মেইন ম্যেনু

‘হিলারি হতাশা’র মধ্যে সাহসের বাতিঘর মেরকেল-টেরেসা-হাসিনা

২০১৭ – একবিংশ শতাব্দীর আরও একটি বছর। এর সঙ্গে আরও একটি নারী দিবস যোগ হচ্ছে পৃথিবীর ইতিহাসের খাতায়। ঠিক একশ’ বছর আগে নারীদের ভোটাধিকারের আন্দোলন করেছিলেন রাশিয়ার নারীরা। রুশ বিপ্লবের মধ্য দিয়ে ভোটাধিকারও পেয়েছেন। আর রাশিয়ায় না হলেও, ভোটাধিকারের ধারাবাহিকতায় এখন নারীরা রাষ্ট্রপ্রধান, সরকারপ্রধান হিসেবে দেশ পরিচালনা করছেন।

বিংশ শতাব্দী থেকে শুরু করে একবিংশ শতাব্দীতে নারীর ক্ষমতায়ন ও নারী নেতৃত্বের বিকাশ চোখে পড়ার মতো। কিন্তু এখনো অনেককে শুধু নারী বলেই যোগ্যতা এবং অভিজ্ঞতা থাকার পরও উপযুক্ত সম্মান থেকে বঞ্চিত হতে হচ্ছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এমন একটি ঘটনার সবচেয়ে বড় সাম্প্রতিক উদাহরণ মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে হিলারি ক্লিনটনের হার।

তবে নারীর এমন ব্যর্থতার কালো মেঘেও সাফল্যের রূপালি রেখা হিসেবে দেখা দেন আরও অনেক রাষ্ট্রনায়ক, যারা শুধু নারী নন, স্বতন্ত্র প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে দেশ ও বিশ্ব দরবারে মর্যাদার আসন পেয়েছেন। এদের মধ্যে রয়েছেন জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মেরকেল, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টেরেসা মে এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

২০০৮ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বারাক ওবামার সঙ্গে ডেমোক্রেটিক দলের মনোনয়ন দৌড়ে হেরে যান হিলারি ক্লিনটন। তখন অবশ্য ওবামার জনপ্রিয়তাও একটি কারণ ছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম আলোচিত ফার্স্ট লেডি, এরপর নিউ ইয়র্কের সিনেটর, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ধাপ পেরিয়ে রাজনৈতিক অভিজ্ঞতায় পরিপূর্ণ ঝুলি নিয়ে ২০১৬ সালে ডেমোক্রেট পার্টির মনোনয়ন জিতে নিলেও রিপাবলিক প্রতিদ্বন্দ্বী ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে ইলেক্টোরাল ভোটে হেরে যান। নভেম্বরের নির্বাচনের আগে ও পরে মতামত জরিপে দেখা যায়, বহু আমেরিকান, বিশেষ করে তুলনামূলক প্রবীণেরা হিলারির অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রশ্ন না তুললেও শেষ পর্যন্ত তিনি নারী বলেই তাকে রেখে ব্যাপকভাবে বিতর্কিত ট্রাম্পকে সমর্থন করেছে। এমনকি প্রেসিডেন্ট হিসেবে হিলারির যোগ্যতার মাপকাঠি এমনটাও ছিল: যিনি নিজের স্বামীকে সামলাতে পারেননি (সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের বিয়ে বহির্ভূত সম্পর্ক) তিনি পুরো দেশটাকে কীভাবে সামলাবেন?

শেখ হাসিনা, সঙ্গে: (বামে) জন কেরি, (ডানে ওপরে) বারাক ওবামা, (ডানে নিচে) জাস্টিন ট্রুডো
তবে দেশটিতে দৃষ্টিভঙ্গি যে বদলাচ্ছে তার প্রমাণ হিলারির পক্ষে নতুন প্রজন্মের বেশি ভোট এবং জনগণের মোট ভোটের হিসাবে তার জয়। কিন্তু ফোর্বসের ক্ষমতাধর নারীর তালিকায় দু’নম্বরে থাকা হিলারির ইলেক্টোরাল কলেজের ভোটে হেরে যাওয়া প্রমাণ করে – উন্নত আমেরিকার সর্বোচ্চ পর্যায়ে নারী নেতৃত্ব মেনে নিতে আরও দেরি আছে।

