মেইন ম্যেনু

৪০০ আসামী’কে ফাঁসি দেয়া এক জল্লাদের অজানা গল্প

ফাঁসির বিপক্ষে অন্যান্য দেশের মধ্যে অন্যতম দেশ ব্রিটেন। ১৯৬৫ সালের নভেম্বরে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে মৃত্যুদণ্ডের বিধান স্থগিত করা হয়। এ আইন পাস হওয়ার আগে দেশটিতে অনেক মানুষকে ফাঁসিতে ঝোলানো হতো।

১৯৫০-এর দশক পর্যন্ত ব্রিটেনে ফাঁসি কার্যকরের জন্য সবচেয়ে পরিচিতি পাওয়া জল্লাদ ছিলেন আলবার্ট পিয়েরপেয়ন্ট। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানির দু’শতাধিক যুদ্ধাপরাধী ও ব্রিটেনের অনেক কুখ্যাত খুনিসহ অন্তত চার শতাধিক লোককে ফাঁসিতে ঝুলিয়েছেন জল্লাদ আলবার্ট।

আলবার্টের কাছে ফাঁসি দেয়ার কাজটা ছিল তার পেশার মতোই। তার বাবা-চাচাও ছিলেন সরকারের তালিকাভুক্ত জল্লাদ। বাংলাদেশে জল্লাদের তালিকায় থাকেন ভয়ঙ্কর কোনো খুনি বা দাগী আসামি। কিন্তু আলবার্ট তেমনটা নয়, তার কাজই ছিল ফাঁসি কার্যকর করা। বিনিময়ে তিনি পেতেন অর্থ। পাশাপাশি মুদি ও মদের দোকানও ছিল তার।

আলবার্টের জন্ম ১৯০৫ সালে ইংল্যান্ডের ইয়র্কশায়ারে। ক্লাসে একদিন শিক্ষার্থীদের নিজের লক্ষ্য লিখতে বলেন শিক্ষক। সবাই দ্রুত লিখতে শুরু করলেও আলবার্ট কী হতে চান খুঁজে পাচ্ছিলেন না তিনি। অবশেষে জল্লাদ হওয়ার বিষয়টি জীবনের লক্ষ্য হিসেবে লিখেন। বাবা-চাচার পথ অনুসরণ করে আলবার্ট জল্লাদ হওয়ার স্বপ্ন পূরণ করার সুযোগ পান ১৯৩২ সালে। এ কাজের জন্য ব্রিটিশ সরকার তার সাক্ষাৎকার নেয়।

পরে সংক্ষিপ্ত প্রশিক্ষণ কোর্স করেন তিনি। এরপর সহকারী হিসেবে জল্লাদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হন আলবার্ট। তবে জল্লাদের কাজটি গোপনীয়তা রক্ষা করে করতেন আলবার্ট। তার স্ত্রীকেও এ বিষয়ে জানাননি। অবশ্য পরে বিষয়টি বুঝতে পেরেছিলেন তার স্ত্রী।

জল্লাদ হিসেবে আলবার্ট প্রথম ফাঁসি দেন ১৯৪১ সালে। এর মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে যায় যে, ফাঁসি কার্যকরে অত্যন্ত দক্ষ তিনি। তবে তিনি বলতেন, তাদের অপরাধ যা-ই হোক- দণ্ড কার্যকরের সময় দণ্ডপ্রাপ্তদের সঙ্গে সবসময়ই সম্মান ও ভালো আচরণ করতেন। ফাঁসি দেয়ার সময় তিনি অত্যন্ত শান্ত থাকতেন, তার আচরণ ছিল নম্র এবং ব্যাপারটা সেরে ফেলতেন অত্যন্ত দ্রুতগতিতে।

মৃত্যুর আগে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে আলবার্ট বলেন, আমাদের কারাগারে যেতে হতো বিকেল ৪টার দিকে। সেখানে গভর্নরের সঙ্গে দেখা হতো, তার সঙ্গে কথাবার্তা সেরে নিতে হতো। এরপর ফাঁসির নানা আয়োজন সম্পন্ন করা, ফাঁসির মঞ্চ প্রস্তুত করা- এসব করতে হতো তাকে। দণ্ডিত ব্যক্তির ফাঁসি কার্যকর করতে কত সময় লাগে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এটা নির্ভর করে কোন কারাগারে ফাঁসিটা হচ্ছে তার ওপর।

কোনো কারাগারে কনডেমড সেল থেকে ফাঁসিমঞ্চ খুবই কাছে আবার কোনোটা জেলের আরেক প্রান্তে। এমনও হয় যে, ফাঁসির ব্যাপারটা মাত্র ১৬ সেকেন্ডে শেষ হয়ে যায়। ব্রিটেনের সবচেয়ে কুখ্যাত খুনিদের ফাঁসি দিয়ে এক নম্বর জল্লাদ হিসেবে এরই মধ্যে নাম লিখিয়েছেন আলবার্ট।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সরকার যখন ঘোষণা করলো যে কমপক্ষে ২০০ দণ্ডিত নাৎসি যুদ্ধাপরাধীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে তাকে জার্মানি নিয়ে যাওয়া হবে— তখন ব্রিটেনে তার খ্যাতি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। আলবার্ট জোর দিয়ে বলতেন, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সময় কোনো রকম আবেগ প্রকাশ করতাম না।

তিনি বলেন, একবার একজন পরিচিত লোকের ফাঁসি কার্যকর করেছিলেন। তার মদের দোকানের ক্রেতা হিসেবে আসতেন তিনি। আলবার্ট বিষয়টি জানতেন না। ফাঁসি কার্যকর করতে গিয়ে লোকটি তাকে চিনে ফেলেন।

১৯৫৬ সালে আলবার্টের সঙ্গে পারিশ্রমিকের পরিমাণ নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবাদ হলে পদত্যাগ করেন তিনি। এরপর আর কখনোই ওই চাকরিতে ফেরেননি তিনি।

আলবার্ট জল্লাদ জীবনে চার শতাধিক লোককে ফাঁসি দিয়েছেন। এর মধ্যে নারী-পুরুষ, তরুণ-বৃদ্ধ– সব রকমের মানুষ ছিলেন। জল্লাদের কাজ থেকে অবসর নেয়ার পর আলবার্ট তার মদের ব্যবসা চালান। ১৯৯২ সালে মারা যান তিনি। সূত্র : বিবিসি