মেইন ম্যেনু

৩ যুগ পূর্তিতে জাথির সাগর দর্শন

শাহাদাত হোসাইন স্বাধীন : এক এক করে গৌরবের সাথে ৩৬ টি বছর পার করল বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের প্রথম থিয়েটার জাহাঙ্গীরনগর থিয়েটার।কত স্বপ্ন,সাধনা আর হার না মানা গল্প দিয়ে বাধাঁনো জাহাঙ্গীরনগর থিয়েটার।এই থিয়েটার জন্ম দিয়েছে সেলিম আল দ্বীন, হুমায়ুন আহমেদ,ফারুক আহমেদ,শুভাশীষ ভৌমিক,শহীদুজ্জামান সেলিম আর অলোক কুমার রায়ের মতো উজ্জ্বল নাট্য ব্যক্তিত্ব। তিন যুগ পূর্তিতে ৬ ফেব্রুয়ারি থেকে ১১ ফেব্রুয়ারি নাটক উৎসব করে জাহাঙ্গীরনগর থিয়েটার। নাটক উৎসব শেষে থিয়েটার এবার আড্ডা জমালো বিশ্বের বৃহত্তম সমুদ্র সৈকত কক্সবাজারে।

গত ২২-২৪ সেপ্টেম্বর জাহাঙ্গীরনগর থিয়েটার পরিবার মেতেছিলো সমুদ্র দেখার উল্লাসে। অনেকটা হুট হাট জরে সিদ্ধান্ত। ফেব্রুয়ারিতে তিন যুগ পূর্তিত সবার সাথে সবার দেখা। সেই দেখায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে সবাই সবার সাথে সংযুক্ত হয়। খোলা হয় জাহাঙ্গীরনগর থিয়েটার পরিবার নামে একটি ক্লোজ গ্রুপ। সেই গ্রুপে প্রতিদিন আড্ডা জমছে বেশ। একদিন থিয়েটার পরিবারের ২৪ ব্যাচের ফিজনূর রহমান সাগর ভাইয়ের পোস্ট “একটি আডডা কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে হলে কেমন হয় “।

আরে দারুণ আইডিয়া। সাগর পাড়ে আড্ডা জমাতে ঢাকায় ছোটখাটো একটি মিটিং সেরে ফেলে জাহেদুল আলম হিটো ভাই, (২১ তম ব্যাচ) ; সাফায়েত আলম ভাই, (২২ তম ব্যাচ),পিন্টু চ্যাটার্জী দাদা(১৯ তম ব্যাচ),সাজ্জাদ হোসেন (২৩ তম ব্যাচ) , তাপসী রাবেয়া স্মৃতি দিদি (২৭ ব্যাচ), অপূর্ব দাশ অপ ভাই (৩২ তম ব্যাচ) সহ আরও অনেকে।

সফল মিটিং শেষে সবার চোখে তখন শুধু সাগরের উত্তাল ঢেউ। ২২ সেপ্টেম্বর যাওয়ার সিদ্ধান্ত হলো।

কাঙ্খিত দিনে সন্ধ্যায় বর্তমান নাট্য শ্রমিকরা ক্যাম্পাস বাসে ক্যাম্পাস থেকে রওনা হলাম কমলাপুরের উদ্দেশ্যে। পরিবারের বাকী সদস্যদের নিয়ে আজ রাত ১০ টায় থিয়েটার পরিবারের ট্টেন ছেড়ে যাবে চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে।

হ্যাঁ থিয়েটারের ট্রেন। ট্রেনের একটি বগিতে যদি লিখা থাকে (আসন সংরক্ষিত,জাহাঙ্গীরনগর থিয়েটার) তবে তো ট্রেন টা থিয়েটারের হবেই।

রেল ষ্টেশনে থিয়েটার পরিবারকে বিদায় জানান থিয়েটারের রুকুনুজ্জামান ভাই, বিদায় বেলায় কিনে দেন ৪ লিটার কোল ড্রিংকস। বড় ভাই বিদায় দিতে এসেছে অনুজদের।

