মেইন ম্যেনু

জাপানিরা কেন আত্মহত্যায় শীর্ষে?

tanjina-yasmin20161031102306

তানজীনা ইয়াসমিন : অল্প কিছুদিনের জন্য আমাদের নতুন এক বিল্ডিংএর ফ্ল্যাটে অফিস করতে হয়েছিল যেখানে একটাই টয়লেট ছিল। বিড়ম্বনা ঠেকলো যখন টোকিও থেকে নতুন জয়েন করা ওয়েব পেইজ ডেভেলপার বার বার টয়লেটে যায় এবং লম্বা সময় টয়লেটে কাটায়। এমনিতেই জাপানিরা দুর্বোধ্য এক জাতি, আচরণের অনেকটাই অভিনয়; তায় আমি একা বিদেশি।

উপায়ান্তর না পেয়ে একমাত্র মহিলা অফিস সেক্রেটারিকে জিজ্ঞেস করলাম । (উল্লেখ্য , জাপানে অফিস সহকারীই মেয়েদের প্রধানতম পেশা এবং খণ্ডকালীন ।) তো সেই মেয়ে যা জানালো তাতে আমার চক্ষু চড়ক গাছ!
– না টয়লেটে বসে নেট সার্ফিং বা অন্য কিছু না। ধাতস্থ করে নিজেকে বাইরের জগতে মিশবার জন্য।
-কিসের ধাতস্থ?
– ও মাঝখানে ১ বছর নিজেকে গৃহবন্দী রেখেছিল তো, তাই ।
-কেন? কি অপরাধে?
– কোন অপরাধ না! এমনি! জাপানে তো এমন লক্ষ লক্ষ পুরুষ মানুষ থাকে। তুমি জাননা ! টিনেইজার থেকে শুরু করে মধ্য ত্রিশ পর্যন্ত! একে বলে “হিকিকোমরি” অর্থাৎ “ প্রত্যাহার” বা “অব্যাহতি”। নিজেকে রুমের ভেতর আবদ্ধ করে রাখে। বাইরের পৃথিবীর সাথে যোগাযোগ রাখেনা, এমনকি ঘরের মানুষের সাথেও না। এক রুমেই থাকে ।
মেয়েটার নির্লিপ্ত জবাবে আমি স্তব্ধ! প্রশ্ন করার বোধ হারিয়ে ফেলেছি। অনেক কষ্টে জিজ্ঞেস করলাম,
– তো এরা বাইরে যায় না, সমাজ বা স্কুল-কলেজ থেকে খোঁজ নেয় না? বাবা মা কিছু বলে না ?
– না , প্রাইভেসিতে হস্তক্ষেপ। মা বাবা ভাবেন ওকে কিছুদিন সময় দিলে এ থেকে বের হয়ে আসবে। আর বেরিয়ে আসার পর সাধারণত সেই শহরে থাকে না, পাছে লোকে জেনে কিছু ভাবে যে সে এই রোগে আক্রান্ত ছিল!

কলিগটা টয়লেট থেকে বের হয়ে এলো। আমি প্রথমবারের মত তাকে তাকিয়ে দেখলাম। ছয় ফিটের ওপর লম্বা, ছিপছিপে এক হারা । বয়স ৩৭ কিন্তু দেখতে ত্রিশের বেশি মনে হয় না। ডিজাইন নিয়ে কাজ করা মানুষজন সাধারণত শৌখিন হয়, সেও বেশ ফ্যাশনেবল । এবং আমার দেখা অন্যতম সেরা সুদর্শন জাপানিজ । এই লোকের কিনা এই ব্যাধি! এ কারণেই কিনা কে জানে বিয়ে করেনি, বান্ধবীও নেই। বাবা মার সাথে শহরের অভিজাত এলাকায় বিলাসী ফ্ল্যাটে থাকে।

ভাল করে পড়ে জানলাম, এই রোগের হার আসলেই মিলিয়নের ওপর। বিবিসি’র এক রিপোর্টে এসেছে টোকিওতে ১৭ বছরের এক ছেলেকে সহপাঠি বেনামে অবমাননাকর চিঠি লিখেছিল, স্কুলের মাঠে তাকে অপমান করে বাজে ছবি এঁকেছিল বলে বাড়ি ফিরে রান্না ঘরে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দিল। আর দরজা খোলেনা। ওখানেই সে নিজের থাকার জায়গা বানিয়েছে। বাধ্য হয়ে তার পরিবার বাড়ির অন্য রুমে রান্নার ব্যবস্থা করেছে। দিনে তিন বেলা মা দরজার সামনে খাবার দিয়ে আসেন। ছয় মাসে একবার গোসল করে। বাইরের কেউ ঘরে এলে তারা জানতে দেন না ছেলের কথা, এমনকি এই রিপোর্টেও তার নাম বলেনি।

