মেইন ম্যেনু

হোটেলের থালা মেজে রানা এখন আইনজীবী

ছিলেন ফুটপাথের হোটেল বয়৷ এখন তিনি আইনজীবী৷ এগরার পূর্ণেন্দু মাইতির (রানা) উত্থান অনেকটা ‘থ্রি ইডিয়টস’ সিনেমার র্যাঞ্চোর মতো। গ্রাম থেকে রুটি -রোজগারের খোঁজে এসেছিলেন রানা৷ ব্যাঙ্কশাল কোর্টের পেশকারদের ফাইফরমাশ খাটতেন৷ কিন্ত্ত আইনের ধারা , উপধারার দিকে তাঁর কান ছিল সজাগ৷ তাঁর ইচ্ছাশক্তি নজর কেড়েছিল আদালতের এক বিচারক ও এক আইনজীবীর৷ তাঁদের প্রয়াসেই রানা এখন ব্যাঙ্কশাল কোর্টের কালো কোটের এক তরুণ আইনজীবী৷

একসময় আস্তানা বলতে ছিল ব্যাঙ্কশাল আদালতের বাইরের ফুটপাথ৷ ঝড়-জল-বৃষ্টিতে দিনের পর দিন ফুটপাথেই দিন কাটাতে হয়েছে তাঁকে৷ এখন জোড়াবাগানে এক ভাড়া বাড়িতে স্ত্রী-পুত্র নিয়ে সচ্ছল পরিবার আইনজীবী রানার৷ জীবনে কঠিন লড়াই করে উঠে আসা রানার জীবনের এখন পণ, আর্থিক ভাবে অসহায়দের যতটা সম্ভব আইনি সহায়তা করা৷ সালটা ২০০৩!

আইনি বিষয়ে উত্সাহ দেখে ১৮ বছর বয়সি রানাকে আইন নিয়ে পড়াশোনা করার পরামর্শ দিয়েছিলেন ব্যাঙ্কশাল আদালতের তত্কালীন ৬ নম্বর মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট শম্পা দত্তপাল৷ এখানেই শেষ নয়৷ ভর্তির ফর্ম তোলার জন্য তাঁর হাতে তুলে দিয়েছিলেন টাকা, কীভাবে প্রবেশিকা পরীক্ষার প্রস্ত্ততি নিতে হবে , সে বিষয়ে সহায়তা করেছিলেন ওই বিচারক৷ শনিবার তিনি বলেন, ‘ওঁর সাফল্যে আমি খুব খুশি৷ রানার মধ্যে পড়াশোনার প্রতি একটা আগ্রহ দেখেছিলাম৷ সেটাই তাঁকে সফল করেছে৷’

কিন্তু শুধু ভর্তি হলেই তো হবে না, আইন পড়তে অনেক খরচ৷ সে কথা ভেবেই ফর্ম তুলেও পিছয়ে আসবে ভেবেছিলেন রানা৷ কিন্ত্ত সেই সময় তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন আরও একজন৷ হাইকোর্টের আইনজীবী শান্তনু ভট্টাচার্য৷ রানার সবরকম বিপদে পাশে থেকেছেন তিনি৷

শান্তনুর কথায়, ‘ব্যাঙ্কশাল আদালতে রানার সঙ্গে পরিচয়৷ ওঁর সততা আমার ভালো লেগেছিল৷ আমার ইচ্ছে ছিল, রানা জুডিশিয়াল সার্ভিস নিয়ে পড়াশোনা করুক৷ সেটা হয়তো সম্ভব হয়নি৷ কিন্ত্ত ও যে জায়গাটা অর্জন করতে পেরেছে তাতেই আমি খুশি৷ আইনজীবী হিসাবে ভালো কাজ করছে৷’

