মেইন ম্যেনু

কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে তীব্র আসন সংকট, ক্ষুদ্ধ শিক্ষার্থীরা

শাহাদাত হোসাইন স্বাধীন : জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি: ভোর পাচঁটা বেজে ২০ মিনিট। পাখির কাচিরমিচির শব্দ আর ভোরের আবছা আলোয় কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে ব্যস্ত পথিকের মতো ছুটছেন পরিসংখ্যান বিভাগের শিক্ষার্থী মো: কাজী জসিম। লক্ষ্য কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার। সবুজে ঘেরা ক্যাম্পাসটিতে সূর্য উঠতে তখনো অনেক দেরি! কিন্তু এই ভোরে কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে এসেও হতাশ তিনি।

গ্রন্থাগারে একটি সিট পেতে তার আগে ইতোমধ্যে এসে উপস্থিত হয়েছেন প্রায় দেড়’শ শিক্ষার্থী। অবাক করার মতো হলেও বিষয়টি সত্য। জসিমের মতো প্রতিদিন শত শত শিক্ষার্থী ভোরে এসেও লাইব্রেরীতে সিট না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন। এই ঘটনা শুধু এক দিনের জন্য নয়। আওয়ার নিউজ এর প্রতিবেদক গত পাঁচদিন সরেজমিনে গিয়ে এই একই চিত্র দেখেছেন। বলা হচ্ছে দেশের একমাত্র আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের কথা। এখানে আসন সংকট এতোটাই তীব্র যে একটি আসন নিশ্চিত করতে শিক্ষার্থীদের নামতে হয় রীতিমতো যুদ্ধে। তাড়াহুড়ো করে আসন নিতে গিয়ে শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন এমন ঘটনাও ঘটেছে। নিজের হতাশার কথা জানালেন কাজী জসিম,‘প্রতিদিন সেই ভোরে এসে লাইনে দাড়িয়ে থেকেও আসন পাওয়া যায় না। ফলে চাহিদা মাফিক প্রস্তুুতি নিতে পারছি না। ভালো ভাবে প্রস্তুুতি নিতে না পারায় নিজের ভবিষ্যত নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছি’।

বিশ্ববিদ্যালয় কে বলা হয় দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ। আর তা যদি হয়ে থাকে তাহলে বিশ্বদ্যিালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের জ্ঞানভান্ডার হলো গ্রন্থাগার। শিক্ষক শিক্ষার্থীদের গবেষণাসহ যাবতীয় শিক্ষা কার্যক্রমে একটি পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থাগারের চাহিদা সবার। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য প্রতিষ্ঠার ৪৫ বছর পরও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এ নিয়ে সাধারণ শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিরাজ করছে ক্ষোভ ও হতাশা।

জানা যায়, ১৯৭১ সালে ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রজেক্ট আকারে পরিচালিত হওয়ার সময় সেখানেই এ লাইব্রেরী টির যাত্রা শুরু হয়। পরে ঢাকার অদূরে সাভারে সাতশ’ একর জমির ওপর ক্যাম্পাসটি প্রতিষ্ঠিত হয়। সে সময় আনুষ্ঠানিকভাবে এর যাত্রা শুরু হয়। কিন্তু প্রতিষ্ঠার পর দীর্ঘ ৪৫ বছর পরও ভৌত অবকাঠামো উন্নয়ন পূর্ণতা পায়নি। ১৯৮৫ সালে লাইব্রেরির মূল ভবন নির্মাণের কাজ শুরু হয়। এর ৫৫ হাজার বর্গফুটের কাজ সম্পন্ন হলেও বাকি ৪৫ হাজার বর্গফুটের কাজ আজও শেষ হয়নি। মূল ভবনের পাশে আরেকটি ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হলেও তার নির্মাণ কাজ শুরুই হয়নি। দক্ষ জনবলের অভাবও প্রকট কেন্দ্রীয় এই গ্রন্থাগারটিতে।

বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন বিভাগে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হলেও প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও গ্রন্থাগারটিতে প্রয়োজনীয় জনবলের অভাব রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে ফাঁকা রয়েছে প্রধান লাইব্রেরিয়ানের পদটি। লাইব্রেরির আসন সংকটের মতো একটি বড় সংকট হচ্ছে বইয়ের সংকট। যদিও কাগজে, কলমে বই, জার্নাল ও রেফারেন্স বই রয়েছে প্রায় দেড় লক্ষের কাছাকাছি। তবে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ লাইব্রেরিতে অনেক বইÑই পাওয়া যায় না। যেসব বই পাওয়া যায় তারও আবার অনেক গুরুত্বপূর্ণ পাতা, লেখা বা ছবিগুলো কাটা ছেঁড়া অবস্থায় থাকে। পর্যাপ্ত বই কেনার জন্য প্রতিবছর যা বাজেট দেওয়া হয় সেটি প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। ২০১৫-১৬ অর্থ বছরে বাজেটে লাইব্রেরির স্টাফের বেতন, ভাতা, মুদ্রণ, বইকেনা, কম্পিউটার, ক্যাফে ইত্যাদিসহ বরাদ্দ ছিল ১ কোটি ৯৬ লাখ ২৫ হাজার টাকা। অবশ্য এই অর্থ বছরে তা বাড়িয়ে করা হয়েছে ২ কোটি ৫১ লাখ ৫৫ হাজার টাকা।

এদিকে সর্বশেষ গত মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ছয়টায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, লাইব্রেরির সামনে প্রায় ১০০ ব্যাগ লাইন করা। শিক্ষার্থীরা দাঁড়িয়ে আছে লাইব্রেরির প্রবেশদ্বার খোলার অপেক্ষায়। অনেকে দাঁড়িয়ে থাকতে অস্বস্তি বোধ করছেন। অনেকে অস্পষ্ট ভাষায় কি যেন বলছেন। প্রতিদিন সকাল ৭ টা ২০ মিনিটে শত শত শিক্ষার্থী পড়াশোনার উদ্দেশ্যে লাইব্রেরির সামনে লাইনে দাড়ান। ৭ টা ৩০ মিনিটে কর্তব্যরত কর্মচারী প্রবেশদ্বার খুলে দিলে সবাই ভেতরে প্রবেশ করেন। সিট না পেয়ে ফেরত আসতেও দেখা গেল কয়েকজনকে।

কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার সূত্রে জানা গেছে, গ্রন্থাগারের তিন তলা ভবনে ৮০ টি ডেস্ক এবং টেবিলসহ সব মিলিয়ে প্রায় চার শতাধিক আসন রয়েছে। সে হিসেবে প্রতি ৩০ জন শিক্ষার্থীর জন্য আসন বরাদ্দ রয়েছে মাত্র একটি। তবে অধ্যাপক অজিত কুমার মজুমদার লাইব্রেরির ভারপ্রাপ্ত শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর শিক্ষার্থীদের জন্য দেড় শতাধিক আসন বৃদ্ধি করেছেন বলে জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। এর বাহিরেরও বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থীরা প্রতিদিন বিসিএস ও অন্যান্য চাকরির পড়াশোনার জন্য লাইব্রেরিতে ভীড় জমায় ফলে সমস্যার জড়তা আরও বাড়ছে বলে অভিযোগ নিয়মিত শিক্ষার্থীদের। লাইব্রেরিতে পড়তে আসা শিক্ষার্থীদের জন্য টয়লেট আছে ১০টি তার মধ্যে ২ টি ব্যবহারের অনুপযোগী।

১৪ হাজার শিক্ষার্থীর সেবা প্রদানের জন্য লাইব্রেরিতে নেই পর্যাপ্ত জনবল। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে ১২ থেকে ১৫ টি দৈনিক পত্রিকা রাখা হলেও লাইব্রেরিতে রাখা হয় মাত্র ৪ থেকে ৫টি পত্রিকা। এখানে ছাত্র ও ছাত্রীদের আলাদা কোন নামাযের কক্ষ নেই। আবার কক্ষটি অত্যন্ত ছোট হওয়ায় প্রত্যেক ওয়াক্তে দুই থেকে তিনবার জামাত অনুষ্ঠিত হয়। সকালে প্রায়ই আসন নিতে আগে তাড়াহুড়ো করে ঢুকতে গিয়ে কেউ না কেউ আহত হন। মাঝে-মাঝে আসন পাওয়া নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায়ই কথা কাটাকাটি, বাগবিতন্ডা লেগেই থাকে।

