মেইন ম্যেনু

কোমরের মাপ ৩৪, অথচ প্যান্ট ৩৮

গ্রাম পুলিশের কপালে জুটেছে ভাঙা ছাতা, ছেঁড়া শার্ট ও পুরনো জুতা

কোমরের মাপ ৩৪। অথচ সরকারিভাবে পাওয়া প্যান্টের সাইজ ৩৮ ইঞ্চিরও বেশি। বেল্ট দিয়ে বাঁধার পর দেখে মনে হচ্ছিল, মেয়েদের মতো কুচি দিয়ে শাড়ি পরার চেষ্টা! জিজ্ঞেস করতেই খানিকটা বিব্রত হাসি দিলেন বরিশালের বানারীপাড়া উপজেলার বিশারকান্দী ইউনিয়নের ৬নং ওয়ার্ডের গ্রাম পুলিশ মনোরঞ্জন।

তিনি বলেন, ‘এই রহম প্যান্টই দেয় স্যারেরা। অয় কোমরে বড় নাইলে নিচের দিহে খাডো। শার্টের অবস্থাও খুব একটা ভালো থাহে না। এ্যাইয়া তো আর পরতে পারি না, হেইর লাইগ্যা আগে দর্জির ধারে যাইয়া জামা প্যান্ট কাডাইয়া ঠিক হরন লাগে। হগলডি আবার এ্যাইয়া হরে না। এ্যাতো ঝামেলায় না যাইয়া কাফুর কিইন্যা জামা প্যান্ট বানাইয়া লয়।’

শুধু মনোরঞ্জনই নন, জেলায় যত গ্রাম পুলিশ আছেন প্রায় সবারই একই সমস্যা। সব মিলিয়ে মাত্র ৩ হাজার টাকা বেতনের চাকরি। ১৫শ’ দেয় সরকার আর বাকি ১৫শ’ ইউনিয়ন পরিষদ। তবে শেষের ১৫শ’র দেখা অবশ্য মেলে না বললেই চলে। এর বাইরে সরকারের কাছ থেকে পাওয়া বলতে কেবল এই সরকারি পোশাক। সঙ্গে দেয়া হয় এক জোড়া চামড়ার জুতা, একটি ছাতা, একটি ক্যাপ, এক জোড়া মোজা আর একটি ব্যাগ। বছরে একবার এসব পায় গ্রামীণ জনপদে আইনশৃংখলা রক্ষার কাজে নিয়োজিত গ্রাম পুলিশ সদস্যরা। স্থানীয়ভাবে যাদের সবাই চেনে চৌকিদার-দফাদার হিসেবে। বর্তমান সময়ের দুর্মূল্যের বাজারে যখন সবচেয়ে কম দামি চালের কেজিও কমপক্ষে ৩০ টাকা সেখানে এই ১৫শ’-৩ হাজার টাকায় একটি পরিবারের কী হয় সেই প্রশ্নে না হয় নাই বা গেলাম। কিন্তু তাদের সরকারিভাবে বছরে মাত্র একবার দেয়া খাকি পোশাকেরও যদি হয় এমন দুর্দশা তাহলে সেই দুঃখ তারা রাখবে কোথায়?

কথা হয় বানারীপাড়া উপজেলারই কদমবাড়ী এলাকার গ্রাম পুলিশ বাবু লালের সঙ্গে। যুগান্তরকে তিনি বলেন, ‘জুতা, ছাতি, ব্যাগের লগে এক জোড়া কইর্যা জামা-প্যান্ট দেয় সরকার। তয় হেইয়া কোনো সময়ই পরতে পারি নাই। জামা-প্যান্ট আনোনের পর দেহা যায় কোনোডার বুতাম নাই, গায়-পায় মেলে না, ছাতির ডাণ্ডা ভাঙা, জুতা দেছে পুরান আর ব্যাগ দেখলে মনে অয় আষ্ট-দশ বছর পইর্যা আছেলে গুদামে। ৬ বচ্ছরে এই রহম ৫ বার জামা-কাফুর পাইছি। সবই ফালাইয়া থুইছি। একবারও পরতে পারি নায়।’

ইলুহার ইউনিয়নের গ্রাম পুলিশ তপন বাড়ৈ বলেন, ‘নেওন লাগে হেইর লইগ্যা নেই, ওইয়া তো আর পরতে পারি না, বাজার দিয়া কাফুর কিইন্যা পোশাক বানাইয়া লই। আর সরকারি-তা পইর্যা থাহে বাড়ি।’

গ্রাম পুলিশদের পোশাক নিয়ে এমন জটিলতা নতুন নয়। প্রতি বছরই এ ধরনের সমস্যায় পড়তে হয় তাদের। তবে এই নিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কিংবা থানা পুলিশের বড় বাবু’র মতো কর্মকর্তাদের সামনে গিয়ে নালিশ করার সাহস পায় না কেউ।

এ ব্যাপারে বাংলাদেশ গ্রাম পুলিশ কর্মচারী ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় সভাপতি ভবেন্দ্র নাথ বিশ্বাস বলেন, ‘সারা দেশে চৌকিদার-দফাদার মিলিয়ে প্রায় ৪৭ হাজার গ্রাম পুলিশ রয়েছে। যতদূর জানি এ বছর এসব গ্রাম পুলিশকে পোশাকসহ অন্যান্য সামগ্রী সরবরাহে প্রায় ২১ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে সরকার। জেলাওয়ারী টেন্ডারের মাধ্যমে ঠিকাদার নিয়োগ করে পোশাকসহ অন্যান্য সামগ্রী প্রস্তুত এবং সরবরাহ করা হয়। এক্ষেত্রে জেলায় জেলায় থাকে টেন্ডার এবং তা মূল্যায়নের কমিটি।’

