মেইন ম্যেনু

চুয়াডাঙ্গায় মাশরাফি, তাসকিন!

1480128434

এই মাঠে খেলেই বড় তারকা হয়েছিলেন ফুটবলার মামুন জোয়ার্দ্দার। জাতীয় দলে খেলা মাহমুদুল হক লিটনও এই টাউন ফুটবল মাঠের খেলোয়াড়। কিন্তু এখন আর ফুটবল খেলা তেমন হয় না। নতুন তারকা খেলোয়াড় আসছেন না চুয়াডাঙ্গা থেকে।

চুয়াডাঙ্গা-ঝিনাইদহ সড়ক ধরে এগোতে এগোতে প্রথম আলোর স্থানীয় প্রতিনিধি শাহ আলম নানান তথ্য জানান দিচ্ছেন। আমাদের গন্তব্য নবনির্মিত চুয়াডাঙ্গা জেলা স্টেডিয়াম। বড় কারও হাতে উদ্বোধনের অপেক্ষা করতে করতে জঙ্গলে রূপান্তরিত হয়েছিল স্টেডিয়ামটি। সম্প্রতি মাথাসমান উঁচু সেসব ঘাস-জঙ্গল কাটা হয়েছে। কারণ, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) চুয়াডাঙ্গাকে অনূর্ধ্ব-১৮ ইয়ং টাইগার্স ক্রিকেট টুর্নামেন্টের ভেন্যু করেছে।

সড়কের পাশের স্টেডিয়ামে একটা রোলার দিয়ে মাটি সমান করা হচ্ছে। মাঠের ঠিক মাঝখানে একজন যন্ত্র দিয়ে ঘাস কাটছেন। কাছে গিয়ে জানা গেল, তিনি বিসিবির জেলা কোচ। নাম খন্দকার জেহাদ-ই-জুলফিকার ওরফে টুটুল। বললেন, ‘সৌভাগ্য যে আমরা ভেন্যু পেয়েছি। তাই মাঠটাকে তৈরি করতে পারছি। পিচ বানাতে হবে।’

মাঠের এক কোণে কয়েকজন কিশোর অনুশীলন (নেট প্র্যাকটিস) করছে। তারা জেলা অনূর্ধ্ব-১৮ ক্রিকেট দলের সদস্য। মোট ২৪ জন ডাক পেয়েছে। এক কিশোর বল করছে। গায়ে ফুটবলার লিওনেল মেসি লেখা জার্সি। কৌতূহলোদ্দীপক! কাছে গিয়ে দেখলাম, দৌড় শুরুর আগে মাশরাফি বিন মুর্তজার মতো কাঁধ ঝাঁকাচ্ছে। দৌড়ানোর ভঙ্গিও মাশরাফির মতো। শেষে ক্রিজে এসে বলও ফেলছে পায়ের ওপর পুরো শরীরের সব ভর ছেড়ে দিয়ে।

কোচের দিকে তাকালাম। তিনি বললেন, এই ছেলেটা মাশরাফির মতো বল করে।

ইচ্ছা করেই করছে, নাকি এটা তার ন্যাচারাল অ্যাকশন?

ও সবকিছুতে মাশরাফিকে ফলো করে। নাম মো. আজিজুল হাকিম আশিক।

আশিকের ওভার শেষে আরেকজন কিশোর বল করতে ছুটছে। একি! হাতের পেশি বের করা শক্তি দিয়ে বলকে খিঁচে ধরে দৌড়ে আসছে উইকেটের দিকে। বল ধরা হাতটি বুকের কাছাকাছি উচ্চতায় স্থির। তাসকিন আহমেদ! হ্যাঁ, এই কিশোরের বোলিং অ্যাকশন একেবারে তাসকিনের মতো। কোচ টুটুল বললেন, ওর নাম সরল মল্লিক। সে তাসকিনকে ফলো (অনুকরণ) করে।

বোলিং শেষে সরলকে কাছে ডাকলাম। পুরো নাম মো. সরল মল্লিক। পড়ে দশম শ্রেণিতে, গোকুলখালী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে। বাবা কৃষিকাজ করেন, একটা পানদোকানও আছে।