মনোবিজ্ঞানীদের মতে এর মূল শেকড় গাঁথা আছে জাপানের ইতিহাসেই। ১৮৬৮ তে সম্রাট মেইজি ক্ষমতায় বসার আগ পর্যন্ত তারা বহির্বিশ্বের সাথে ছিল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। বংশগতির ধারায় নিজেকে আবদ্ধ করে রাখা এভাবেই তারা ধারণ করছে। প্রাইমারি স্কুলে নিয়ম করে শেখানো হয় “তোমার মনের ৩০% কেবল প্রকাশ করবে। বাকি ৭০% থাকবে অপ্রকাশ্য”। মন খুলে কথা বলার কোন অবকাশই নাই। এর ভালটা বাইরে থেকে যা দেখি তা হলো বিনয়ের অবতার এই জাতি। কিন্তু খারাপটা “হিকিকোমরি “ ছাড়াও সবচেয়ে আলোচিত হলো আত্মহত্যায় শীর্ষস্থান।

বিগত তিন বছরের এর হার অনেক কমে এলেও বছরে ৩০,০০০ লোক আত্মহত্যা করে জাপানে। দিনে গড়ে ৭০ জন। এর মধ্যে সর্বাধিক ২০-৪৪ বছরের পুরুষ । প্রধানতম এক সামাজিক সমস্যা। বিভিন্ন বড় কর্পোরেট হাউজে সাইকোলজিকাল ট্রেনিং দেয়া হয় আত্মহত্যা প্রতিরোধে সচেতন করতে। কর্মীদের এতে আগ্রহ নাই। তবুও করতে হয়।

আত্মহত্যার ট্রেনিংএর শুরুতে ভূমিকা দেয়া হয় , “আত্মহত্যা আপনার ব্যক্তিগত বিষয় বা অধিকার। কিন্তু আমাদের ট্রেনিং আপনার আত্মহত্যাকে বাধা দেয়ার জন্য নয়। কোথায় কম খরচে কিভাবে আত্মহত্যা করা যায় তারই কিছু টিপস দেবো।”

এমন ভূমিকা আত্মহত্যাপ্রবণদের কাছে খুব লোভনীয়। গোটা রুম তার দিকে ঘুরে যায়, চোখ বড় করে শোনে, প্রথমেই কিছু পরিসংখ্যান –
১. টোকিওতে যারা আত্মহত্যা করেন তাদের অধিকাংশই “চলন্ত ট্রেনের নিচে ঝাঁপিয়ে পড়া” বেছে নেয়। পছন্দের মূল কারণ হলো অল্প সময়ে নিশ্চিত মৃত্যু।
২. সময় হিসেবে বেছে নেন সোমবার সকাল ৮ টা থেকে ১০ টা। এটা বেছে নেয়ার যুক্তি হলো ট্রেন লাইনে ঝাঁপিয়ে আত্মহত্যাকারীরা নাকি অনেক লম্বা সময় ধরে প্ল্যান করেন না। সোমবার সাধারণত সাপ্তাহিক মিটিং থাকে। সাপ্তাহিক পারফরমেন্স ভাল না থাকলে বসকে কি অজুহাত দেবেন এ চিন্তা করতে করতে বাসা থেকে বের হন। কিন্তু উপায় খুঁজে না পেয়ে আত্মসম্মান রক্ষা করার ‘পবিত্র দায়িত্ববোধ’ থেকে অফিসে যাবার পথে সুবিধা মত একটা ট্রেন বেছে নেন। দেন ঝাঁপ।