কিন্ত্ত রানার এই উত্তরণের পথটা কতটা কঠিন ছিল, শনিবার কিরণশঙ্কর রায় রোডের চেম্বারে বসে সেটাই শোনালেন ওই আইনজীবী৷ তিনি জানান, পূর্ব মেদিনীপুরের এগরার বাসিন্দা রানা৷ তাঁরা তিন ভাই-বোন৷ বাবা ধীরেন্দ্র মাইতি রিকশা চালাতেন৷ মা লোকের বাড়িতে ধান-মুড়ি ঝাড়ার কাজ করতেন৷

কোনওদিন খালি পেটে তো কোনওদিন আধপেটা খেয়ে কেটেছে শৈশব৷ আর্থিক দুরবস্থার জন্য বড় মেয়ের পড়া বন্ধ করে দিতে বাধ্য হন রানার বাবা৷ কিন্ত্ত কোনও পরিস্থিতিতেই নিজের পড়াশোনা ছাড়তে রাজি ছিল রানা৷ তাই ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময় থেকেই মাঠে লাঙল দেওয়া , ধান মজুত করার মতো কাজ করে পড়াশোনা চলতে থাকে৷

এ ভাবে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত চললেও বাবার একটি দুর্ঘটনা আরও কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে এনে দেয় কিশোর রানাকে৷ রিক্শার সঙ্গে গাড়ির ধাক্কায় আহত রানার বাবা শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন৷ দিদির বিয়ে হয়ে গিয়েছে৷ বাড়িতে অসুস্থ বাবা, ছোট-বোন ও মা৷ সংসারের হাল ধরতে পড়াশোনা ছেড়ে গ্রামের একটি কারখানায় কাজে ঢোকেন রানা৷

এর পরই ভালো রোজাগারের আশায় গ্রামের এক ‘কাকু’র সহায়তায় ২০০৩ সালে শহরে পা রাখেন রানা৷ ব্যাঙ্কশাল আদালতের ২ নম্বর গেটের বাইরে তাঁর সেই ‘বাপি কাকু’র ফুটপাথের খাওয়ার হোটেলে কাজ শুরু করেন৷ হোটেলে প্লেট ধোয়া , সব্জি কাটা , খাবার দেওয়াই ছিল তাঁর কাজ৷ সেই সঙ্গে সেই সময় মেট্রোপলিটন আদালতে থাকা ক্যান্টিনেও কাজ শুরু করেন৷ তবে গ্রামের ছেলের কষ্ট করে পড়াশোনা করার কথা জানতেন তাঁর ‘বাপি কাকু’ও৷

তাই আদালতের কয়েকজন পেশকারের কাছে ওই কিশোরকে সাহায্য করার আবেদন জানিয়েছিলেন ওই হোটেল মালিক৷ রানা আরও জানান, ইংরেজিতে একটি চিঠি লিখতে দিয়েছিলেন একজন পেশকার৷ মোটামুটি লিখতে পাড়ায় ৬ নম্বর আদালতের পেশকারদের দেওয়া বিভিন্ন কাজ করতে শুরু করেন তিনি৷

মিলত অল্প কিছু পারিশ্রমিক৷ এই সবের মধ্যেই আদালতে চলতে থাকা সওয়াল-জবাব আকৃষ্ট করত তাঁকে৷ একদিন আদালতের বিচারক শম্পা দত্তপালের নজরে চলে আসেন রানা৷ রানার কথায়, ‘ম্যাডাম যখন আমার রেজাল্ট দেখতে চান, ফর্ম ফিলাপ করে দেন, পুরোটা স্বপ্নের মতো লাগছিল৷’

এর পরই সুরেন্দ্রনাথ ল কলেজে ভর্তি, কাজের সঙ্গে সঙ্গে আইনি পড়াশোনা৷ ‘ম্যাজিস্ট্রেট ম্যাডাম’, ‘শান্তনুদা’ ‘বাপিকাকু’ ‘পেশকার কাকু’দের মতো লোকেদের সাহায্যে ২০০৯ সালে আইন পাশ করে ব্যাঙ্কশাল আদালতের পাশাপাশি রানা এখন হাইকোর্টেও কাজ করছেন।-এই সময়