ট্রেন টু কক্সবাজার যখন ছেড়ে দিলো তখন সবাই গলা ছেড়ে দিয়ে গেয়ে উঠল “চলো না ঘুরে আসি অজানা দেশে,যেখানে নদী এসে থেমে গেছে”।সেই যে গান শুরু হলো আর শেষ হওয়ার নয়।

শুরুতে নিহাত ভাইয়ের দোতারা আর দীপের খঞ্জনী দিয়ে শান্তা গান ধরলেও ধীরে ধীরে অমিতের ঢোল আর সৈকত ভাইয়ের গলায় গান জমে উঠে। সিনিয়র চুপটি মেরে থাকতে চাইলেও পারেনি। গানে যোগ দেন তুলি আপু,অপূর্ব ভাই। সাজ্জাদ ভাই ফেসবুক লাইভে মাঝরাতের গানের আড্ডা শেয়ার করতে মোটেই কৃপণতা করতে রাজি না।

ট্রেন চলছে,মাঝরাতের ট্রেন। গানের আসর, জমছে বেশ। রাত যত বাড়ছে রাত জাগা পাখিগুলো যোগ দিচ্ছে আসরে। অনেকদিন পর থিয়েটারেরর এই মধুর মিলনে সবাই এমনিতে উৎফুল্ল, তাতে সবাই মিলে একসাথে গান করার তো তুলনা হয় না। গানের মাঝে আড্ডার বিরতি আসে। সেই আড্ডায় উঠে আসে কে কোন গান কীভাবে গায়ত আর কোন চরিত্র ভালো করত।সিনিয়রদের এই পুরানো দিনের স্মৃতি চারণ ভালোই লাগে বর্তমান থিয়েটারের নবীন কর্মীদের।

এমন একটি রাতকে স্মরনীয় রাখতে গানে গলা মিলিয়েছে সবাই ১৯ ব্যাচের পিন্টু চ্যাটার্জী ভাই থেকে ৪৫ ব্যাচের মুগ্ধ।
নানা বাদ্যযন্ত্রে ঠুনঠুন তালে অতিথী হিসেবে আসা অপূর্ব ভাইয়ের স্ত্রী অদিতি ভাবীর রবীন্দ্র সংগীত রাতটা আরেকটু সুরেলা করে তোলে।

গুড মনিং চিটাগাং। গানের তালে তালে কবে যে সকাল হয়ে গেছে কেউ টেরই করতে পারেনি। সকাল ৮ টায় ট্রেন পৌছঁল চট্টগ্রাম রেলষ্টেশনে। আর প্রকৃতি উপহার দিল এক রৌদ্দোজ্জ্বল সকাল। রেলষ্টেশনে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে ঝটপট সকালের নাস্তা সেরে বাসে সমুদ্রের শহর কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে রওনা হল থিয়েটার পরিবার।

থিয়েটার পরিবার সাগর দেখতে যাচ্ছে,নেতৃত্বে আছেন স্মৃতি দিদি। তিনি মমতাময়ী তিনি নারী তিনি নেত্রী তিনিই স্মৃতি দি। কাউকে সিডিউল পেপার ধরিয়ে না দিয়েও শৃঙ্খলাবোধ আর উৎসবের রঙে আগলে রেখেছেন সবাইকে।

সবাই কক্সবাজার পৌছেই হোটেল রুমে ফ্রেশ হয়ে সোজা সমুদ্রস্লান। সমুদ্র ডাকছে সবাইকে । সমুদ্রে লাফালাফি,গ্রুপ ছবি,ঢেউয়ের বিপরীতে ঝাপঁ, যারা পানিতে নামতে চাচ্ছে না তাদের ভিজিয়ে দিয়ে চিৎকার আর উল্লাসে থিয়েটারের সবাই উচ্ছাসিত। পলাশ ভাইয়ের মত যারা সমুদ্রে প্রথম এসেছে তারা লবণাক্ত পানি মুখে নিয়েয়ে পরখ করতে ভূলে নি।

সমু্দ্র অস্তের অপার সৌন্দর্য্য উপভোগ করে বার্মিজ মার্কেটে কেনাকাটা সেরে সবাইকে হোটেলে বিশ্রাাম নিতে বলে স্মৃতি দি। ১৫/১৬ ঘন্টার পর আসলেই একটা বিশ্রাম দরকার।

