মেইন ম্যেনু

গেম নির্মাণশিল্প বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে ​যাবে

সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন একবার বলেছিলেন, নিজের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করার সবচেয়ে ভালো পথ হচ্ছে তা নিজেই তৈরি করা। আমার বিশ্বাস, তিনি যা বলেছেন, তা খুবই যথার্থ। শুধু বসে থেকে যদি কেউ ভাবেন ভবিষ্যৎ সফলতা বয়ে আনবে, তাহলে তিনি ভুল করছেন। আপনাকে এর জন্য কঠোর পরিশ্রম করতে হবে। আপনার প্রচেষ্টাই ভবিষ্যৎ নির্মাণ করবে। তবে এর শতভাগ পরিণতি হয়তো আপনার হাতে না থাকলেও বড় অংশ আপনার হাতেই। সাধারণত এটাই আপনাকে লক্ষ্যে পৌঁছে দিতে যথেষ্ট।

গত বছর ইএটিএল-প্রথম আলোর অ্যাপ প্রতিযোগিতার জন্য আমি একটি গেম তৈরি করি। এটা প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অর্জন করে। অর্জন হিসেবে এটি মর্যাদা ও তাৎপর্যপূর্ণ হলেও আমি বিস্মিত হইনি। কারণ, আমার কাছে এটা একেবারেই অপ্রত্যাশিত মনে হয়নি। বরং আমি এটাকে নিজের চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জনের পথে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে মনে করেছি। আর সেটা হচ্ছে পৃথিবীর বিখ্যাত গেম নির্মাতা হিসেবে গড়ে ওঠা।

আমার যত দূর মনে পড়ে, অনেক ছোটবেলাতেই আমি ভিডিও গেমে চমত্কৃত হয়েছি। আর ভিডিও গেমে আকৃষ্ট অন্য আরও অনেকের মতো আমি নিজের ভিডিও গেম তৈরিতে আরও বেশি করে আগ্রহী হয়ে উঠি। তবে তখন আমি জানতাম না, কীভাবে এ জিনিস বানাতে হয়। আবার আমি এমন কাউকে জানতামও না যে আমাকে বলতে পারে, এটা কীভাবে বানাতে হয়। ফলে আমি ওয়েবে খুঁজতে শুরু করি, আর শিগগিরই বুঝতে পারি, আমাকে প্রোগ্রামিং শিখতে হবে। কিন্তু এটা আমার জন্য অত সহজ ছিল না। আমি অনেক চেষ্টা করেছি, কিন্তু তখন ব্যাপারটা ঠিক শিখতে পারিনি। তখন কলেজে পড়ি, সামনে এইচএসসি পরীক্ষা, ফলে আমাকে পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য অনেক সময় দিতে হয়েছে। তাই গেম নির্মাণের স্বপ্ন আমাকে ক্ষণিকের জন্য তুলে রাখতে হয়েছে।

এইচএসসি পাস করে আমি খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিএসই বিভাগে ভর্তি হই। অর্থাৎ সেখানে পড়তে গেলে আমাকে ঢাকা ছেড়ে খুলনায় যেতে হবে। কিন্তু তাতে সমস্যা ছিল না। আমাকে গেম তৈরি করতে হবে। আর সিএসইতে পড়লে যদি তাতে সুবিধা হয়, তাহলে সেটাই হোক। আমি আবারও চেষ্টা করলাম, আর এবার সফলতার সঙ্গে প্রোগ্রাম বানাতে পারলাম। এরপর ধীরে ধীরে চর্চার মাধ্যমে আমি ভালো করতে থাকলাম। আমি গেম-সম্পর্কিত বিভিন্ন ফ্রেমওয়ার্ক শিখতে থাকলাম। বিভিন্ন অ্যালগরিদম ও কৌশল শিখলাম। আমি যে কথাটা বলতে চাচ্ছি তা হলো, একদিন ঘুম থেকে ওঠার পর আমি সব জেনে ফেলেছি, ব্যাপারটা তেমন হয়নি।

