশাক। সুদর্শন, গাম্ভীর্যময় ব্যক্তিত্ব। তখন সবকিছু স্তব্ধ, কারো মুখে হাসি নেই, না আছে কথা। ততক্ষণে প্রস্রাবের প্রচণ্ড চাপ হয় আমার। কিন্তু কিছুই করার নেই। আরো মেয়েদের সঙ্গে আমরা হিটলারকে ফুল দিয়ে অভ্যর্থনা জানাই। তবে আমার কাছ থেকে ফুল নেন ঠিকই, কিন্তু অন্যদের মতো মাথায় হাত দিয়ে আশীর্বাদ করেননি। কেন, তা আজও জানতে পারিনি। তবে এক নাৎসি কর্মকর্তা আমার ছবি তোলেন।’

234

ওলবার্টজের দাবি, জাতিসংঘের প্রাক্তন মহাসচিব কুর্ট ওয়াল্ডহেম তার শয্যাসঙ্গী হতে চেয়েছিলেন

‘আমাদের পরিবার সচ্ছল ছিল না। কোনোমতে দিন কেটে যেত। তবে আমরা ভিক্ষুক ছিলাম না। আমার বাবা-মা নাৎসি বাহিনীর সদস্য না হলেও আমার মা নাৎসিদের সঙ্গে সখ্য রেখে চলতেন। একদিন এক কর্মকর্তা আমাদের বাসায় এলেন। কথায় কথায় আমার কাছে জানতে চাইলেন, আমার জীবনের লক্ষ্য কী। আমি কোনো উত্তর দিতে পারিনি। তিনি আমাকে প্রস্তাব দিলেন হিটলারের জন্য কাজ করতে। মায়ের আপত্তি থাকলেও আমাদের সাহস ছিল না মুখ ফুটে তা বলে দেওয়া। সেই মতো আমি হিটলার ইয়ুথে যোগ দিই। তবে আমাকে রান্নার কাজ দেওয়া হয়।’

সেই সময়ের এক অপ্রীতিকর মুহূর্তের কথা স্মরণ করে ওলবার্টজ বলেন, হিটলার ইয়ুথে কাজ করার সময় কুর্ট ওয়াল্ডহেমের সঙ্গে দেখা হয় আমার। সে খুব খারাপ অভিজ্ঞতার কথা। ওয়াল্ডহেম ১৯৩৮ সাল থেকে নাৎসি বাহিনীর সদস্য ছিলেন এবং ১৯৪২ সাল পর্যন্ত প্যারামিলিটারি ফোর্সে যুক্ত ছিলেন। কিন্তু তিনি তা অস্বীকার করেন। পরে ১৯৭২ সালে জাতিসংঘের মহাসচিব হন এবং ১৯৮১ সাল পর্যন্ত বহাল থাকেন। ১৯৮৬ থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত তিনি অস্ট্রিয়ার প্রেসিডেন্ট ছিলেন। ২০০৭ সালে তিনি মারা যান। এই সেই ব্যক্তি, যার কুনজরে পড়েন কিশোরী ওলবার্টজ। ওয়াল্ডহেম তার সঙ্গে শয্যায় যেতে চেয়েছিলেন। অন্য কর্মকর্তারও একই বাসনা প্রকাশ করে। এ নিয়ে কর্মকর্তাদের মধ্যে বাদানুবাদেও হয়। আতঙ্কগ্রস্ত ওলবার্টজের কিছুই করার ছিল না। তখন ঈশ্বরই তার সহায় হন। কর্মকর্তাদের কাছে হিটলারের ডাক আসে। তাড়াহুড়ো করে সবাই বেরিয়ে যায়। ওয়াল্ডহেম ও অন্যদের লালসা থেকে রেহাই পায় ওলবার্টজ।

জীবনের বিদায় বেলায় দাঁড়িয়ে সেই ফুলকন্যা ওলবার্টজ এখনো মনে করেন, ‘হিটলার জার্মানির জনগণের মঙ্গলের জন্য লড়াই করেছেন। অতীতে, এখন বা কখনোই এ নিয়ে আমার খারাপ অনুভূতি হয়নি।’