মেইন ম্যেনু

আওয়ামী লীগের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর আম্রকাননে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হয়েছিল। তার ঠিক ১৯২ বছর পর ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন জন্ম হয় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের। এরপর ৫২’র ভাষা আন্দোলন, ৬৬’র ছয় দফা, ৬৯’র গণআন্দোলনসহ দীর্ঘ সংগ্রামের মাধ্যমে ১৯৭১ সালে এই দলটির নেতৃত্বেই মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত হয় বাংলাদেশের স্বাধীনতা। এক কথায় বাংলাদেশের ইতিহাসের সঙ্গে ৬৭ বছরের পুরনো এই দলটির ইতিহাস অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের নেতারা উপলব্ধি করেছিলেন, অনেক ত্যাগ-তিতীক্ষার মধ্য দিয়ে যে পাকিস্তান গঠন করা হয়েছে সেটা বাঙালির জন্য নয়। বাঙালির ভাগ্যনিয়ন্ত্রক বাঙালিরই হতে হবে। সেই লক্ষ্যেই ১৯৪৭ সালে সম্পূর্ণ পৃথক দুটি ভূখণ্ড, স্বতন্ত্র ভাষা ও সংস্কৃতির অঞ্চল নিয়ে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মাত্র ৪ মাস ২০ দিন পর ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি তখনকার তরুণ যুবনেতা শেখ মুজিবুর রহমান গঠন করেন ‘পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ’।

তার ধারাবাহিকতায় পরের বছর ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন ঢাকার স্বামীবাগে কেএম দাস লেনের রোজ গার্ডেনে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর উদ্যোগে আয়োজিত কর্মিসম্মেলনে গঠন করা হয় পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ। মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীকে সভাপতি, প্রখ্যাত ভাষাসৈনিক টাঙ্গাইলের শামসুল হককে সাধারণ সম্পাদক এবং তরুণ যুবনেতা কারাবন্দি শেখ মুজিবুর রহমানকে যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক করে গঠিত হয় প্রথম কমিটি। ২৪ জুন বিকালে নবগঠিত আওয়ামী মুসলিম লীগ মওলানা ভাসানীর সভাপতিত্বে ঢাকার আরমানিটোলা ময়দানে প্রকাশ্যে জনসভা করে। ১৯৫২ সালে শেখ মুজিবুর রহমান সংগঠনের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পান। পরের বছর ঢাকার ‘মুকুল’ প্রেক্ষাগৃহে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের সম্মেলনে তাকে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করা হয়। ১৯৫৫ সালে ধর্মনিরপেক্ষতার চর্চা ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সংগঠনটির নাম থেকে মুসলিম শব্দটি বাদ দিয়ে রাখা হয় পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ। ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত টানা ১৩ বছর সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৬৬ সালে বাংলার জনগণকে বাঙালি জাতীয়তাবাদের চেতনায় উদ্বুদ্ধ করে স্বাধিকার আদায়ের জন্য ঐতিহাসিক ৬ দফা ঘোষণা করেন। সেই ৬ দফার ভিত্তিতেই গণআন্দোলনের পথ বেয়ে আসে ৬৯’র গণঅভ্যুত্থান। ৭০’র নির্বাচনে বাঙালির নিরংকুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ ছিল তারই ধারাবাহিকতা।

কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকার নির্বাচনের ফল অগ্রাহ্য করে সামরিক শক্তির সহায়তায় শুরু করে দমন-পীড়ন। অবশেষে আসে সেই ঐতিহাসিক মাহেন্দ্রক্ষণ। হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, বাংলার তৎকালীন ৭ কোটি মানুষের অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একাত্তরের ২৬ মার্চ ঘোষণা করেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে অভ্যুদয় হয় স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের।

দীর্ঘ ৬৭ বছরের পথপরিক্রমায় দেশের বৃহত্তম ও প্রাচীন রাজনৈতিক দলটিকে অনেক চড়াই-উতরাই পেরোতে হয়েছে। স্বাধীনতার পর ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর অনেকটা অস্তিত্ব সংকটেই পড়ে আওয়ামী লীগ। দলের ভেতরেও শুরু হয় ভাঙন। এর মধ্যে আবদুল মালেক উকিল-জোহরা তাজউদ্দীনের দৃঢ়তায় সংকট কাটিয়ে উঠতে শুরু করে দলটি। এরপর ১৯৮১ সালে দলের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পর দেশে ফিরতে সক্ষম হন বঙ্গবন্ধু কন্যা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তার বলিষ্ঠ নেতৃত্বেই দলটির পুনঃজাগরণ হয়। এক দশক ধরে সারা দেশ ঘুরে দলকে সংগঠিত করেন তিনি। স্বৈরাচারবিরোধী তীব্র গণআন্দোলনও হয় তারই নেতৃত্বে।

সরকার গঠন : আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠার পর ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট সরকার গঠন করে। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে ২৬৯ আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ ২৬৭টি আসনে জয়লাভ করে। কিন্তু পাকিস্তানি শাসকদের স্বৈরতান্ত্রিক মনোভাব ও শোষণের ফলস্বরূপ ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা লাভের পর আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর দীর্ঘ সংগ্রাম শেষে ১৯৯৬ সালে ফের সরকার গঠন করে দলটি। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর ৯ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২৩০টি আসনে জয়লাভ করে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে এবং সরকার গঠন করে। সেই ধারাবাহিকতায় ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি টানা দ্বিতীয়বারের মতো নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয়লাভ করে দলটি।