মেইন ম্যেনু

অপরাধের সব সূচকেই এক নম্বরে এমপি বদি

অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং সম্পদের তথ্য গোপন করার দায়ে তিন বছরের কারাদণ্ডপ্রাপ্ত সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদির নাম আরও বিভিন্ন ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত আছে। বিশেষ করে ইয়াবা, মানবপাচার, রোহিঙ্গাদের বৈধকরণ ও চোরাচালান ব্যবসায়ের সঙ্গে তার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। এসব অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের তৈরি করা তালিকায়ও বদির নাম রয়েছে এক নম্বরে। বদির অপরাধমূলক কাজের সহযোগী হিসেবে রয়েছেন তার ছয় ভাইবোনসহ ২৬ জন আত্মীয়-স্বজন।

বুধবার ঢাকার ৩ নম্বর বিশেষ জজ আদালতের বিচারক আবু আহমেদ জমাদার দুর্নীতির মামলায় সংসদ সদস্য আব্দুর রহমান বদিকে তিন বছরের কারাদণ্ড দেন। অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশন তার বিরুদ্ধে এ মামলা দায়ের করেছিল। আদালত কারাদণ্ড ছাড়াও তাকে ১০ লাখ টাকা জরিমানা, অনাদায়ে তিন মাসের কারাদণ্ডের আদেশ দেন।

জানা গেছে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের তৈরি করা কক্সবাজার জেলার ৭৬৪ জন ইয়াবা ব্যবসায়ীর তালিকায় বদির নাম পৌরসভার চৌধুরীপাড়া তালিকায় এক নম্বরে রয়েছে। ওই তালিকায় তাকে প্রধান পৃষ্ঠপোষক এবং তার ছত্রছায়ায় লোকজন ইয়াবা ব্যবসায় জড়িত বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তালিকায় তার পাঁচ ভাই ও এক বোনের নামও রয়েছে। তারা হলেন, আবদুল আমিন, আবদুল শুক্কুর, মৌলভী মুজিবুর রহমান, শফিক, ফয়সাল ও বোন শামসুন্নাহার। এছাড়া, তালিকায় বদির আত্মীয়দের মধ্যে রয়েছেন, আলম, কামরুল ইসলাম ওরফে রাসেল,মং মং সেন, সাহেদুর রহমান নিপু, আবদুর জব্বার,আকতার কামাল, সাহিদ কামাল, মোয়াজ্জেম হোসেন দানু, জসিম উদ্দিন, সৈয়দ হোসেন মেম্বার, জামাল হোসেন, নুরুল আলম ও জাহিদ হোসেন।

এদিকে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তৈরি করা মানবপাচারে জড়িতদের যে তালিকা রয়েছে, তাতেও সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদিসহ তার আত্মীয়-স্বজনের নাম রয়েছে।

জানা যায়, থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ার জঙ্গলে সমুদ্রপথে পাচার হওয়া লোকজনের বেশ কিছু গণকবর এবং জীবিত অবস্থায় শতাধিক বাংলাদেশি উদ্ধারের পর বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর টনক নড়ে। মানবপাচারে জড়িতদের তালিকা ধরে কক্সবাজারে সাড়াঁশি অভিযান শুরু করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এরপর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তৈরি করা মানবপাচারে জড়িতদের তালিকায় বদিসহ তার আত্মীয়-স্বজনের নাম উঠে আসে। সেখানে বদির সহযোগিতায় মানবপাচার করা হয়েছে বলে উল্লেখ রয়েছে। ওই তালিকায় মানবপাচারকারির গডফাদার হিসেবে বদির ছোট ভাই মৌলভী মুজিবুর রহমানের নাম এক নম্বরে রয়েছে। ওই তালিকায় তার আত্মীয়দের মধ্যে বোন শামসুরন্নাহারের ছেলে সাহেদুর রহমান নিপু ,বোনের দেবর হামিদ হোসেন, চাচাতো দেবর আক্তার কামাল, শাহেদ কামাল, জসিম উদ্দিন রাব্বানী, মোয়াজ্জেম হোসেন দানু, নূর মোহাম্মদ মেম্বার, চাচা শ্বশুর জহির উদ্দিন প্রকাশ কানা জহির, ফুফাত ভাই সৈয়দ আলম, নূরুল আলম নূরা, শামীম ও হাসুর নাম রয়েছে।

এছাড়া, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তৈরি করা অপর একটি তালিকায় রোহিঙ্গা আশ্রয়দাতা হিসেবে সংসদ সদস্য বদির নাম রয়েছে এক নম্বরে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, রোহিঙ্গাদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়া এবং তাদের নাগরিক সনদ দিয়ে বাংলাদেশি পাসপোর্ট পেতে সহযোগিতা করার মাধ্যমে বাণিজ্য করছে একটি চক্র। এই তালিকায়ও বদি এবং তার ছোট ভাই মুজিবর রহমানের নাম রয়েছে। গত বছরের ২০ ডিসেম্বর বদির ছোট ভাই শফিক ও ফয়সালের বাড়িতে পুলিশ অভিযান চালিয়ে মিয়ানমারের এক নাগরিককে আটক করা হয়। এই ঘটনায় অবৈধভাবে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগে বদির দুই ভাইয়ের বিরুদ্ধে মামলা করে পুলিশ।

