মেইন ম্যেনু

ঘরে বাইরে যার লড়াই : আইভীর প্রতিদ্বন্দ্বী ওসমান পরিবার!

times-61

নারায়ণগঞ্জে ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক পরিবারের একজন যোগ্য উত্তরসূরী হিসেবে শুধু নয়, পরিচ্ছন্ন ইমেজের কারণেও সেলিনা হায়াৎ আইভী সবার কাছে জনপ্রিয়। কিন্তু রাজনৈতিক বাস্তবতায় তাকে তার নিজের দল ও বিরোধীদলের সঙ্গে এবার লড়াই করতে হবে। রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের মধ্যেও এই নারী রাজনীতি থেকে পিছু হটেননি যার ফলে তিনি নারীর ক্ষমতায়নে একটি প্রতীক হয়ে উঠেছেন।

এমনিতে নারায়ণগঞ্জ দেশের অর্থনীতিতে চালিকাশক্তি হিসেবে বিশেষ ভূমিকা রাখছে। তবে রাজনীতিতে অনেক কুখ্যাত ঘটনার সৃষ্টি হয়েছে সেখানে। হালে শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্তকে মারধর, তার আগে সাত খুনের ঘটনাসহ অসংখ্য ঘটনা অনেক রাজনৈতিক গডফাদারের উপস্থিতি নারায়ণগঞ্জে এক ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি করে রেখেছে।

বলা চলে গোবরে পদ্মফুলের মতই একজন নারী হয়েও আওয়ামী লীগ নেত্রী সেলিনা হায়াৎ আইভী যোগ্যতার সঙ্গে মেয়রের দায়িত্ব পালন করেছেন। তাকে অনেকে ‘ছোট বোন’ হিসেবে সম্বোধন করলেও প্রথম পর্যায়ে মনোনয়ন না পেলে এটি তার পাপের ফসল হিসেবে বর্ণনা করা হয় প্রকাশ্যে সাংবাদিক সম্মেলনে। এরপর অলৌকিক ঘটনার মত সেলিনা হায়াৎ আইভী তার দলের মনোনয়ন পেয়ে যান। অনেকে মনে করেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে এটি সম্ভব হয়েছে এবং তিনি চান নারী নেতৃত্বের মধ্যে দিয়ে নারীদের ক্ষমতায়ন আরো এগিয়ে যাক।

কিন্তু ঘটনার পেছনের ঘটনা হচ্ছে আওয়ামী লীগ নেতা শামীম ওসমান অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে তিন সদস্যের সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থীর একটি তালিকা প্রস্তুত করতে অথবা করাতে সমর্থ হন যেখানে সেলিনা হায়াৎ আইভীর নামই ছিল না। তালিকার তিনজনই ছিলেন শামীম ওসমান সমর্থক বা তার পক্ষের লোক। এরপর তা আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে চলে যায় যেখান থেকে একটি নাম বেছে নেয়ার কথা ছিল।

কিন্তু আওয়ামী লীগের সংসদীয় বোর্ড ওই তালিকা পছন্দ করেনি। বোর্ডের প্রধান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বোর্ড তালিকার বাইরে সেলিনা হায়াৎ আইভীকেই ‘নৌকা’ প্রতীক নিয়ে নারায়ণগঞ্জে আগামী মেয়র নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্যে মনোনয়ন করে।

আইভীর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি নেতা তৈমুর আলম খন্দকার ইতিমধ্যে জানিয়েছেন, তারও নির্বাচনে অংশগ্রহণের ইচ্ছা আছে যদি দল তাকে মনোনয়ন দেয়। এর আগের নির্বাচনে ২০১১ সালে আইভী আওয়ামী লীগ প্রার্থী শামীম ওসমানকে এক লাখ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করেন। নির্বাচনের আগের দিন বিএনপি নেতা তৈমুর আলম খন্দকার তার নেত্রী বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম জিয়ার নির্দেশে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে সরে দাঁড়ান। তারপরও তার ভোট বাক্সে ৭ হাজারের বেশি ভোট পড়ে। এর পাশাপাশি বিএনপি ও জামায়াতের অনেক ভোট আইভীর ভোট বাক্সেও জমা পড়ে।