আবার যদিও অনেকে আসন পায় কিন্তুু তার উপর থাকে না ফ্যান কিংবা পর্যাপ্ত আলোর সুবিধা। ফলে সুষ্ঠ পরিবেশের অভাবে পড়াশোনার প্রচন্ড ব্যাঘাত হচ্ছে এখানকার শিক্ষার্থীদের। এ নিয়ে ক্ষোভ রয়েছে শিক্ষার্থীদের মধ্যে। গণিত বিভাগের শিক্ষার্থী সাকিব বলেন, ‘প্রতিদিন প্রায় কয়েক’শ জন লাইনে দাঁড়িয়ে থাকি তারপর সিট পাই, লাইনে না দাড়ালে সিট পাওয়া খুবেই কষ্টকর। সিট পেতে চাইলে লাইন খাটতেই হবে। যারা একটু দেরিতে আসেন তাদের ভাগ্যে সিট জুটে না। প্রায় সিট পাই কিন্তুু সিটের উপরে নেই পর্যাপ্ত ফ্যান বা লাইট ফলে এই প্রচন্ড গরমে পড়াশোনা করতে হিমসিম খাচ্ছি। তাই কৃর্তপক্ষকে দ্রুত লাইব্রেরির আসন সংকট এবং অভ্যন্তরীণ অব্যবস্থাপনা দূর করতে জোর দাবি জানাচ্ছি।

নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক এক ছাত্রী বলেন, ‘প্রায় ছয় মাস যাবত লাইব্রেরিতে পড়তে আসি। প্রথম কয়েকদিন সিট পাই নি, এখন কৃর্তপক্ষ নিয়ম করার কারনে আর সমস্যা হয় না। মেয়েদের মধ্যে আমরা যারা পড়তে আসি তাদের জন্য ৮ টা ডেস্ক সংরক্ষিত, যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। তাছাড়া লাইব্রেরির সিট নিয়ে নোংরা রাজনীতিও দেখা যায়। লাইব্রেরির জন্মলগ্ন এই আসন সংকট ও নানা অব্যবস্থাপনায়। ডেস্কের বৃদ্ধি এবং লাইট, ফ্যানের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা করা উচিত’।

এই বিষয়ে কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের ভারপ্রাপ্ত শিক্ষক অধ্যাপক ড. অজিত কুমরা মজুমদার বলেন,‘গ্রন্থাগারে শিক্ষার্থীদের বসার জন্য আসন সংখ্যা ইতোমধ্যে কিছু বাড়ানো হয়েছে। আরো আসন সংখ্যা বাড়ানোর প্রক্রিয়া চলছে। ইতিমধ্যে কাজ শুরু করা হয়েছে। মূল ভবনের পাশে আরেকটি ভবনের ভিত্তি তৈরি করে রাখা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে আমি উপাচার্য মহোদয়কে অবহিত করেছি। আশা করছি তিনি বিষয়টি আমলে নিয়ে দ্রুত এই সমস্যার সমাধান করবেন।

গ্রন্থাগারের এই সংকট নিয়ে বিভিন্ন সময়ে প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা বারবার রাজনৈতিক বক্তব্য দিলেও ইতিবাচক পদক্ষেপ এখনো চোখে পড়েনি। মেধা ও মননে সমৃদ্ধ একাটি জাতি গঠনে গ্রন্থাগারের ভূমিকা অপরিসীম। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রাণের দাবি, অবিলম্বে কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারটির যাবতীয় সমস্যার সমাধান করে পূর্ণাঙ্গ একটি গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠা করা হোক।