মেইন ম্যেনু

কালীগঞ্জে ঔষধি গাছ পাগল মোহাম্মদ আলী

picture-80

এসএম হাবিব, কালীগঞ্জ (ঝিনাইদহ) প্রতিনিধি: ঝিনাইদহ কালীগঞ্জে ঔষধি গাছ বিক্রি করে সংসার চালাচ্ছে মোহাম্মদ আলী মাহাম্মদ আলী খন্দকারের বয়স যখন ১৬। তরুণ বয়সে জটিল রোগে আক্রান্ত হন তিনি। বাবার অভাবের সংসারে ঠিক মতো চিকিৎসা না হওয়ার কারনে তিনি ক্রমেই অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরিবারের সবাই তার সুস্থ হওয়ার আশা ছেড়ে দিয়েছিল। এক পর্যায়ে মায়ের চেষ্টায় পাশের গ্রামের এক ভেষজ চিকিৎসকের কাছ থেকে চিকিৎসা সেবা নিয়ে তিনি সুস্থ্যতা হন। এই ঘটনার পর থেকে তার বিশ্বাস, গাছ মানুষের পরম উপকারী বন্ধু। ঔষধি গাছের ক্ষমতাও অনেক। তখন তিনি প্রতিজ্ঞা করেন জীবনে বেঁচে থাকলে ঔষধি গাছের বাগান করবো। তিনি বিশ্বাস করতেন, ঔষধি গাছ দিয়ে একদিকে মানুষের উপকার করা যাবে, অন্যদিকে বিক্রি করে অর্থ রোজগার করা হবে।

সেই তরুণ মোহাম্মদ আলীর বয়স বর্তমানে ৭৬। যৌবনের পরিকল্পনা দীর্ঘ চেষ্টায় সফল হয়েছেন তিনি। বাড়ির পাশে একটি বড় নার্সারী ও ঔষধি গাছের বাগান করেছেন মোহাম্মদ আলী। এখন বাগানের ওষধি গাছে একদিকে এলাকাবাসী উপকৃত হচ্ছেন, অন্যদিকে ঔষধি গাছ ও ফলদ গাছের চারা বিক্রি করে গত ৩৪ বছর ধরে সংসার চালাচ্ছেন। ঔষধি গাছ পাগল এ বৃদ্ধের বাড়ি ঝিনাইদহ কালীগঞ্জের উপজেলার মহেশ্বরচাঁদা গ্রামে। এ গ্রামের চাষি ওমর আলী পাল্টে দিয়েছিলেন এলাকার কৃষি ব্যবস্থা ও কৃষকদের ভাগ্য।

প্রায় ৪০ শতকের জমির একপাশে রয়েছে মেহগনি, আম, লিচু, কড়াইসহ বিভিন্ন ফলদ ও বনজ গাছের চারা। এ গাছের ফাঁকে ফাঁকেই রয়েছে ঔষধি গাছ হিসেবে পরিচিত কালমেঘী, সাদা ও কালো তুলসী, ইশেরমূল, শতমূল প্রভৃতি। ব্যাপক চাহিদা থাকায় চলতি বছর বাড়ির পাশের আরো একটি পতিত সরকারী খাস জমিতে নতুন করে ঔষধি গাছের চাষ শুরু করেছে। প্রতি বছর ফলদ ও ঔষধি গাছ বিক্রি করে যাবতীয় খরচ বাদে প্রায় ৮০ হাজার টাকা লাভ করেন মোহাম্মদ আলী। প্রতি বছর দেশের প্রথম সারির ঔষুধ কোম্পানীর প্রতিনিধিরা এসে তার উৎপাদিত ঔষধি গাছ কিনে নিয়ে যায়। গাছের কারণেই তার জীবন বেঁচেছে বলে বিশ্বাস করা এই ব্যক্তি জীবনভর গাছ ভালোবাসেন। প্রায় ৩৪ বছর ধরে বিভিন্ন ফলদ ও বনজ গাছের চারার নার্সারীর পাশাপাশি ঔষধি গাছের বাগান করে সংসার চালাচ্ছেন তিনি। সাম্প্রতিক কালে ঔষধি গাছের ব্যাপক চাহিদা বাড়ায় তিনি খুবই উৎসাহিত নিজের কাজে। স্মৃতি চারণ করে এই প্রবীন ব্যক্তি বলেন, ‘অভাব কাকে বলে দেখিছি। নিজের জমি না থাকায় পরের বাড়িতে কামলার কাজ করে পরিবারের মুখে খাবার তুলে দিয়েছি কখনো কখনো অনাহারেও থাকতে হয়েছে।’ওষধি গাছ তার জীবন পাল্টে দিয়েছে বলে জানিয়ে মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘ছেলেরা আমার কাজে সহযোগিতা করে।’ তার মতে, পৃথিবীতে চিকিৎসা বিজ্ঞান যে এতো এগিয়েছে, এর মূলে রয়েছে গাছের অবদান। গাছের ক্ষমতা অনেক। মানুষের সবচেয়ে ভালো বন্ধু গাছ।

‘ নিজের গ্রামের লোকজন তো আছেই, আশপাশের গ্রামের মানুষ অসুখ-বিসুখে আক্রান্ত হয়ে ঔষধি গাছের জন্য আমার কাছে ছুটে আসে। আমি কাউকে ফিরাই না।’

পাঁচ ছেলে আর এক মেয়ে নিয়ে মোহাম্মদ আলীর সংসার। সন্তানদের বিয়ে দিয়েছেন। তারা সবাই পৃথক ভাবে সংসার করছেন। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে এখন তিনি সাংসারিক চাপমুক্ত। ফলে অনেকটা মুক্ত ভাবেই ঔষধি গাছের চাষ করতে পারছেন তিনি, জানালেন মোহাম্মদ আলী। একই গ্রামের বাসিন্দা আদর্শ কৃষক হেলাল উদ্দীন জানান, বয়ো বৃদ্ধ মোহম্মদ আলী খন্দকার তার গ্রামে ‘ঔষধি গাছ পাগল’ হিসেবে পরিচিত। গ্রামের কেউ অসুস্থ হয়ে ঔষধি গাছের জন্য গেলে তিনি বিনি পয়সায় সেবা দেন। কোন গাছ কোন রোগের জন্য উপকারী সে তথ্য দিয়েও তিনি বিপদ গ্রস্থ মানুষকে সাহায্য করে থাকেন।

কালীগঞ্জের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা জাহিদুল করিম জানান, মোহাম্মদ আলী খন্দকারের নার্সারী ও ঔষধি বাগান তিনি দেখেছেন। বৃদ্ধ বয়সে তিনি যেভাবে পরিশ্রম করেন, তা অনেকের পক্ষেই সম্ভব না বলে মত দেন এই সরকারি কর্মকর্তা। তিনি বলেন, ‘বাগানটি দীর্ঘ সময় ধরে টিকিয়ে রেখে মোহাম্মদ আলী একদিকে নিজের সংসার চালাচ্ছেন, অন্যদিকে মানুষের সেবা করছেন।