এবার বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেয়ার ঘোষণা দিয়েছে। এর ফলে আইভীকে পূর্বের মতই শামীম ওসমানের সমর্থক নিজ দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে এবং একই সঙ্গে বিএনপির সঙ্গে লড়াই করতে হবে। তবে পরিচ্ছন্ন ইমেজের জন্যে আইভী এখনো নারায়ণগঞ্জে জনপ্রিয়।

ইতিমধ্যে শামীম ওসমান তার সমর্থিত একজন প্রার্থী খুঁজছেন বলে জানা যাচ্ছে যিনি আইভীর বিরুদ্ধে শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠতে পারেন। ওসমান পরিবারের গৃহবধূ হিসেবে নাসিম ওসমানের স্ত্রী হতে পারেন সম্ভাব্য সেই প্রার্থী। জাতীয় পার্টির প্রভাবশালী নেতা নাসিম ওসমান মারা যাওয়ার পর পরিবারটি তাকে রাজনীতিতে সক্রিয় করে তোলার সিদ্ধান্ত নেয়।

ওসমান পরিবারের আরেক সদস্য সেলিম ওসমান এখন জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য। জাতীয় পার্টি এখনো নারায়ণগঞ্জে নির্বাচন করবে কি না সে ঘোষণা দেয়নি। জাতীয় পার্টি নির্বাচন করুক না করুক নাসিম ওসমানের স্ত্রী নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন এবং তিনি আওয়ামী লীগের ভোট ব্যাংকে হানা দিতে সমর্থ হলে তা হবে আইভীর জন্যে দুঃসংবাদ।

এছাড়া ২০০৯ সাল থেকে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকায় স্বাভাবিকভাবে এর প্রভাব পড়বে নারায়ণগঞ্জ মেয়র নির্বাচনে। আইভি বর্তমান মেয়র এবং গত নির্বাচনে যাদের ভোট পাননি এবার তারা স্থানীয় আওয়ামী লীগের মনোনীত তিন প্রার্থীর সমর্থকদের সঙ্গে একটি সমীকরণ তৈরি করতে পারলে তা নিঃসন্দেহে হবে আইভীর মাথা ব্যথার আরেক কারণ।

যে কোনো নির্বাচনে ভোটাররা ক্ষমতাসীন দলের ওপর কিছুটা বাড়তি অসন্তোষে ভোগেন। কারণ ক্ষমতাসীন দল যেমন কাজ করে তেমনি তাদের ত্রুটিও থাকে। নির্বাচনের সময় সেই ত্রুটিবিচ্যুতি ভোটারদের কাছে অনেক বড় হয়ে ধরা পড়ে। একারণেই আওয়ামী লীগ সমর্থিত মেয়র প্রার্থীরা চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল, সিলেট ও গাজীপুরে হেরে গেছেন। একই কারণে গত মেয়র নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী শামীম ওসমানকে আইভীর কাছে বিপুল ভোটে পরাজয় স্বীকার করে নিতে হয়।

নির্বাচনের পরিসংখ্যানে অতীত রেকর্ড বলে, বিএনপির শাসনামলে ১৯৯৪ সালে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও ২০০৫ সালে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে বিএনপি সমর্থিত মেয়র প্রার্থীরা তখনকার বিরোধী দল আওয়ামী লীগ সমর্থিত মেয়র প্রার্থীদের কাছে লজ্জাজনকভাবে পরাজয় বরণ করেন।

একই ঘটনা ঘটেছিল তার আগের সংসদ নির্বাচনে। তাই ২০১১ সালে আইভী যে লড়াই করেছিলেন তারচেয়ে এবারের লড়াই হবে তার জন্যে আরো কঠিন। আইভীর এবারের লড়াই ঘরে ও বাইরে। এছাড়া নারায়ণগঞ্জে এবারের মেয়র নির্বাচন সরকার ও নির্বাচন কমিশনের জন্যে আরেক অগ্নিপরীক্ষা। নির্বাচন সুষ্ঠু হলে সরকার ও নির্বাচন কমিশন ভোটারদের আস্থা পাবেন। যখন বিএনপি নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্যে নতুন নির্বাচন কমিশন গঠনের দাবি জানিয়েছে তখন নারায়ণগঞ্জের নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হওয়ার মধ্য দিয়ে সরকার ও কমিশনের কাছে তা হয়ে উঠতে পারে আস্থার দাওয়াই।