মেইন ম্যেনু

অন্ধ হয়েও অসাধারণ ধারাভাষ্যে ক্রিকেট প্রেমীদের মুগ্ধ করছেন এই ব্যক্তি

কখনো শিশিরের শব্দ শুনেছেন?

স্কয়ার কাট আর স্কয়ার ড্রাইভে ব্যাট-বলের শব্দকে আলাদা করতে পারেন? শর্ট বল আর ফুল লেন্থ ডেলিভারির শব্দ যে ভিন্ন হয়, জানতেন?

আমাদের দুটো চোখ আছে। তাই শিশির বিন্দু দেখতে পাই। আমাদের দুটো চোখ আছে তাই ব্যাটসম্যানের শট দেখতে পাই, বোলারের ডেলিভারি দেখতে পাই। আমাদের শব্দ চিনতে হয় না।

কিন্তু একবার কল্পনা করে দেখুন, এজন মানুষের কথা; যিনি জন্ম থেকে কিছুই দেখতে পান না ; কিন্তু ক্রিকেট জানতে চান, ক্রিকেট নিয়ে কথা বলতে চান; তাকে তো শব্দ চিনতেই হবে। সেই মানুষটিই যদি হন ক্রিকেট ধারাভাষ্যকার, তার দুনিয়াকে হতে হবে শব্দময়; দুনিয়ার সুক্ষাতিসুক্ষ শব্দটি অবদি তিনি চিনতে পারবেন।

চোখে কিছুই না দেখে তিনি চিৎকার করে বলতে উঠতে পারবেন, ‘শর্ট ডেলিভারি। ব্যাটসম্যান উইকেট ছেড়ে বেরিয়ে এসেছেন। ছয় হচ্ছে নিশ্চিত। ছয়…’

হ্যা, আমরা বলছিলাম ডিন ডু প্লেসিসের কথা। দৃষ্টিহীন ধারাভাষ্যকার ডিন ডু প্লেসিস।

আজকের দিনের টেলিভিশন ধারাভাষ্যে আপনি হয়তো খুব জোর করে একজন দৃষ্টিহীন মানুষকে কল্পনা করতে পারেন। কারণ, টিভি ধারাভাষ্যে প্রতি মুহুর্তে কী হচ্ছে, এটা জানানো খুব জরুরী নয়। আশেপাশের গল্প বলে, বিশ্লেষন করে ধারাভাষ্য চালানো সম্ভব। কিন্তু ডু প্লেসিস একজন রেডিও ধারাভাষ্যকার!

জন্মান্ধ এই মানুষটি সারা জীবনে কখনো ব্যাট বা বল চোখে দেখেননি; এই পৃথিবীর কোনো বস্তুই দেখার সুবাদে তার কাছে অস্তিত্বশীল নয়। অথচ এই মানুষটিই বছরের পর বছর নিখুতভাবে আন্তর্জাতিক ও ঘরোয়া ক্রিকেটের বল বাই বল ধারাভাষ্য দিয়ে চলেছেন জিম্বাবুয়ের রেডিওতে।

ডু প্লেসিসের গল্পটা শুধু সিনেমাটিক নয়, রীতিমতো অতিনাটকীয়।

মাতৃগর্ভে থাকা অবস্থাতেই দৃষ্টি হারিয়েছিলেন জিম্বাবুয়ের এই মানুষটি। দুটি চোখের রেটিনার পেছনেই ছিলো টিউমার। জন্মের পর ডাক্তাররা বলেছিলেন, দুই তিন মাসের মধ্যে ছেলেটি মারা যাবে। সে অনুমান সত্যি না হলেও ধাপে ধাপে দুটি চোখই অক্ষিকোঠর থেকে ফেলে দিতে হয়েছে; চোখের সেই জায়গা নিয়েছে পাথরের তৈরী চোখ।

ডু প্লেসিস জীবনে কখনো খেলার ছলেও ক্রিকেট খেলেননি। আজকাল দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের খেলার উপায় আছে; তাও জানতেন না। ডিনের ভাই গ্রেগ যদিও জিম্বাবুয়েতে স্থানীয় কিছু ক্রিকেট খেলতেন। কিন্তু ডু প্লেসিস এই খেলাটির ব্যাপারে কোনো ধারণাই পাননি ১৯৯১ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় বোর্ডিং স্কুলে যাওয়ার আগ অবদি।

বোর্ডিং স্কুলে অলস সময়টা কাটানো তখন অসহ্য হয়ে উঠেছিলেন ডিনের। বাকীরা মাঠে রাগবি খেলে, ক্রিকেট খেলে; ডিন ঘরে বসে শুধু রেডিও শোনেন। শোনা ছাড়া তার আর কোনো উপায় তো নেই। তখনই একদিন রেডিওর চ্যানেল বদলাতে বদলাতে হঠাৎ কানে

