মেইন ম্যেনু

৪২ বছরে এত গোল খায়নি বাংলাদেশ!

এ বছরটা বাংলাদেশের ফুটবলের জন্য ‘অন্যরকম’ এক বছর। যে আন্তর্জাতিক ম্যাচ নিয়ে হাহাকার ঝরে পড়ত বাংলাদেশের ফুটবলারদের কণ্ঠে, সেই আন্তর্জাতিক ম্যাচের হাহাকারটা এ বছর দূর হয়েছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক ফুটবলের মঞ্চটা যে কত কঠিন, সেটা বাংলাদেশের ফুটবল খুব ভালোভাবেই উপলব্ধি করতে পেরেছে।

স্বাধীনতার পর ২০১৫ সালেই বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি সংখ্যক আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার সুযোগ পেয়েছে। দুঃখের বিষয় এই বছরই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সবচেয়ে বেশি গোল হজমের রেকর্ডটাও হয়ে গেছে বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের।

বছরের শুরুটা হয়েছিল বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপ আন্তর্জাতিক ফুটবল টুর্নামেন্ট দিয়ে। বাহরাইন, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, শ্রীলঙ্কা, সিঙ্গাপুর ও বাংলাদেশকে নিয়ে এই টুর্নামেন্ট আয়োজিত হলেও এতে বাংলাদেশ আর শ্রীলঙ্কা ছাড়া কেউই জাতীয় দল পাঠায়নি। সে কারণেই প্রতিযোগিতায় কেবল বাংলাদেশ-শ্রীলঙ্কা ম্যাচটিই ফিফা অনুমোদিত আন্তর্জাতিক ম্যাচ হিসেবে স্বীকৃত ছিল।

শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে শুরু; এর পাশাপাশি মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, আফগানিস্তান ও নেপালের বিপক্ষে চারটি প্রীতি ম্যাচসহ এ বছর বিশ্বকাপ ও এশিয়ান কাপ বাছাইপর্বে অস্ট্রেলিয়া, কিরগিজস্তান, তাজিকিস্তান ও জর্ডানের বিপক্ষে ৭টি ম্যাচে মাঠে নেমেছে বাংলাদেশ। বছরের শেষে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে আফগানিস্তান, মালদ্বীপ ও ভুটানের বিপক্ষে ম্যাচ মিলিয়ে ২০১৫ সালে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ম্যাচের সংখ্যা-১৫।

সর্বোচ্চ সংখ্যক আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার আনন্দটা কিন্তু মিইয়ে যাচ্ছে একটা ব্যাপারেই-সর্বাধিক সংখ্যক গোল হজম। এ বছর এই ১৫টি ম্যাচে বাংলাদেশের জালে বল গেছে মোট ৩৪ বার। ম্যাচ প্রতি গোলের হার—২.২৬। ১৯৭৩ সালে প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচে মাঠে নামা বাংলাদেশ এক বছরে এরচেয়ে বেশি গোল আর কখনোই হজম করেনি। ১৯৭৫ সালে ৭ ম্যাচে ৩১ আর ১৯৯৩ সালে ১১ ম্যাচে ৩০ গোল হজমের রেকর্ড দুটো এবার অতিক্রমই করে গেছেন মামুনুল-জামাল ভূঁইয়ারা। তবে একটি বিষয়ে মামুনুল-বাহিনী স্বস্তি পেতে পারেন।

গোল খাওয়ার সংখ্যাটা সবচেয়ে বেশি হলেও ম্যাচ প্রতি গোলের হিসাবে এ বছর বেশ কয়েকটি বছরের তুলনায় পিছিয়ে আছে। এই হিসাবে সবার ওপরে আছে ১৯৭৫। সে বছর ৭ ম্যাচে ৪.৪ হারে বাংলাদেশ হজম করেছিল ৩১ টি।