সরলের মা দিলারা খাতুন ছেলের খেলার বিষয়ে উদার। জেলার আলমডাঙ্গা উপজেলার কুলপাড়া গ্রাম থেকে প্রতিদিন ভোর ছয়টায় সাইকেলে চেপে খেলতে আসে সরল। আজ সকালে একটা বিস্কুট খেয়ে এসেছে সে। বেলা দুইটায় এখান থেকে ছাড়া পেলে বাড়ি ফিরে ভাত খাবে।

বিপিএলের খেলা দেখে তাসকিনকে অনুকরণ করা শুরু করে সরল মল্লিক। গ্রামে বন্ধুদের সঙ্গে খেলত সে। আট মাস আগে এক বন্ধু তাকে নিয়ে এল জেলার রয়েল বেঙ্গল ক্রিকেট একাডেমিতে। সেখান থেকে এখন জেলা অনূর্ধ্ব-১৮ দলে।

তাসকিনের বল ধরা, দৌড়ানোর ভঙ্গি ছাড়া তাঁর বোলিংয়ের আর কোন দিকটা ভালো লাগে তোমার?

—ভাই আউটসুইং, বাউন্সার বেশি দেন। এটা ভালো লাগে। বল করার পর হাত দিয়ে মাথার চুল একটু ওপরে তুলে দেওয়া—এই, এগুলো।

আর উইকেট পেলে যে উদ্‌যাপন?

—ওটা তো খুব বেশি ভালো লাগে।

তাসকিনের সঙ্গে দেখা হয়েছে কখনো?

—না।

দেখা করতে চাও?

—অবশ্যই।

সহকর্মী শাহ আলম এতক্ষণ আশিকের বোলিং অ্যাকশনের ছবি তুলেছেন। ভিডিও করেছেন।

গড়নে ছোটখাটো ধূসর চোখের আশিক চুয়াডাঙ্গা পৌর ডিগ্রি কলেজে দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়ে। এর আগে জেলা অনূর্ধ্ব-১৪ ক্রিকেটে খেলেছে। দুই মৌসুমে পাঁচ উইকেট পেয়েছে। দুই বোন আর মাকে নিয়ে তার পরিবার। আশিক সবার বড়। জেলা শহরের শান্তিপাড়ার এই কিশোর নিজে চলার জন্য একটা টিউশনিও করে।

মাশরাফিকে কবে থেকে অনুকরণ করো?

—২০০৪-২০০৫ সাল থেকে।

কেন?

—ভাইয়ের রানআপ থেকে শুরু করে সবকিছু পছন্দ করি। হাঁটাচলা, কথাবার্তা—সবকিছু কপি করতে ভালো লাগে।

মাশরাফিকে সরাসরি কখনো দেখেছ?

—দেখা হলে জীবনটা সার্থক হয়ে যেত।

তুমি তো পরিবারে বড় ছেলে। বাবা মারা গেছেন। দায়িত্ব তো অনেক।

—আমার একটাই ইচ্ছা—ক্রিকেটার হওয়া। তবে মুরব্বিরা চান না। মা (রহিমা বেগম) সাপোর্ট করেন আমার জোরজবরদস্তির কারণে। এখন একটাই পথ—জেলা টিমে ভালো করা।

পেসার হান্টিংয়ে চেষ্টা করেছ?

—গাজী টায়ার পেসার হান্টিংয়ে গেছি। হয়নি। আমার বলে পেস কম।

কত লাগে?

—১২০ কিলোমিটার। আমার সম্প্রতি ১০৫ পর্যন্ত উঠেছে। এখন রানআপ, ডেলিভারির ওপর কাজ করছি। ডেভেলপ হচ্ছে। ইনসুইং-আউটসুইং নিয়ে কাজ করছি। আমি শারীরিকভাবে একটু দুর্বল। তাই পেস কম পাই।

একেবারে মাশরাফির মতো বল করতে গিয়ে সমস্যা হচ্ছে না তো?