২০০৮ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার দেড় মাসের মধ্যে বদি উপজেলা নির্বাচনে পোলিং ও প্রিসাইডিং অফিসার ব্যাংক কর্মকর্তা গিয়াস উদ্দিনকে পিটিয়ে প্রথম আলোচনায় আসেন। এরপর বনবিভাগের কর্মকর্তা হাজী মুজিবুল হককে পিটিয়ে রক্তাক্ত করেন। তার হাতে লাঞ্ছিত হন টেকনাফের মুক্তিযোদ্ধা মোস্তফা, বিশিষ্ট আইনজীবী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব অ্যাডভোকেট রাখাল মিত্র, শিক্ষক আবদুল জলিল ও পুলিন দে।

এছাড়া, উপ-সচিব পদ মর্যাদার কর্মকর্তা কক্সবাজার সড়ক ও জনপদ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী আবদুল হালিম ও উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা গোলামুর রহমান, শামলাপুর হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক মাস্টার আবুল মনজুর, কক্সবাজারের ঠিকাদার (সিআইপি) আতিকুর রহমানও তার হাতে লাঞ্ছিত হন।

স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এরশাদ সরকারের সময় বদির বাবা এজাহার মিয়া ছিলেন টেকনাফ উপজেলা চেয়ারম্যান। বাবার কাছেই রাজনীতির হাতেখড়ি বদির। এরশাদ সরকারের পর বদির বাবা যোগ দেন বিএনপিতে। বাবার হাত ধরেই টেকনাফ উপজেলা বিএনপির আন্দোলন-সংগ্রামে অগ্রণী ভূমিকা রাখেন তিনি। বিএনপি আমলে টেকনাফ সীমান্ত দিয়ে মিয়ানমার থেকে অবৈধভাবে বিভিন্ন চোরাচালান ব্যবসায়ে জড়িয়ে পড়েন বদি।১৯৯৬ সালে জাতীয় নির্বাচনের আগ মুহূর্তেই বিএনপি থেকে মনোনয়ন চেয়ে বসেন তিনি। কিন্তু অপকর্মের খবর পাওয়ায় সে সময় বিএনপির হাইকমান্ড বদিকে মনোনয়ন দেয়নি। পরে রাতারাতি নিজেকে পাল্টে আওয়ামী লীগে যোগ দেন বদি।

স্থানীয় সূত্রে আরও জানা যায়, স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ ও ১৯৯৬ সাল ছাড়া পরবর্তী নির্বাচনগুলোতে কক্সবাজার-৪ (উখিয়া-টেকনাফ) আসনে জিততে পারেনি আওয়ামী লীগ। ২০০৮ সালে এ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন নিয়ে জয় ছিনিয়ে আনেন বদি। টেকনাফে শুরু হয় বদির শাসন। অপরাধ জগতেও এক নম্বরে চলে আসে বদির নাম।

২০০৮ সালে আট লাখ টাকা ধার নিয়ে নির্বাচন করেছিলেন বদি। জীবনের প্রথম এমপি হয়ে পাঁচ বছর পর তার জমা দেওয়া হলফনামা অনুযারী আয় বেড়ছে ৩৫১ গুণ। আর মোট সম্পদ বেড়েছে ১৯ গুণের বেশি। এরপর ২০১৪ সালে অবৈধ সম্পদ অর্জন ও সম্পদের তথ্য গোপন করার অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের একটি মামলায় আদালত এমপি বদিকে কারাগারে পাঠিয়েছিল। ১৬ দিন কারাভোগ করা পর তিনি জামিনে মুক্তি পেয়ে বেড়িয়ে আসেন। মামলার অভিযোগে বলা হয়, ২০০৮ ও ২০১৩ সালে নির্বাচন কমিশনে দাখিল করা সম্পদ বিবরণীতে সম্পদের তথ্য গোপনপূর্বক মিথ্যা তথ্য প্রদান করেন। নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া তার হলফনামার বাইরে ১০ কোটি ৮৬ লাখ ৮১ হাজার ৬৬৯ টাকা অবৈধ সম্পদ রয়েছে। তার সম্পদ বেড়েছে ৩৫১ গুন। গত পাঁচ বছরে তার আয় ৩৬ কোটি ৯৬ লাখ ৯৯ হাজার ৪০ টাকা। হলফনামা অনুসারে তার বার্ষিক আয় ৭ কোটি ৩৯ লাখ ৩৯ হাজার ৮০৮ টাকা। আর বার্ষিক ব্যয় ২ কোটি ৮১ লাখ ২৯ হাজার ৯২৮ টাকা।

২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে জমা দেওয়া হলফনামায় তার বার্ষিক আয় ছিল ২ লাখ ১০ হাজার ৪৮০ টাকা। ব্যয় ছিল ২ লাখ ১৮ হাজার ৭২৮ টাকা। ওই সময় বিভিন্ন ব্যাংকে তার মোট জমা ও সঞ্চয়ী আমানত ছিল ৯১ হাজার ৯৮ টাকা।

টেকনাফ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক সাংসদ মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘তার দুর্নীতি অনুযারী তিন বছরের কারাদণ্ড ও ১০ লাখ টাকার জরিমানা যথেষ্ট নয়। কারণ, তার ছত্রছায়ায় উখিয়া-টেকনাফকে মাদকসহ চোরাচালানিরা শেষ করে দিয়েছে।সে হিসেবে বদির আরও বেশি শাস্তি হওয়া প্রয়োজন ছিল।’

টেকনাফ উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নুরুল বশর বলেন, ‘আওয়ামী লীগ এমন একটি দল যেখানে দুর্নীতিবাজের স্থান নেই। অপরাধীকে কখনও প্রশ্রয় দেয়নি জননেত্রী শেখ হাসিনা। এ কারণে শুধু তিন বছর নয়, তার আরও বেশি সাজা হওয়া উচিত ছিল।’খবর বাংলা ট্রিবিউনের।