কিন্তুু বিশ্রাম নিতে কেউ রাজি না,হোটেলে ব্যুফেতে রাতের খাবার খেয়ে নাম মাত্র বিশ্রাম নিয়ে হারমোনিয়াম, তবলা,গিটার আর খঞ্জনী হাতে আবার সমুদ্র পানে।

ঘড়িতে রাত ১২ টা ছুঁই ছুঁই। বীচে সবাই গোল করে বসে মাঝরাতে সমুদ্রে গানের আসর জমছে। ৪৪, ৪৩,৪২ ব্যাচের সবাই বাদ্যযন্ত্র হাতে তাল দিচ্ছে আসরে। “এখন অনেক রাত,তোমার কাধেঁ আমার নিঃশ্বাস ” “বকুল ফুল বকুল ফুল সোনা দিয়া হাত কেন বান্ধাইলি””যৌবন গেলে আর প্রেম হবে না ” মধু হয় হয় আরে বিষ হাওয়ালা “”গানের ট্রেন থামছেই না।

এই তরুণরা যেমন দক্ষ অভিনেতা,অসাধারণ গায়ক তেমনি সৃষ্টিশীল বাজক। এমন দক্ষ টিমে সন্তুষ্ট সিনিয়ররা। এমন একটি থিয়েটার পরিবার ই চেয়েছিলাম অভিন্ন সুর স্মৃতি দিদি,হিটু ভাই,শাফায়েত ভাই,পিন্টু ভাই অপূর্ব ভাই আর সাজ্জাদ ভাইয়ের। রাত যখন ২ টা তখনো চলছে গানের আসর।কিন্তুুু কাল সকালে ইনানী বীচ আর হিমছড়ি দেখতে চাইলে অন্তত এই রাতটা বিশ্রাম দরকার। হোটেলে ফিরে ঘুমানোর কথা থাকলেও সবাই সারাদিনের ছবি ফেসবুকে আপলোডে ব্যস্ত হয়ে পড়ে,হোটেল ওয়াইফাইয়ের কল্যাণে। সকাল ১০ টার পর হোটেল ব্রেকফাস্ট না পাওয়ার ভয়ে রাত চোখের পাতা বন্ধ করে সবাই।

পরদিন সকালে ব্রেকফাস্ট সেরে ইনানাী বীচে যেতে সবাই প্রস্তুত। এসে গেছে টমটম গাডিও। সব সময়ে সময়ে। হবেই বা না কেন নেতৃত্ব দিচ্ছেন স্মৃতি দিদি,মাথার উপর হিটু ভাই আর পিন্টু দা। পাশে আছেন হ্রদয় ভাই আর অপূর্ব ভাই,সব তো ঠিকঠাক হতে হবে। থিয়েটার যে নেতৃত্ব বিকাশের একটি প্লাটফরম তাই যেন মনে করিয়ে দিচ্ছে।

টমটম গাড়ি চলছে ইনানীর উদ্দেশ্যে মেরিন ড্রাইভ রোড় হয়ে। একপাশে সাগর অন্য পাশে পাহাড়।

যুগ যুগ ধরে সৌন্দর্য্য প্রেয়সীদের এই সৌন্দর্য্য মুগ্ধ করেছে। এই যেন কল্পনা রাজ্য। সাগর আর পাহাড়ের মাঝখানে রৌদ্দোজ্জ্বল দুপুর। এই সৌন্দর্য পৃথিবীর কোন ক্যামেরা ধারণ করতে পারবে না। শুধু মাত্র মনের ক্যামেরায় ধারন সম্ভব। ইনানী বীচে পৌঁছে শান্তা আর আয়েশা তো এক চিৎকার,”অপূর্ব এই পৃথিবী, শত বছর বাচঁতে চাই এই পৃথিবীর তরে”।