যিনি মরেন উনি তো মরে বেঁচে যান। সমস্যায় পড়েন উনি যে কোম্পানিতে চাকরি করতেন, সেই কোম্পানি আর ওনার পরিবার। ধাক্কাটা প্রাথমিকভাবে অর্থনৈতিক। যেমন টোকিওর ব্যস্ততম লাইনগুলিতে পিক আওয়ারে প্রতি আড়াই মিনিটে একটা করে ট্রেন আসে। দিনে সাড়ে তিরিশ লক্ষ লোক চলাচল করে]। আত্মহত্যার কারণে ট্রেনটি যদি ১০ মিনিট বন্ধ থাকে তাহলে অর্থনৈতিক ক্ষতি ১০ কোটি টাকার উপরে চলে যায় (এখন নাকি দক্ষলোক ও আধুনিক যন্ত্রপাতির মাধ্যমে সাড়ে ৫ মিনিটে লাশ তুলে জায়গা পরিষ্কার করে ট্রেন চালু করাতে পারে)। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ এই বিল উকিলের মাধ্যমে মৃত ব্যক্তির কোম্পানি অথবা পরিবারকে পাঠিয়ে দেন। ১০ কোটি টাকা অনেক বড় অংক। কোন কোন পরিবারে এই ঋণের চাপে একের পর এক আত্মহত্যার সিরিজ শুরু হয়ে যায়।

তো প্রশিক্ষক জানান, “কম খরচে আত্মহত্যার জায়গা আছে। যেমন শহরতলীর ট্রেনগুলো। দুটো ট্রেনের মধ্যে সময়ের গ্যাপ বেশি। যাত্রী সংখ্যাও কম। আর যদি শনিবার, রোববার আত্মহত্যা করেন তাহলে খরচ কমপক্ষে ১০ গুণ কমিয়ে আনতে পারবেন। এতে আপনার কোম্পানির খরচ কমবে। মনে রাখবেন আত্মহত্যা আপনার একান্তই ব্যক্তিগত অধিকার। তবে অন্যের ভোগান্তি একটু কমিয়ে মরলে ভাল হয় না?”

ফুজি পাহাড়ের পাদদেশে “আওকিগাহারা” বনে ২০১০এ ৫০ জন আত্মহত্যা করেছে , যা বিশ্বের ২য় জনপ্রিয় সুইসাইড স্কোয়ার ( ১ নম্বরে আছে সানফ্রানসিসকোর গোল্ডেন গেইট ব্রিজ)। আগ্নেয়গিরির দেশ জাপান। আগ্নেয়গিরিও ঘিরে রাখা হয় ‘আত্মহত্যাপ্রেমী’দের উপদ্রপে। এর কারণও সেই ইতিহাস আর জিন । যুদ্ধে পরাজয় বা ভুল ত্রুটির জন্য “ হারাকিরি” ( হারা =পেট , কিরি = কাটা ) প্রথা আর “কামিকাজে” যোদ্ধা ( আত্মঘাতি যুদ্ধবিমান চালক) তো গোটা বিশ্বের কাছেই আলোচিত।

ল্যাব থেকে কয়েক গ্রাম আর্সেনিক হারিয়ে গেছে , এতো বিষ যদি কেউ খেয়ে আত্মহত্যা করে? কি করে এমন গাফিলতি হল ভেবে প্রফেসর আত্মহত্যা করে বসলেন। বাবার সাথে সামান্য কথা কাটাকাটি , বারান্দায় দাঁড়িয়ে “সায়োনারা” বলে বিল্ডিং এর নিচে ঝাঁপিয়ে পড়লো মেয়ে , আমাদের এক বাঙালি বন্ধুর বিল্ডিংএ, তার চোখের সামনে । বাবা দৌড়ে এসে এই দৃশ্য দেখে নিজেও দিলেন ঝাঁপ!

দেখে মনে হয় , এই যে আমাদের রাগ বিরক্তি কিছুই লুকাতে হয় না কারণ সভ্যতা বেশ কমই ছুঁয়েছে আমাদের; যেখানে সেখানে ইচ্ছা হলেই যা মুখে আসে বলে খিস্তি খেউড় চালু, উচ্চ শব্দে মাইক বাজিয়ে প্রলয় নাচন শুরু , “গোপন কথা রয়না গোপনে” এও হয়তো মন্দের ভালই!

লেখক : কলামিস্ট; প্রাক্তন রিসার্চ ফেলো, কিউশু বিশ্ববিদ্যালয়; বিভাগীয় প্রধান, বিজনেস প্ল্যানিং ডিপার্টমেন্ট, স্মার্ট সার্ভিস টেকনোলজিস কো. লিমিটেড, ফুকুওকা, জাপান



(পরের সংবাদ) »