মেইন ম্যেনু

২৫ বছর পর হারিয়ে যাওয়া মাকে খুঁজে পেলেন ছেলে

ধরুণ আপনি আপনার মাকে হারিয়েছেন আজ থেকে ২৫ বছর আগে। আর সেই হারিয়ে যাওয়া মাকে ফিরে পেলেন ২৫ বছর পর! এমন প্রাপ্তি সত্যিই কি বিস্ময়কর নয়? হারানো-প্রাপ্তির এ এক অবিশ্বাস্য গল্প। মায়ের সঙ্গে সন্তানের এই মিলনকাহিনির নাটকীয়তা বলিউডি সিনেমাকেও হার মানাতে পারে।

আজ থেকে বছর তিরিশেক আগে মধ্যপ্রদেশের খাণ্ডোয়া অঞ্চলের এক দরিদ্র পরিবারে জন্ম শেরু মুনশি খানের। শেরু যখন ছোট, তখনই তার বাবা তার মা-কে ছেড়ে চলে যায়। দারিদ্র্যের তাড়না সহ্য করতে না পেরে শেরুর মা বাধ্য হন নিজের তিন সন্তানকে ভিক্ষাবৃত্তিতে পাঠাতে। শেরু তার দুই দাদার সঙ্গে ট্রেন স্টেশনে ভিক্ষা করা শুরু করে।

এক সন্ধ্যায় এক বুরহানপুরগামী এক ট্রেনে দাদা গুড্ডুর সঙ্গে চড়ে বসে শেরু। ট্রেন যখন গন্তব্যে পৌঁছয়, তখন ক্লান্তিতে শেরু ঘুমিয়ে পড়েছে। গুড্ডু তাকে ট্রেনে একা রেখে চলে যায়।

যখন শেরুর ঘুম ভাঙে, তখন পাশের প্ল্যাটফর্মে আর একটি ট্রেন দাড়িয়ে। গুড্ডুর মনে হয়, ওই ট্রেনেই হয়তো আছে তার দাদা। শেরু উঠে পড়ে সেই ট্রেনে। ট্রেনে উঠে ক্লান্তির চোটে আবার ঘুম। অজানা রেলপথে চলতে চলতে শেরু এসে পৌঁছয় হাওড়া স্টেশনে। রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে আর স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে শুয়ে কয়েকদিন কেটে যায় শেরুর। অবশেষে তার চেয়ে বয়সে কিছু বড় এক কিশোরের সাহচর্যে সে ঠাঁই পায় এক সরকারি হোমে, যে হোম তার মতো আরও অনেক গৃহহীন শিশুর আস্তানা। কিছুকাল পরে অস্ট্রেলিয়ার তাসমানিয়ার এক পরিবার শেরুকে দত্তক নেয়।

শেরুর মা তখন ওদিকে ব্যাকুল হয়ে খুঁজে চলেছেন তার হারানো ছেলেকে। কিছুদিন পরে তার কানে আসে ট্রেনে কাটা পড়ে গুড্ডুর মৃত্যুসংবাদ। কিন্তু শেরুকে অনুসন্ধানের কাজ তার অব্যাহত থাকে।

ইতিমধ্যে অস্ট্রেলীয় পরিবেশে বড় হতে থাকে শেরু। বড় হয়ে ক্যানবেরা কলেজে বিজনেস এ্যান্ড হসপিটালিটি নিয়ে পড়া শুরু করে সে। কিন্ত মায়ের কথা সে ভুলে যায়নি। ‘গুগল আর্থ’-এ সে হাওড়া স্টেশন থেকে চারদিকে ছড়িয়ে পড়া রেল লাইনগুলোকে নিবিড়ভাবে অনুসরণ করতে থাকে। বিভিন্ন স্টেশনের নামগুলো ঘাঁটতে ঘাঁটতে বুরহানপুর নামটা যেন তার মনের তন্ত্রীতে কিঞ্চিৎ নাড়া দিয়ে যায়। তার নিকটবর্তী স্টেশন খাণ্ডোয়া নামটা আরও পরিচিত লাগে তার। বিশেষত, সেই স্টেশনের নিকটবর্তী একটা ফোয়ারার সঙ্গে কী যেন এক গোপন যোগাযোগ তার রয়েছে বলে তার মনে হয়। ফেসবুক মারফৎ খাণ্ডোয়ানিবাসী এক দল মানুষের সঙ্গে আলাপ জমায় শেরু।

কাহিনির পরের অংশটি অনুমান করা কঠিন নয়। শেরু পৌঁছে যায় খাণ্ডোয়ায়। পঁচিশ বছর আগে তোলা মায়ের সঙ্গে শেরুর একটি ফোটোগ্রাফ খাণ্ডোয়ার মানুষজনকে দেখিয়ে সে খুঁজে বার করে তার মা-কে। নিজের এক বোন আর ভাই-এর সঙ্গেও পুনর্মিলন ঘটে যায় তার।

বর্তমানে শেরু থাকে অস্ট্রেলিয়ার হোবার্টে। কিন্তু নিজের পরিবারের সঙ্গে ইন্টারনেট মারফৎ নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছে সে। সম্প্রতি হারানো মায়ের সঙ্গে পুনর্মিলনের অবিশ্বাস্য কাহিনি নিয়ে শেরু লিখেছে একটি বইও, নাম দিয়েছে ‘আ লং ওয়ে হোম’। প্রযুক্তি যে কীভাবে অসম্ভবকে সম্ভব করে তুলতে পারে, তারই এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত শেরুর এই জীবনকাহিনি।