মেইন ম্যেনু

জঙ্গি সন্দেহে আরও ৬ জনকে ফেরত পাঠিয়েছে সিঙ্গাপুর

জঙ্গি সন্দেহে আরও ৬ জনকে ফেরত পাঠিয়েছে সিঙ্গাপুর সরকার। এ নিয়ে গত এক বছরে ৩৭ জনকে ‘সন্দেহভাজন জঙ্গি’ হিসেবে সিঙ্গাপুর সরকার দেশে ফেরত পাঠালো। সর্বশেষ ফেরত পাঠানো ৬ জনকে ঢাকার কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট মতিঝিল এলাকা থেকে গ্রেফতার দেখিয়ে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে। এই ছয় জনের মধ্যে আপন দুই ভাইও রয়েছে। তারা হলো—আশুলিয়ার আব্দুল কুদ্দুস শিকদারের দুই ছেলে হাসারুল কবির ওরফে রাসেল (৩৪) ও হোসাইন কবির ওরফে রুবেল (৩৬)। বাকিরা হলো—কুমিল্লার আব্দুল মতিনের ছেলে মহিউদ্দিন (৩৭), ঝিনাইদহের আক্কাস আলীর ছেলে আফজাল হোসাইন (৩৫), কুমিল্লার আহসান আলীর ছেলে শাহাদত হোসাইন (২৩) ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আব্দুল কুদ্দুসের ছেলে রাকিবুল ইসলাম (২৭)।

এর আগে গত বছরের ১৬ নভেম্বর থেকে ১ ডিসেম্বরের মধ্যে জঙ্গি সন্দেহে সিঙ্গাপুরে ২৭ বাংলাদেশিকে আটকের পর ২৬ জনকে ফেরত পাঠানো হয়। তাদের মধ্যে ১৪ জনকে গ্রেফতারের পর জিজ্ঞাসাবাদ শেষে কারাগারে পাঠানো হয়। বাকি ১২ জনকে মুচলেকা দিয়ে ছেড়ে দেয় পুলিশ। এছাড়া চলতি বছরের মে মাসের প্রথম সপ্তাহে জঙ্গি সন্দেহে ৫ বাংলাদেশিকে ফেরত পাঠায় সিঙ্গাপুর। ৪ মে রামপুরার বনশ্রী এলাকা থেকে গ্রেফতারের পর তাদেরও রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তারাও বর্তমানে কারাবন্দি।

কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের উপ-কমিশনার মহিবুল ইসলাম বলেন, ‘গ্রেফতারকৃতরা সিঙ্গাপুরে কাজ করতে গিয়ে উগ্রপন্থায় জড়িয়েছিল। তারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভিন্ন পোস্ট করাসহ বিভিন্ন স্থানে মিলিত হয়ে জিহাদি আলোচনা করতো। তারা কার মাধ্যমে মোটিভেটেড হয়েছিল এবং তাদের পরিকল্পনা কী ছিল, তা জানার চেষ্টা চলছে।’

কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের একটি সূত্র জানায়, গত ১৭ অক্টোবর গোপন সংবাদের ভিত্তিতে তারা জানতে পারেন মতিঝিলের বিটিআরসি আন্তজেলা বাস ডিপোর সামনে ১০-১২ জন জঙ্গি একত্রিত হয়ে ইসলামি রাষ্ট্র কায়েমের জন্য বৈঠক করছে। এই জঙ্গি সদস্যদের সিঙ্গাপুর থেকে ফেরত পাঠানো হয়েছে। গোপন ওই সংবাদের ভিত্তিতে ওই দিন দুপুরেই কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের একটি দল সেখানে অভিযান চালিয়ে ৬ জনকে আটক করে। পরে সেদিনই মতিঝিল থানায় তাদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে একটি মামলা (নম্বর ২৩) দায়ের করা হয়। মামলায় গ্রেফতারকৃতদের সহযোগী মামুন ও হাসানসহ আরো ৬-৭ জন পালিয়ে গেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

মামলা সূত্রে জানা গেছে, গ্রেফতারকৃতরা সবাই জঙ্গি সংগঠনের সদস্য। তারা সবাই সিঙ্গাপুরে শ্রমিক হিসেবে কর্মরত ছিল। শ্রমিক হিসেবে কর্মরত থাকা অবস্থায় সিঙ্গাপুরে তাদের থাকার জায়গা ও আশেপাশে যে সব স্থানে মুসলমানেরা বেশি সংখ্যায় বসবাস করে, সেখানে একত্রিত হয়ে বাংলাদেশে জঙ্গি কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সদস্য সংগ্রহ, অর্থ সংগ্রহ, জিহাদি প্রকাশনাসহ অন্যান্য সন্ত্রাসী কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বৈঠক করত। প্রত্যেক রবিবার তারা জিহাদি বক্তব্য দিতো এবং জিহাদি ভিডিও প্রদর্শন করতো। সিঙ্গাপুর পুলিশের কাছে বিষয়টি প্রকাশিত হলে তাদের গ্রেফতার আটক করে দেশে ফেরত পাঠিয়ে দেওয়া হয়। তারা আর কোনও দিন সিঙ্গাপুরে প্রবেশ করতে পারবে না বলেও জানিয়ে দেওয়া হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সিঙ্গাপুর থেকে ফেরত পাঠানো সন্দেহভাজন এই জঙ্গি সদস্যরা বিমানবন্দর থেকে গ্রামের বাড়িতে না গিয়ে ঢাকায় আত্মগোপন করে থেকে জঙ্গি কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছিল। তারা মূলত বাংলাদেশে ইসলামি রাষ্ট্র কায়েম করা ও তাদের মৌলবাদী মতাদর্শকে বাস্তবায়নের সদস্য সংখ্যা বাড়ানোর চেষ্টা করছিল।

মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে রাকিুবল ইসলামের কাছ থেকে এআইজি ট্রাভেল গার্ড নামে একটি ব্যঠস, মুজাফফার বিন মহসিন লিখিত ‘জাল হাদিসের কবলে’ নামে একটি বই, হাফেজ আব্দুল মতিন আল মাদানী লিখিত ‘আল্লাহ ও রাসুল (সা.) সম্পর্কে সঠিক আক্বীদা’ শীর্ষক বই, মাসিক আত-তাহরিক নামে একটি পত্রিকা ও রাকিবুল ইসলামের নামে একটি পাসপোর্ট (নং এই৩২৬৫১৫২) উদ্ধার করা হয়েছে।

গ্রেফতারকৃত আফজাল হোসেনের কাছ থেকে জহুর বিন ওসমান লিখিত ‘দ্বীন কায়েম আগে ঘরে, পরে রাষ্ট্র’ ও ‘ইক্বামতে দ্বীন না ফিক্বাহ মতে সিংহাসন’ শীর্ষক দুটি বই, মুজাফফর বিন মহসিন লিখিত ‘ভ্রান্তির বেড়াজালে ইক্বামতে দ্বীন’ নামে একটি বই, ‘আত তাহরীক’ নামে একটি পত্রিকা ও আফজাল হোসেন নামের একটি পাসপোর্ট (নম্বর বই ০৯২২৪৩২) উদ্ধার করা হয়।

গ্রেফতারকৃত শাহাদত হোসেনের কাছ থেকে স্টে সেফ নামে একটি ব্যাগ, আমিনুল ইহসান লিখিত ‘লা ইলাহা ইল্লাহু-২’ নামে একটি বই, আসাদুল্লাহ আল-গালিব লিখিত ‘সালাতুর রাসুল (সা.)’ নামে একটি বই, মুজাফফর বিন মুহসিন লিখিত ‘ঈদের তাকবির’ শীর্ষক একটি বই, মাসিক আত-তাহরীক পত্রিকা ও শাহাদতের পাসপোর্ট (নম্বর বিএফ ০৭৬৫৮০১) জব্দ করা হয়েছে। হাসারুল কবির রাসেলের কাছ থেকে তার পাসপোর্ট (নম্বর বিই ০৭৮৫৪০৩), ‘বিশ্ববাসী মুসলিমদের কাছে ধনী’, শায়খুল হাদীস আল্লামা সফিউর রহমান মোবারক পুরী লিখিত ‘আর-রাহীকূল মাখতূম’ শীর্ষ একটি বই জব্দ করা হয়।

এছাড়া মহিউদ্দিনের কাছ থেকে সাইয়্যেদ মাসুদুল হাসান লিখিত ‘রাসুল সম্পর্কে ১০০০ প্রশ্ন’ শীর্ষক একটি বই, আব্দুর রাজ্জাক বিন ইউসুফ লিখিত ‘উপদেশ’ নামে একটি বই, মুহাম্মদ ইকবাল ক্বিলানী লিখিত ‘কুরআন পড়ি কুরআন বুঝি’ শীর্ষক একটি বই ও মহিউদ্দিনের পাসপোর্ট (নম্বর বিএ ০৮৩১১৬৫) জব্দ করা হয়েছে। হোসাইন কবিরের কাছ থেকে ‘সালাত সম্পাদনের পদ্ধতি’, মুহাম্মদ ইকবাল ক্বিলানী লিখিত ‘ইত্তেবায়ে সুন্নাহ’ ও আসাদুল্লাহ আল-গালিব লিখিত ‘সালাতুল রাসুল’ শীর্ষক বই এবং হোসাইন কবিরের পাসপোর্ট (নম্বর বিএ ০৭৫৫৭৮০) জব্দ করা হয়।

কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন, ‘আল-কায়েদা নেতা আনওয়ার আল-আওলাকির অনুসারী কয়েকজন ব্যক্তি সিঙ্গাপুরে থাকা শ্রমিকদের মোটিভেট করে জঙ্গিবাদে জড়ানোর চেষ্টা করে আসছে। শীর্ষ এসব জঙ্গি নেতাদের শনাক্ত করে তাদের আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।’