নারী নেতৃত্বের ব্যাপারে উন্নত বিশ্বের চেয়ে অনেকখানিই এগিয়ে আছে বাংলাদেশ। স্বাধীনতার ২০ বছরের মাথায় বাংলাদেশ সরকারপ্রধান হিসেবে নারী নেতৃত্ব পেয়েছে, প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন বেগম খালেদা জিয়া। আর একবিংশ শতকে এসে যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশে হিলারির চোখেমুখে হারের হতাশার কুয়াশা, সেখানে দেশে-বিদেশে ছোট্ট বাংলাদেশের শেখ হাসিনা সাহস আর বিজয়ের বাতিঘর হিসেবে আলো ছড়াচ্ছেন।

বাংলাদেশের সরকারপ্রধান হিসেবে জাতিসংঘসহ সবখানে বাংলাদেশকে বলিষ্ঠভাবে উপস্থাপনের পাশাপাশি বিশ্বব্যাংকের মতো আন্তর্জাতিক সংগঠনের অভিযোগের বিরুদ্ধে গিয়ে নিজ উদ্যোগে পদ্মা সেতুর মতো বিশাল প্রকল্প হাতে নেয়া – শুধু নারী নয়, এভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা যথেষ্ট সাহসের পরিচয় দেয়। এমনকি বাংলাদেশের বিরোধী দলীয় নেতা এবং জাতীয় সংসদের স্পিকার হওয়াটা বাংলাদেশকে নারী নেতৃত্বের বড় একটি উদাহরণ হিসেবে বিশ্বের কাছে তুলে ধরতে পারে।

নারী নেতৃত্বের দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় এগিয়ে আছে ইউরোপ। এমনই এক নারী নেতৃত্ব জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মেরকেল। ১৯৮৯ সালে রাজনীতিতে তার প্রবেশ। এরপর সরকারের ডেপুটি-মুখপাত্র, সংসদ সদস্য, একের পর এক নির্বাচনে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, নিজ রাজনৈতিক দল সিডিইউ’র প্রথম নারী মহাসচিব এবং সবশেষে ২০০৫ সালের ফেডারেল নির্বাচনে জার্মানির চ্যান্সেলর হিসেবে নির্বাচিত হওয়া। জার্মানির প্রথম নারী চ্যান্সেলর হওয়ার গৌরবও মেরকেলের দখলে।

নিজ দেশে জনপ্রিয় মেরকেল। এর প্রমাণ হিসেবেই ২০০৫ থেকে শুরু করে পরবর্তী সবগুলো নির্বাচনে প্রতিপক্ষ দলগুলোকে বিপুল ভোটে হারিয়ে বারবার চ্যান্সেলর হওয়ার সুযোগ পেয়েছেন তিনি।

ফোর্বসের তালিকায় বিশ্বের ক্ষমতাশালী নারীদের তালিকায় এখন এক নম্বরে থাকা অ্যাঙ্গেলা মেরকেল ২০০৭ সালে ইউরোপিয়ান কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। ওই সময় দ্বিতীয় নারী হিসেবে জি৮ সম্মেলনে প্রধানের দায়িত্বও পালন করেন তিনি।

সদ্য ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে আসা যুক্তরাজ্যের নতুন প্রধানমন্ত্রী টেরেসা মে। ব্রেক্সিটের পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন পদত্যাগ করলে ওই সময়টায় ব্রিটিশ কনজার্ভেটিভ পার্টি এবং একই সঙ্গে পুরো যুক্তরাজ্যের নেতৃত্ব নিজের কাঁধে নেন টেরেসা। যুক্তরাজ্যের দ্বিতীয় নারী প্রধানমন্ত্রী তিনি, তার আগে ছিলেন লৌহমানবী মার্গারেট থ্যাচার।

যুক্তরাষ্ট্র সার্বিকভাবে একজন নারীকে তাদের শাসক হিসেবে মেনে নিতে না পারলেও যুক্তরাজ্য সেই মনোভাব দেখায়নি। তাই জনগণের সমর্থনের মধ্য দিয়েই হঠাৎ ইইউ থেকে বেরিয়ে আসার অর্থনৈতিক ও সামাজিক ধাক্কা শক্ত হাতে মোকাবিলা করছেন টেরেসা মে। নারী বলে নিজের কঠোর অবস্থান থেকে তাকে নড়াতে পারেনি কেউ।

নারী নেতৃত্বের পথে এভাবেই কোথাও ব্যর্থতা উঁকি দিলেও একই সময়ে অন্য কোথাও দেখা যাচ্ছে সাফল্যের আভা। তবে ব্যর্থতাটুকুও যে সাময়িক, পরিবর্তন যে আসবেই, তা সময়ের সঙ্গে মানুষের পরিবর্তনশীল দৃষ্টিভঙ্গিই বুঝিয়ে দেয়।