মেইন ম্যেনু

৫ বছর পেরিয়ে কাঁটাতারের ‘গল্পটা’

৭ জানুয়ারি ২০১১। কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার অনন্তপুর সীমান্ত। লাল-সাদা জামা পরা এক কিশোরী ঝুলে সীমান্ত বেড়ার কাঁটাতারে। হাত বেয়ে পড়ছে ফোঁটা ফোঁটা রক্ত। ছবিটি সীমান্তহত্যার নৈমিত্তিক ঘটনার প্রতীক হিসেবে দাঁড়িয়েছে। নির্মম সেই ফটোগ্রাফের ‘সাবজেক্ট’ হতভাগী ফেলানী।

সেই ঘটনার পর স্লোগানটাই দাঁড়িয়েছিল, ‘ফেলানী নয়, কাঁটাতারে ঝুলছে বাংলাদেশ।’ আরো এক বছর আগ থেকে হিসাবে ফেলানির মতো নির্মমতা শিকার হয়েছেন অন্তত আরো ২৩৬ বাংলাদেশি। বেসরকারি সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের ছয় বছরের বার্ষিক মানবাধিকার প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতিবাদ-বিক্ষোভে পরিসংখ্যানের সূচক কমেনি। ২০১৫ সালেই সীমান্তে বিএসএফের গুলি ও নির্যাতনে নিহত হয়েছেন ৪৬ জন।

আজ ৭ জানুয়ারি ২০১৬। দেখতে দেখতে পেরিয়ে গেছে ৫টা বছর। এ নির্মম ঘটনার পর বাংলাদেশসহ ভারতের কিছু মানবাধিকার সংস্থাও আন্দোলনে নামে। নিন্দা ও প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। তখন ভারতের পক্ষ থেকে এ ঘটনার ন্যায়বিচারের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়। এমন অস্ত্রের ব্যবহার করা হবে না মর্মেও আসে প্রতিশ্রুতি। তবে গত পাঁচ বছরেও ফেলানী হত্যার বিচার হয়নি। বন্ধ হয়নি সীমান্ত হত্যাও।

২০১১ সালের ৭ জানুয়ারি কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার অনন্তপুর সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া পার হওয়ার সময় বিএসএফের সদস্য অমিয় ঘোষের গুলিতে নিহত হয় কিশোরী ফেলানী। এরপর দীর্ঘক্ষণ কাঁটাতারের বেড়ার উপরেই ঝুলে থাকে হতভাগ্য মেয়েটির লাশ। ফেলানী হত্যায় অভিযুক্ত বিএসএফের জওয়ান অমিয় ঘোষের দুই দফা বিচার হয়েছে বাহিনীর নিজস্ব কোর্টে। দুবারই অমিয় ঘোষকে নির্দোষ ঘোষণা করেন ওই কোর্ট। বিএসএফ জানিয়েছে যে, এই রায়ের পরে মুক্তি দেয়া হয়েছে তাদের ১৮১ নম্বর ব্যাটালিয়নের কনস্টেবল অমিয় ঘোষকে।

মানবাধিকার কর্মীরা দাবি তোলেন, ফেলানী হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশ ও ভারত উভয় দেশের জন্যই লজ্জাজনক একটি ঘটনা। ভারতীয় কর্তৃপক্ষের উচিত ঘটনাটির সুবিচার করা। কিন্তু তারা তা করতে পারেনি। এটা ভারতের মতো একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য মোটেও গৌরবের বিষয় নয়।

কুড়িগ্রামের পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট আব্রাহাম লিংকন বলেছিলেন, ‘বিএসএফের মতো একটা শৃঙ্খলাবদ্ধ বাহিনীর একজন সদস্যের অপকর্মের দায় গোটা বাহিনীটাই নিয়ে নিল আর সেই দায় রাষ্ট্র হিসাবে ভারতের ওপরেও বর্তাল।’

পশ্চিমবঙ্গের মানবাধিকার সংগঠন ‘মানবাধিকার সুরা মঞ্চ (মাসুম)’ এই রায়টি বিচারের নামে অবিচার বলে মন্তব্য করেছে। সংগঠনের প্রধান কিরিটি রায় বিবিসি বাংলাকে বলেছিলেন, ‘প্রথমত এটা ন্যায়বিচার নয়। বিচারের নামে অবিচার। আর দ্বিতীয়ত, ভারতের সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদে বাঁচার অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে, ভারতীয় ভূখন্ডে যারাই থাকবেন, তাদের সবারই অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। ফেলানীকে তো গুলি করা হয়েছিল ভারতীয় ভূখন্ডে; তাই তার বাঁচার অধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে।’

এখন রায় পুনর্বিবেচনার আবেদন জানিয়ে ফেলানীর বাবা নুরুল ইসলাম ও ভারতের মানবাধিকার সংস্থা মানবাধিকার সুরক্ষা মঞ্চ (মাসুম) ভারতের সুপ্রিম কোর্টে একটি রিট মামলা করেন। সেই মামলার শুনানি এখনো শুরুই হয়নি।

দেশের আদালতের মারপ্যাঁচই বোঝেন না ফেলানীর বাবা-মা। কুড়িগ্রামের পাড়াগায়ের এই সহজ সরল মানুষগুলো ভিনদেশে আদালত পাড়ায় কত চক্কর দিলে মেয়ে হত্যার বিচার পাবেন তা এখন সময়ই ‘বলতে’ পারে।