“ইশ্বর যদি সমুদ্র সৃষ্টি না করত তবে এই পৃথিবীর সৃষ্টি অপূর্ণ থেকে যেত।এই রোমাঞ্চ শুধু দুু”হাত ভরে নেয়ার। ” পলাশ ভাইয়ের এই কথায় সায় দিয়ে পিয়াল দা সাগরের পানে দুহাত মেলে সব অপূর্ণতাকে জলাঞ্জলি দিচ্ছিলো ।

ইনানী বীচের সৌন্দর্য্য মগ্ধ সৌন্দর্য্য প্রেমীরা ক্যামেরার ক্লিকে স্মৃতি ধরে রাখতে ব্যস্ত রেখেছে ফটোগ্রাফার মুগ্ধকে। ইনানী বীচ হতে বিদায় নিয়ে পাহাড়। আর ঝর্ণার মিতালী হিমছড়ির পথে যাত্রা। কক্সবাজারের সুস্বাদু ডাব খাওয়া বাকী, কক্সবাজার এসে সুস্বাদু ডাব খাওয়া হবে না তা তো হয় না। কিন্তুু হিমছড়ি পৌঁছে সবাই পাহাড় ঝর্নার মিতালীতে মুগ্ধ হয়ে ডাবের কথা ভূলে গেছে।

ঝর্ণা দর্শন শেষে সিনিয়রদের ফেরার তাগাদা। যেতে হবে লোহাগাড়া। সাগর ভাইয়ের বাসায়। সাগর ভাইয়ের বাসায় গোশত -রুটির দাওয়াত। সেখানে আরেকটি আড্ডা দেয়া বাকী। থিয়েটার পরিবারের কঠিন সময়ের কান্ডারী সাগর ভাই অপেক্ষা করছে তার হাতে গোছানো থিয়েটার পরিবারকে বরন করতে।

সাগর বাসায় পৌঁছে গোশত রুটি খেতে খেতে আড্ডা জমিয়ে ফেলেছে থিয়েটারের সিনিয়ররা। পুরনো দিনের গল্প। কত কথা জমানো আজকের জন্য।আড্ডায় বর্তমান নাট্যকর্মীদের দূর্দান্ত পারফরমেন্স নিয়ে প্রশংসা ছিলো,উৎসাহ ছিলো। উঠে আসে থিয়েটারের কঠিন সময়ে স্রোতের বিপরীতে দাড়াঁনোর সাহসের কথা,ধৈর্যের কথা, থিয়েটারের প্রতি ভালবাসার কথা। মন্ত্র মুগ্ধের মত শুনছিলো অপেক্ষাকৃত জুনিয়ররা।কারণ এই সোনালী ইতিহাস ই তাদের চলার পথের পাথেয় হয়েয়ে থাকবে।

বিকাল গড়িয়ে পশ্চিম আকাশে সূর্য় অস্ত যাচ্ছে।আর আমাদের ও ফেরার পালা। আমরা ফিরে যাচ্ছি ঢাকায়। যান্ত্রিক শহরে,বাস্তবতার টানে।
ফিরছি তো ফিরছি খালি হাতে নয়। একগুচ্ছ অভিজ্ঞতা আর প্রেরণা নিয়ে।

৮ম ব্যচ থেকে ৪৫ ব্যাচ একসাথে ট্যুরে গিয়ে অলিখিত শৃঙ্খলা আর শ্রদ্ধা বোধ নিয়ে জমাতে পারে গানের আসর তা থিয়েটারের ট্যুরে না আসলে বুঝা যাবে না।

থিয়েটার কর্মীদের কাজের প্রতি এই দায়িত্ববোধ, নাটকের প্রতি ভালবাসা আর সিনিয়রদের প্রতি এই শ্রদ্ধাবোধ আর সময়ানুবর্তীতা জাহাঙ্গীনগর থিয়েটার বাচিঁয়ে রাখবে আরও ৩ শ যুগ।

ভালো সময়, কঠিন সময় আসবে। কিন্তুু কীভাবে নেতৃত্ব আর ধের্য্য দরকার তার প্রেরণা সাগর ভাইয়ের বাসার আড্ডায় খুজেঁ পেয়েছে থিয়েটারের নবীণপ্রাণ।

বেচেঁ থাকুক জাহাঙ্গীরনগর থিয়েটার শত জনম।