এটা ছিল এক দীর্ঘ প্রক্রিয়া। আমি প্রতিদিনই সচেতনভাবে নিজেকে উন্নত করার চেষ্টা করেছি। এটা তারই ফসল। এই লক্ষ্য অর্জনে আমাকে প্রায়শই সামাজিকতা বর্জন করতে হয়েছে। সফল হতে গেলে নিজের অগ্রাধিকারগুলো ঠিক করতে হবে। এভাবেই দ্বিতীয় কথায় চলে আসি। কেউ যদি শিক্ষণের পর্যায়টা উপভোগ করতে না পারে, তাহলে এটা তার জন্য সঠিক পথ নয়। গেম বানানো একটি সৃষ্টিশীল কাজ। আর এর জন্য যদি আপনার সর্বাঙ্গীণ উৎসাহ না থাকে, তাহলে সৃজনশীলতা বিকশিত হবে না। আর শেষমেশ গেম তৈরির সবকিছু যে আপনি জেনে ফেলবেন, এটা মনে করার কারণ নেই। বাস্তবে সবকিছু জানা সম্ভব নয়। সব সময়ই নতুন কিছু জানার থাকবে। তাই আপনার যেমন সবজান্তা হওয়া যাবে না, তেমনি আশাহীনও হওয়া যাবে না। ফলে আপনি যা-ই জানুন না কেন, আপনার তাতে বিনয়ী থাকতে হবে।

আমি ভাগ্যবান, আমার পরিবার এত দূর আসতে আমাকে সমর্থন দিয়েছে। এর জন্য আমি তাদের ধন্যবাদ জানাই। সম্প্রতি আমি যেসব গেম বানিয়েছি, তার মধ্যে বেশ কটি সফলও হয়েছে। ইএটিএলের মতো প্ল্যাটফর্ম মেধাবী নির্মাতাদের এগিয়ে যাওয়ার জন্য বড় সুযোগ। আবার সরকারও এই খাতকে উৎসাহিত করছে।

এই গেম নির্মাণকে উন্নত করার জন্য আমাদের আরও অনেক মেধাবী গেম নির্মাতা লাগবে, যাঁরা এর উন্নততর দিকগুলোতে বিশেষজ্ঞ।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গেম ডিজাইন ও উন্নয়নে কোর্স থাকতে পারে। আবার গেম নির্মাতাদের শক্তিশালী সংগঠন দরকার, যাতে তাঁরা একে অপরকে সহযোগিতা করতে পারেন।

গেম বানাতে কখনো অনেক টাকার প্রয়োজন হতে পারে। বড় গেম বানাতে অনেক সময় প্রচুর টাকা লাগতে পারে। এর জন্য প্রকাশনা সংস্থা দরকার, যারা নির্মাতাদের টাকা দিয়ে সহায়তা করতে পারে। কিন্তু তার জন্য নির্মাতাদের দেখাতে হবে, তাঁদের সত্যিই ভালো কিছু করার সক্ষমতা আছে। দক্ষতা ছাড়া এটা সম্ভব হবে না। ফলে যাঁরা ভালো গেম বানাতে চান বা এই বিদ্যা শিখতে চান, তাঁদের উচিত হবে দক্ষতা বাড়ানো।

আমরা বারবারই দেখেছি, কীভাবে তরুণেরা বিপ্লবী পণ্য নিয়ে এসে দুনিয়াকে বদলে দিয়েছেন। এই গেম নির্মাণের শিল্প এর চেয়ে ভিন্ন কিছু নয়। এই শিল্প যেমন জন কারমাকের মতো প্রতিভাকে পেয়েছে, তেমনি শিগেরু মিয়ামোটোর ডিজাইন বোধের স্ফুরণ দেখেছে। তাঁরা সবাই তরুণ বয়সে শুরু করেছেন। ফলে আমাদের তরুণেরা যদি তাঁদের পর্যায়ে যেতে পারেন, তাহলে তো বিস্ময়ের কিছু নেই। তাঁদের যেটা করতে হবে তা হলো, নিজের ওপর আস্থা রাখা ও সর্বোচ্চ চেষ্টা করা। তাঁরা যদি ব্যর্থ হন, তাতেও কিছু এসে যায় না। কারণ ব্যর্থ হওয়াতে সমস্যা নেই। ব্যর্থতা আমাদের শুধু শেখায়, কোনো একটি সমস্যা ওই নির্দিষ্ট পথে মেটানো সম্ভব নয়।

এসব কথা বলার পর আমি খুব দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, আমাদের দেশে শিগগিরই একটি সমৃদ্ধিশালী গেম নির্মাণশিল্প গড়ে উঠবে। আমাদের তরুণ নির্মাতারাই হবে এর অগ্রপথিক, নিশ্চিতভাবে আমি যার অংশ হতে যাচ্ছি।

-অনিরুদ্ধ পৃথুল
ইএটিএল বিজয়ী