ভেসে এলো কয়েকটা নাম-কেপলার ওয়েসেলস, জিমি কুক, অ্যালান ডোনাল্ড।

একটু আগ্রহ পেলেন ডিন। মনোযোগ দিয়ে শুনতে থাকলেন। বুঝলেন, ক্রিকেট খেলা চলছে। দক্ষিণ আফ্রিকা নির্বাসন শেষে ফিরে এসে ভারতের সাথে ম্যাচ খেলছে। এই নিয়ে আফ্রিকানরা খুব রোমাঞ্চিত। ডিন পেলেন এক নতুন সময় কাটানোর উপায়-ক্রিকেট শোনা।

কিন্তু সমস্যা হলো, খেলাটার তো কিছুই জানেন না তিনি। চার কাকে বলে, ব্যাটসম্যান কেনো আউট হয়? কী করলেন একটা দল হেরে যায়!

সপ্তাহ খানেক পরই ছুটি হলো। ডিন জিম্বাবুয়েতে ফিরলেন। বিমানবন্দরে তাকে এগিয়ে নিতে এসেছিলেন বাবা ও ভাই। কুশল বিনিময়ের সুযোগ না দিয়েই ডিন জিজ্ঞেস করলেন, ‘গ্রে, ক্রিকেট খেলাটা কীভাবে হয়?’

ছুটিশেষে ডি যখন আবার বোর্ডিংয়ে ফিরলেন, তখন তিনি রীতিমতো ক্রিকেটটা বুঝে ফেলেছেন। আইন-কানুন জানেন, অনেক খেলোয়াড়ের নাম জানেন। এখন তার সময় কাটানোটা আনন্দের। এখন তার জগত জুড়ে ক্রিকেটের শব্দ। রেডিওতে দক্ষিণ আফ্রিকার কুরি কাপের ধারাভাষ্য চলে এবং ডিন হয়ে ওঠেন ক্রিকেটপ্রেমী।

কিন্তু সমস্যা হলো, সব খেলা তো ধারাভাষ্য দেওয়া হয় না। তাহলে ডিন কী করে সব খেলা শুনবেন?

বছরের শেষ দিকে জিম্বাবুয়ে টেস্ট স্ট্যাটাস পেয়ে গেলো; ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ। দক্ষিণ আফ্রিকার কোনো রেডিও সে ম্যাচের ধারাভাষ্য দেয় না। ডিন পয়সা বাচাতে শুরু করলেন। বিকালের নাস্তা করেন না, হেটে স্কুলে যান।

খেলা শুরু হলো, ডি ডু প্লেসিস নম্বর ঘুরালেন। দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে জিম্বাবুয়ের একটি পানশালার নম্বর। হারারে স্পোর্টস ক্লাবের এই পানশালাতে ফোন করে বারবার ডিন জানতে চান স্কোর। বেশীরভাগ সময় উত্তর পান না। কেউ ফোন রিসিভ করে রেখে দেয়। ডিনের পয়সা ফুরোতে থাক, কানে চেপে ধরে রাখেন রিসিভার।

ওপাশ থেকে ভেসে আসে নানারকম চিৎকারের শব্দ। আর তাতেই ডিন অনুমান করে নিতে থাকেন উইকেটপতন, চার আর ছক্কা। শুরু হয় ডিনের শব্দে শব্দে ক্রিকেট দেখা।

খুব দ্রুত ডিন ক্রিকেট-অবসেসড হয়ে পড়েন।

ক্রিকেট নিয়ে আড্ডা না দিলে চলে না, ক্রিকেট না ভাবলে চলে না। কোত্থেকে জোগাড় করে ফেলেন জিম্বাবুয়ের গ্রেট ডেভ হটনের নম্বর। প্রতিদিন তাকে ফোন করেন। হটনও মুগ্ধ হয়ে যান এই মানুষটার ক্রিকেট প্রেমে। পাল্টা তিনিও ফোন করেন। আড্ডা জমে ওঠে।

আস্তে আস্তে ডিন জিম্বাবুয়ের বিভিন্ন ক্রিকেটারকে ফোন করতে শুরু করেন। ফোনে আড্ডা দিতে চেষ্টা করেন। সবাই হটনের মতো এমন প্রেমে মুগ্ধ হন না। কিন্তু ডিনের ক্রিকেট ভালোবাসা বাড়তে থাকে।

এই সময় ডিনের ভাষায় একটা ‘দূর্ঘটনা’ ঘটে।

সেটা ১৯৯৯ সালের ঘটনা। তখন ডিন স্কুল শেষ করে জিম্বাবুয়েতে ফিরে এসেছেন। একটা সেচ কোম্পানিতে সুইচ বোর্ডে চাকরি করেন। ক্রিকেট হলেই ছুটে যান মাঠে। সেই সময় শ্রীলঙ্কা এলো জিম্বাবুয়ে সফরে।

