মেইন ম্যেনু

গর্ভ ভাড়া নিষিদ্ধ হতে চলেছে ভারতে

173211gorvovara-kalerkantho-pic

ভারতে গর্ভ ভাড়া নিষিদ্ধ করতে সারোগেসি বিলটি মোদীর মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত হয়েছে৷ এবার অনতিবিলম্বে তা সংসদে পেশ করা হবে৷ বিলে গর্ভ ভাড়া দেওয়া বা নেওয়াকে আরো স্বচ্ছ ও নিয়ন্ত্রিত করতে বিভিন্ন ব্যবস্থা নেবার কথা বলা হয়েছে৷

ভারতে গর্ভ ভাড়া দেবার রমরমা ব্যবসা নিয়ন্ত্রিত করতে মোদী মন্ত্রিসভায় ‘সারোগেসি বিল ২০১৬’ অনুমোদিত হয়েছে৷ খুব তাড়াতাড়িই তা সংসদে পেশ করা হবে৷ বিলটি পাশ হলে শুধু জম্মু-কাশ্মীর ছাড়া ভারতের সব রাজ্যেই তা প্রযোজ্য হবে৷ সরকার মনে করেন, অর্থের লোভে যথেচ্ছভাবে গর্ভ ভাড়া দেওয়ার ব্যবসা নিষিদ্ধ করা দরকার৷ ভারতে বছরে গর্ভ ভাড়া দেওয়ার ব্যবসা প্রায় ১০০ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে৷ আর প্রতিবছরেই তা বাড়ছে৷ সন্তানহীন বিদেশি দম্পতিদের কাছে কম খরচে সারোগেট মা পাওয়ার চাহিদা সবথেকে বেশি৷ সরকারের কথা, এটা শুধু অনৈতিকই নয়, এটা অবৈধও৷ এরসঙ্গে সারোগেট মা ও সন্তানের সুরক্ষার প্রশ্নও জড়িত৷

এ জন্য বিলে বিভিন্ন নিয়মবিধির সংস্থান রাখা হয়েছে৷ যেমন সারোগেসির জন্য উপযুক্ত বলে বিবেচিত হবেন কোন নারী? কোনো দম্পতির প্রকৃতই সারোগেট সন্তানের প্রয়োজন আছে কিনা ইত্যাদি৷ প্রস্তাবিত বিলে এ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ নিয়মবিধির মধ্যে আছে –

১৷ বাণিজ্যিকভিত্তিতে গর্ভ ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হবে৷ কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় মনে করে, ভারতে গর্ভ ভাড়া দেওয়া বা নেওয়ার সংখ্যা যেভাবে বেড়ে চলেছে তাতে ভারত সারোগেসির একটা বাণিজ্যিক কেন্দ্রে পরিণত হয়ে উঠেছে৷ এটা হতে দেওয়া যায় না৷ কারণ এর ফলে মা ও শিশুর স্বাস্থ্য ঝুঁকির মুখে পড়ে৷

২৷ বিদেশি দম্পতি কোনো ভারতীয় মহিলাকে সারোগেট মা হিসেবে বা তাঁর গর্ভ ব্যবহার করতে পারবে না৷ বিদেশিদের মধ্যে অনাবাসিক ভারতীয় এবং ভারতীয় বংশোদ্ভূত বিদেশি পাশপোর্টধারীকেও ধরা হয়েছে৷
ভারতে গর্ভ ভাড়া করা মায়েদের ছবি
ভারতে গর্ভ ভাড়া করা মায়েরা

৩৷ আন্তরিক চেষ্টা সত্ত্বেও সন্তানের জন্মদানে অক্ষম ভারতীয় দম্পতির ক্ষেত্রে সারোগেসি বৈধ৷ তবে তাঁদের সন্তান উত্পাদনে অক্ষমতার মেডিক্যাল সার্টিফিকেট দাখিল করতে হবে৷ প্রস্তাবিত আইনে সমকামী দম্পতি, লিভ-ইন পার্টনারশিপ, সিঙ্গল পুরুষ বা সিঙ্গল মহিলাদের জন্য সারোগেসি অবৈধ বলে গণ্য হবে৷

৪৷ বৈধ সারোগেসির জন্য দম্পতির বিবাহ পাঁচ বছরের বেশি হতে হবে৷ এছাড়া স্ত্রীর বয়স ২৩ থেকে ৫০-এর মধ্যে ও স্বামীর বয়স ২৬ থেকে ৫৫ বছরের মধ্যে হতে হবে৷