—যাঁর খেলা দেখে ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্ন দেখছি, তাঁকে তো বাদ দিতে পারি না। ব্যাটিংও ভাইয়ের মতো করতে চেষ্টা করি। কারণ, ভাই যখন খেলায় থাকবেন না, তখন তাঁর ফ্যানরা যাতে আমাকে দেখে অন্তত সান্ত্বনা পান।

মাশরাফির সঙ্গে কখনো দেখা হয়েছে বা ফোনে কথা হয়েছে? তোমার পাশের জেলারই তো!

—না, দেখা হয়নি। তবে নড়াইলে খেলতে গিয়ে মাশরাফি ভাইয়ের মায়ের সঙ্গে দেখা করেছি। তখন টিমের বন্ধুরা তাঁকে জানিয়েছেন, আমি ভাইয়ের মতো বল করি।

শুনে তিনি কী বললেন?

—বললেন, তুমি ভাইয়ের মতো কেন হবা। ভাইয়ের চেয়ে বড় হও। সেই দোয়া করি। আমি বলেছি, আন্টি, ভাইয়ের ওপরে যেতে চাই না। ভাই তো গুরু।

তারপর?

—আন্টি তাঁর ফোন নম্বর দিলেন আমাকে। বললেন, ফোন করবা। বলবা, চুয়াডাঙ্গার আশিক। তাহলে আমি তোমাকে চিনব। ভাই বাড়ি এলে কথা বলায়ে দেব।

ভাইয়ের সঙ্গে কথা হয়েছে?

—না। গত রোজার ঈদে একবার চেষ্টা করেছি। ভাই তো ছুটে বেড়ান। তাই দেখা হয় না। তবে আন্টির সঙ্গে মাঝে মাঝে কথা হয়।

কী কথা বলো তোমরা?

—এই, ভালো-মন্দ খোঁজখবর। শারীরিক অবস্থা কেমন। ফাঁকে ভাইয়ের খবর নিই।

সর্বশেষ কবে কথা হয়েছে?

—আফগানিস্তানের সঙ্গে ম্যাচে বোলিং করার সময় ভাই মাটিতে পড়ে গেলেন। মন খুব খারাপ হয়েছে। পরে আন্টিকে ফোন করেছি। তিনি সান্ত্বনা দিয়েছেন। বলেছেন, ভাই পড়ে গেছে। তোমাদের দোয়ায় আবার তো উঠেও দাঁড়াইছে। খেলছে। তোমরা সবাই দোয়া করো ভাইয়ের জন্য। বললাম, ভাইয়ের জন্য দোয়া তো সারা জীবন করব।

অধিনায়ক মাশরাফির মা হামিদা মুর্তজার সঙ্গে কথা বললাম মুঠোফোনে। চুয়াডাঙ্গার আশিকের কথা বলতেই হেসে বললেন, ‘ওহ। খুব ভালো ছেলে। একটু চঞ্চল। একটাই কথা—মাশরাফির মতো হবে। আমি বলি, মাশরাফির মতো হবা কেন, আরও বড় হতে হবে।’ তাঁর ছেলের প্রতি তরুণদের এই ভালোবাসাকে কীভাবে দেখেন, জানতে চাইলে বললেন, ‘অনেকে আসে। সবার সঙ্গে কথা বলি, সময় দিই। এভাবেই যেন বাকি জীবন থাকতে পারি।’

ক্রিকেট আমাদের সমাজকে বিনি সুতোর মালায় গাঁথছে। তৈরি করছে আবেগের বন্ধন। চুয়াডাঙ্গার মতো জেলায় প্রথম বিভাগে ১২টি এবং দ্বিতীয় বিভাগে ৪২ ক্লাবের অস্তিত্ব ক্রিকেটের প্রতি তরুণদের তুমুল আগ্রহেরই প্রকাশ। তবে এর মধ্যেই নতুন কোনো মামুন জোয়ার্দ্দার টাউন মাঠে গেয়ে উঠুক ফুটবলের গান। দেশের প্রতিটি জেলার মাঠে মাঠে ব্যাট-বলের মধুর শব্দের সঙ্গে ফুটবলের শব্দ যুগলবন্দি রচনা করুক।-প্রথম আলো