ডিন মাঠে ছুটে গেলেন। একে ওকে ধরে একটু রবি শাস্ত্রীর সাথে দেখা করলেন। উদ্দেশ্য একটু কমেন্টেটরের সাথে আলাপ জমানো। শাস্ত্রীও মজা পেলেন। ডিন অনুরোধ করলেন, একটু কমেন্ট্রি বক্সটা ‘দেখতে’ চান। অনুরোধ রাখা হলো। শর্ত ছিলো, ডিন শব্দ করতে পারবেন না।

নিশব্দে খেলা শুনছিলেন ওখানে বসে।

হঠাৎই এক ধারাভাষ্যকার অন এয়ারে ডিনকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী মনে হচ্ছে, কেমন করবে জিম্বাবুয়ে?’

শুরু হলো আলাপ। ডিন নানা ভাবে বর্ননা দিতে শুরু করলেন ব্যাটিং ও বোলিংয়ের। বিষ্মিত ধারাভাষ্যকাররা।

দু বছর পর ভারত যখন আবার জিম্বাবুয়ে সফরে এলো শাস্ত্রী তার ইন্টারভিউ নিলেন। ওই সময়ই ক্রিকইনফো তাকে ধারাভাষ্যকার হিসেবে নিয়োগ দিলো টেস্টের জন্য।

বলা চলে শুরু হয়ে গেলো ডিন ডু প্লেসিসের ধারাভাষ্যকার জীবন।

কিন্তু এই অন্ধ মানুষটি কিভাবে ক্রিকেট বুঝতে পারেন? কীভাবে তিনি সত্যিই বোঝেন যে বলটা বাউন্ডারির বাইরে পড়েছে কি না? কীভাবে তিনি বলের টার্ন বা সুইং অনুমান করেন?

এক সাক্ষাতকারে ডিন বলেছিলেন, পৃথিবীর সবকিছুর শব্দ আছে; শুধু সেই শব্দকে আলাদা করার মতো, চিনে নেওয়ার মতো কান থাকা চাই। উদাহরণ দিতে গিয়ে বলেছেন, ‘এখন ব্যাটসম্যান যখন অফ সাইডে খেলে, তখন তিক্ষ্ন একটা ফেটে যাওয়ার মতো আওয়া আসে। আবার সেই যখন লেগে খেলে তখন আওয়াজটা একটু ভোতা হয়, কারণ সে প্যাডের কাছ থেকে খেলে। আমি ব্যাটসম্যানের আওয়াজ থেকে ইয়র্কার চিনতে পারি।’

ডিন ডু প্লেসিস ইয়র্কারের বর্ননা দিয়ে চলেন, স্লগ সুইপের বর্ননা দিয়ে চলেন। পৃথিবীর বুকে তৈরী হয় এক নতুন বৈচিত্র।

কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, এই করে একটা পয়সাও পান না ডিন। কারণ, জিম্বাবুয়েতে অন্তত তাকে ক্রিকেট ধারাভাষ্য দেওয়ার জন্য বেতন দেওয়ার কেউ নেই। ক্রিকেটাররাই বেতন পায় না; আর তো এক দৃষ্টিহীন ধারাভাষ্যকার।

তাহলে? তাহলে ডিন কেনো এই ক্রিকেট প্রেম চালিয়ে যাচ্ছেন?

ডিন হেসে ওঠেন। বলেন, ‘চোখ ছাড়া ক্রিকেট প্রেমের কিছু লাভও আছে।’

গল্প শোনান ডিন ডু প্লেসিস।

একবার আম্পায়ার ড্যারেল হেয়ার জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে অনেকগুলো বাজে সিদ্ধান্ত দিলেন। খেলার পর হেয়ারের সাথে ডিনের দেখা। আম্পায়ারকে বললেন, ‘ড্যারেল, তোমাকে একটা জিনিস উপহার দিতে চাই। নেবে?’

সম্মতি পেতেই নিজের একটা কৃত্রিম চোখ খুছে হেয়ারের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন, ‘তোমার চোখে ঠিক মতো দেখতে পাও বলে মনে হয় না। এটা তোমার দরকার।’

হা হা করে হাসতে থাকেন ডিন ডু প্লেসিস। তার অট্টহাসিতে কেটে যায় সব অন্ধকার।

একজন অন্ধক্রিকেটপ্রেমী তার না পাওয়া নিয়েও হাসতে থাকেন। আর কতো অল্পে আমরা কাঁদতে বসে যাই!