তিনি বলেন, ‘কিন্তু সরবরাহ করা মালামালে সব সময়ই ত্রুটি থাকে। এ নিয়ে উপজেলা পর্যায়ে বিভিন্ন সময় মৌখিক অভিযোগও করা হয়েছে। কিন্তু সেইসব অভিযোগের কোনো ফল পাইনি। তাছাড়া সরকারি চাকরি করলেও চৌকিদার-দফাদার হিসেবে আমাদের কেউ খুব একটা মূল্যায়নও করে না। ফলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে ঝামেলা এড়াতে চুপ থাকে সবাই।’

বানারীপাড়ার পাশাপাশি বরিশালের আরও বেশ কয়েকটি উপজেলায় খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই অভিযোগ মিলেছে সরবরাহ করা পোশাকসহ অন্য সামগ্রীর ক্ষেত্রে। বেমানান মাপের পাশাপাশি পুরনো জুতা আর ভাঙা ছাতা পাওয়া গেছে বহু জায়গায়।

বিশারকান্দী ইউনিয়নের ২নং ওয়ার্ডের গ্রাম পুলিশ সিদ্দিকুর রহমান বলেন, ‘গত মাসের শেষের দিকে পোশাক দেয়া হয়েছে। এর প্রায় ৪-৫ মাস আগে এলাকায় এসে প্রত্যেকের মাপ নিয়ে গেছে ঠিকাদারের লোকজন। তারপরও কীভাবে এ রকম ভুল হতে পারে? তাছাড়া এবারই তো প্রথম নয়, প্রতিবছরই একই ঘটনার শিকার হচ্ছি আমরা।’

জেলা প্রশাসন সূত্রে পাওয়া তথ্যানুযায়ী, এ বছর বরিশাল জেলায় প্রায় ৮শ’ গ্রাম পুলিশকে পোশাক দিয়েছে সরকার। এজন্য বরাদ্দ ছিল ৩০ লাখ টাকা। টেন্ডার আহ্বানের পর ৪২ লাখ টাকা পর্যন্ত দর দিয়েছিল ঠিকাদাররা। জেলা প্রশাসন সর্বনিু দরদাতা হিসেবে ১৭ লাখ টাকার টেন্ডার দাখিল করা ‘হোসেন ব্রাদার্স’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে দেয় কাজটি। জানা গেছে, শুধু এবারই নয়, বহু বছর ধরে কাজটি করছে এই প্রতিষ্ঠান। বরিশালের পাশাপাশি আরও অন্তত ৮০টি জেলায় এই কাজ পেয়েছে তারা।

এ ধরনের সরবরাহ কাজে অভিজ্ঞতা থাকা একাধিক ঠিকাদার যুগান্তরকে বলেন, ‘সবচেয়ে নিুমানের সামগ্রী ব্যবহার করলেও সরবরাহ করা এসব পণ্য তৈরিতে মাথাপিছু কমপক্ষে ২ হাজার ৩শ’ টাকা ব্যয় হয়। ৮শ’ জনের ক্ষেত্রে এই ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় সাড়ে ১৮ লাখ টাকা। এর সঙ্গে বিভিন্ন উপজেলায় গিয়ে মাপ আনাসহ আনুষঙ্গিক ব্যয় যোগ করলে ২০ থেকে ২২ লাখ টাকার নিচে কোনোভাবেই সম্ভব নয় কাজটি করা। তার ওপর রয়েছে ঠিকাদারের লাভের বিষয়। যেখানে হিসাবের মাত্রা এমন সেখানে ঠিকাদার মাত্র ১৭ লাখ টাকায় কাজটি কীভাবে করবে তা বিচার-বিশ্লেষণ করে দেখা উচিত ছিল মূল্যায়ন কমিটির। এত কম টাকায় তারা এতকিছু সরবরাহ করল কীভাবে সেটাই তো বড় রহস্য।’

সরবরাহ করা পণ্যে ত্রুটি সম্পর্কে জানতে চাইলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হোসেন ব্রাদার্সের মালিক ইকবাল হোসেন বলেন, ‘মাপ নেয়ার সময় অনেককেই ঠিকমতো পাওয়া যায়নি। তাছাড়া বেছে বেছে ভালো পণ্যই সরবরাহের চেষ্টা করেছি আমরা। তারপরও যদি কোনো পণ্যে ত্রুটি দেখা দেয় তো অবশ্যই তা বদল করে দেয়া হবে।’

এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসক ড. গাজী মো. সাইফুজ্জামান বলেন, ‘পণ্য বুঝে নেয়ার আগে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখেছে এ সংক্রান্ত কমিটি। সেখানে গ্রাম পুলিশদের প্রতিনিধিরাও ছিল। তারপরও কীভাবে এ রকম হল বুঝতে পারছি না। তাছাড়া এ ব্যাপারে আমাদের কাছে কেউ কোনো অভিযোগও করেনি। ঠিকাদারের সঙ্গে করা চুক্তি অনুযায়ী ত্রুটিপূর্ণ পোশাক কিংবা অন্য সামগ্রী বদলে দেয়ার কথা রয়েছে। যাদের পোশাকে সমস্যা হয়েছে তারা চাইলেই তা বদলে নিতে পারেন। এক্ষেত্রে আর কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়।’সূত্র: যুগান্তর।