৫৷ গর্ভ ব্যবহার করার জন্য সেই নারীকে চিকিত্সার খরচপাতি ছাড়া অন্য কোনো টাকা-পয়সা দেওয়া যাবে না৷

৬৷ কোনো দম্পতির যদি একটি সন্তান থাকে, তাহলে দ্বিতীয় সন্তানের জন্য অন্য নারীর গর্ভ ব্যবহার করা যাবে না৷

৭৷ কোনো মহিলা যদি একবার সারোগেট মা হোয়ে থাকেন, তাহলে দ্বিতীয়বার তিনি তা হতে পারবেন না

৮৷ সারোগেসির দিকে নজর রাখতে সরকার কেন্দ্রীয়স্তরে জাতীয় সারোগেসি বোর্ড এবং রাজ্যস্তরে রাজ্য সারোগেসি বোর্ড গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে৷ যেসব হাসপাতাল বা ক্লিনিকে সারোগেসির সুবিধা আছে বা সারোগেসি করা হয়, সেইসব হাসপাতাল এবং ক্লিনিকের দিকে নজর রাখবে এইসব বোর্ড৷

এর পরেও সারোগেসি নিয়ে বিতর্ক চলছে৷ একদল বলছেন, দেহদান বা অঙ্গ প্রত্যঙ্গ প্রতিস্থাপন যদি অনৈতিক না হয়, তাহলে সারোগেসি অনৈতিক হবে কেন? আজকাল তো বলতে গেলে সবকিছুই আউটসোর্সিং হয়৷ কাজেই সন্তান চাওয়া বা পাওয়ার ক্ষেত্রে সরকারি হস্তক্ষেপ কি কাম্য? এমনটাই বললেন বিশিষ্ট গাইনোকলজিস্ট এবং সারোগেসি বিশেষজ্ঞ ডাক্তার শিউলি মুখোপাধ্যায়৷ জার্মানির কিল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট করা এই চিকিত্সক ডয়চে ভেলের সঙ্গে কথা প্রসঙ্গে বলেন, ‘‘সারোগেসি নিষিদ্ধ করা হলে আপত্তির কিছু নেই৷ কিন্তু প্রদীপের নীচে অন্ধকারের মতোই আসল কথাটা হচ্ছে, কাদের সারোগেট সন্তান দরকার আর তাঁদের জন্য কারা সারোগেট করবেন৷ সেজন্য আত্মীয়স্বজন বা বন্ধু-বান্ধবরা কি সত্যিই এগিয়ে আসবেন? এ কাজে সরকার কি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে পারবেন? কারণ ভারতীয় মানসিকতায় কোনো আত্মীয়স্বজন স্বেচ্ছায় বা বিনা স্বার্থে এগিয়ে আসেন না, অন্তত আমার অভিজ্ঞতা তাই বলে৷ কারণ তাঁদের রাজি করাবে কে? কীভাবে? এক কথায় যেসব দম্পতির সন্তান জন্মদানের শারীরিক ক্ষমতা নেই, তাঁরা কি সারাজীবন নিঃসন্তান থেকে যাবেন?”

তিনি আরো বলেন, ‘‘এখানে একটা ধর্মীয় ব্যাপারও আছে৷ কোনো হিন্দু মহিলা যেমন মুসলিম দম্পতির ভ্রুণ ঘর্ভে ধারণ করতে চাইবেন না এবং তেমনি কোনো মুসলিম মহিলা কোনো হিন্দু দম্পতির ভ্রুণ গর্ভে নিতে চাইবেন না৷ কাজেই সারোগেসি আইনত নিষিদ্ধ হবার পর আমরা বুঝতে পারবো ইস্যুটি কোথায় এসে দাঁড়াবে৷ বাণিজ্যিক সারোগেসি নিষিদ্ধ করলে কোনো মহিলা বিনা পারিশ্রমিকে অপরের ভ্রুণ নয়-দশ মাস বহন করবে না৷”

সারোগেসির খরচ প্রসঙ্গে উনি ডয়চে ভেলেকে নির্দিষ্ট করে কিছু বলেননি৷ শুধু বলেছেন, ‘‘এটা স্থান, হাসপাতাল বা ক্লিনিক বিশেষে হয়৷ তবে এক লাখের আশপাশে৷ আর বিদেশে এর খরচ প্রায় দশগুণ৷”