মেইন ম্যেনু

এক নবজাতকের আত্মকথা, ‘জন্মেই দেখি ক্ষুব্ধ স্বদেশভূমি’

এমন কপালও হয়! এত দাম যার, তারই নাকি মূল্য নেই! হেয়ালির মতো শোনালেও এমন অবস্থাতেই রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ার নবজাতক — ২০০০ টাকার নোট। সদ্য জন্ম নেওয়া ভারতের সব থেকে দামি নোট। কিন্তু সে কারও কাছেই যেন কাঙ্খিত নয়। তার রূপ নিয়েও তামাশার অন্ত নেই।

এই ভারতে সে যেন এক অকাঙ্খিত কন্যা সন্তান। অনেক অনেক ছোট ১০০, ৫০, ২০, ১০-রা অনেক কাছের। জন্ম নেওয়ার পরেই এমন হেলাফেলা তাঁর চোখে জল তো আনতেই পারে। তাঁকে কেউ চায় না। সবাই এড়িয়ে যায়। তাঁকে আদর করে কোলে নেওয়া দূরে থাক, কী করে পাশ কাটানো যায় তার চেষ্টাই করছে সকলে।

সে যে ভূমিষ্ঠ হবে এমন খবর আগে থেকেই চাউর হয়ে গিয়েছিল। এমনকী জন্মানোর আগেই ছবি পেয়ে গিয়েছিল কেউ কেউ। তার পরে, জন্ম তো হল এক মহা বিপ্লবের মধ্য দিয়ে। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী গুরু গম্ভীর গলায় জাতিকে জানালেন, এক নবজাতকের আগমন সংবাদ। সঙ্গে জানালেন, ক’দিন পরে আসবে আরও এক নবজাতক। পিঙ্ক দু’হাজারির পরে সবুজ আধ-হাজারি। সেটা একটা দিন ছিল বটে। দিন নয়, রাত। রাতারাতি বাতিল হল পুরনো ৫০০ আর ১০০০। জন্ম হল গোলাপি নবজাতকের।

কিন্তু নতুন শিশুর মুখ দেখেই কপাল কুঁচকে উঠল সকলের। আরে এটা কী! এ যে বামন! এত বড় নোটের এ কী চেহারা রে বাবা! ছোটদের খেলনা টাকা, বড়রা পকেটে করে ঘুরবে নাকি! সদ্য জন্ম নেওয়া ২০০০-এর তখনই কান্না পেয়েছিল। তবু চেপে রেখেছে কান্না। কারণ, ছোট্ট ছোট্ট কানে সে শুনতে পেয়েছিল কারা যেন ফিসফিস করে বলছে— ‘রংটা পাকা নয়। একটু জল লাগলেই উঠে যাচ্ছে।’ কান্না চেপে রেখেছিল সে। কান্নার জলে নিজের রং যাতে ধুয়ে না যায় তাই বুকে কান্না চেপে রেখেছে সে। কিন্তু আর যে কান্না চাপতে পারছে না। যত দিন যাচ্ছে ততই যেন ওর প্রতি অবজ্ঞা বাড়ছে।

জন্ম নেওয়ার পরে ওর হয়ে তবু একটু আনন্দ হয়েছিল অমিতাভ বচ্চনের কথায়। ‘বিগ বি’ বলেছিলেন, ওর এমন রং হয়েছে তাঁর জন্যই। গর্বে ছোট্ট ধুকপুক করা বুকটা ফুলে ফুলে উঠেছিল দু’হাজারের। কিন্তু পরে শুনল, সেটা একেবারেই বোকা বানানো কথা। অমিতাভ বচ্চন তাঁর পিঙ্ক ছবির সঙ্গে মিলিয়ে রঙ্গ করেছেন। যেমন রঙ্গ হল সোশ্যাল মিডিয়ায়। তার সঙ্গে থাকা মহাত্মা গাঁধীর ছবি নিয়েও তো কত তামাশা। কেউ বলল— গাঁধীজি ‘ডিপি’ চেঞ্জ করেছেন, কেউ বলল— এক গালে চড় খেয়ে আর এক গাল বাড়িয়ে দিয়েছেন।

এসব রঙ্গও মেনে নিয়েছিল নবজাতক ২০০০। কিন্তু সেদিন আর কান্না আটকাতে পারেনি। কোনও মতে চোখের জল সামলে ফুঁপিয়ে উঠেছিল সেই দিন। যে দিন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী ব্যাঙ্কে লাইন দিতে আসা মানুষদের ডেকে বললেন— ‘কেউ ২০০০ টাকার নোট নেবেন না, ব্যাঙ্ককে বলুন ১০০ টাকার নোট দিতে।’

আস্তে আস্তে গোটা দেশ ক্ষুব্ধ হয়ে উঠল। যাঁরা বড় নোট ভালবাসেন তাঁরাও বলছেন এত বড় নোট কেন? নেতানেত্রীরা প্রতিবাদে ফেটে পড়লেন। স্লোগান উঠল— ‘২০০০ নেহি চলেগা, নেহি চলেগা।’ সবার দাবি, নতুন ৫০০ আনো। ধর্মতলা থেকে সংসদ ভবন সর্বত্র— ক্ষুব্ধ স্বদেশভূমি।

আরও অপমান বাকি ছিল। আরও হেলাফেলা বাকি ছিল। যেই খবর এল এটিএম থেকে ২০০০-এর নোট বের হচ্ছে তখনই বদলে গেল গোটা দেশ। যাঁরা কদিন আগেও দিনে দু’হাজার টাকায় সংসার চলে কিনা বলে প্রশ্ন তুলেছিলেন তাঁরাও ১,৯০০ টাকা তুলতে শুরু করলেন। ব্যাঙ্কে উইথড্রয়ালে ১,৯৫০। যেভাবে হোক ২০০০-কে এড়িয়ে চলতে হবে। নতুন ৫০০ আসার পরে তো হেলাফেলা আরও বাড়ল। এ যেন গোলাপি কন্যা সন্তানকে সরিয়ে সবুজ ছেলেকে কোলে তুলে নেওয়া।

না, এর মধ্যেই একটু সুখ পয়েছে সে। নববধূ উমা প্রথম দিন শ্বশুরবাড়িত এসে যখন গুরুজনদের প্রণাম করছিলেন তখন হাসি ফুটেছিল ২০০০-এর। আশীর্বাদে তো ১০০ টাকার নোট দেওয়া যায় না, আর ৫০০, ১০০০-এর নোট বাতিল। অতয়েব আশির্বাদী হিসেব একটির পর একটি গোলাপি নোট আসছিল উমার হাতে। কাঁপা হাতে, অতি যত্নে, আদর করে নিচ্ছিল উমা। যেন মায়ের হাতের ছোঁয়া। সব কষ্ট, সব কান্না মুছে দিয়েছে ওর।