ম্যাচ প্রতি গোল হজমের দিক দিয়ে ১৯৯২ সালের অবস্থান কিন্তু ১৯৭৫ সালের পরপরই। সে বছর অবশ্য এশিয়ান কাপ বাছাইপর্বে মাত্র দুটো আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার সুযোগ পেয়েছিল বাংলাদেশ। দুটি ম্যাচে বাংলাদেশের হজম করেছিল ৭টি গোল। কোরিয়ার বিপক্ষে ৬টি, থাইল্যান্ডের বিপক্ষে ১টি। ম্যাচ প্রতি ​বিরানব্বইতে বাংলাদেশের গোল খাওয়ার হার ছিল ৩.৫।

এর পরপরই আসছে ১৯৭৯ সাল। সে বছর ৮টি আন্তর্জাতিক ম্যাচে বাংলাদেশ গোল খেয়েছিল ২৬ টি। ম্যাচ প্রতি ৩.২৫। ১৯৭৯ সালেই দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে এশিয়ান কাপ ফুটবলে ৯-০ গোলে হারের সেই দুঃস্বপ্নের ইতিহাসটা এখনো পিছু তাড়া করছে বাংলাদেশকে। ওটাই আন্তর্জাতিক ফুটবলে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ ব্যবধানে হারের রেকর্ড।

ম্যাচ প্রতি গোলের হিসাবে ২.৭ অংকটি বাংলাদেশের বেশ ‘প্রিয়’। ২.৭ হারে গোল খাওয়ার ইতিহাস রয়েছে বাংলাদেশের বেশ কয়েকটি বছরই। ১৯৯৩ সালে ১১ ম্যাচে ৩০ গোল হজম করেছিল বাংলাদেশ, ২. ৭ হারে। এই তালিকায় আছে ১৯৮২ সালও। বিরাশিতে ম্যাচ প্রতি বাংলাদেশের গোল খাওয়ার হার ছিল ২.৭। ৭ ম্যাচে ১৯ গোল। নিকট অতীতে, ২০০৬ সালে ১০টি আন্তর্জাতিক ম্যাচে বাংলাদেশের জালে বল গিয়েছিল ২৭ টি। ২.৭ হারে গোল খাওয়ার সেই হিসাবের তুলনায় ২০১৫ সালে ১৫ ম্যাচে ২.২৬ হারে গোল খাওয়াকে বাংলাদেশের ফুটবলের মান-বিচারে অনেকের মতেই ‘ঠিকই আছে।’

বেশি সংখ্যক আন্তর্জাতিক ম্যাচে খেলার হিসাব ধর্তব্যে নিলে এখনো পর্যন্ত ১৯৮৫, ১৯৮৯ ও ২০১১ সাল হচ্ছে এদেশের ফুটবল ইতিহাসের তিনটি ভালো বছর। ১৯৮৫ সালে ১২ ম্যাচে বাংলাদেশের জালে গিয়েছিল ১৬ গোল, ম্যাচ প্রতি ১.৩; আর ১৯৮৯ সালে ৯ ম্যাচে বাংলাদেশের বিপক্ষে গোল হয়েছিল মাত্র ৮ টি, গড়—০.৮৮। এই হিসাবে ১৯৯৯ আর ২০১১ সালও মন্দ নয়। ১৯৯৯ সালে ১২ ম্যাচে বাংলাদেশের গোলরক্ষক ১৭ বার পরাভূত হয়েছেন, ১. ৪১ গড়ে। ২০১১ সালে ১০ ম্যাচে বাংলাদেশ ১৫ গোল হজম করে ১.৫ গড়ে।

দেশের গোল খাওয়ার ইতিহাস পড়তে কারওরই ভালো লাগার কথা নয়। কিন্তু আমরা সবাই নিরুপায়। ফুটবলের বিজয়গাথা লেখার সুযোগ বাংলাদেশের ফুটবলার ও ফুটবল-সংশ্লিষ্টরা দিচ্ছেন কই!