মেইন ম্যেনু

দাবি যতই উঠুক, সু চি’র নোবেল প্রত্যাহারের সুযোগ নেই

4d96014c4dcd922c74643ce3c208c44a-58316e98b9858

শান্তিতে নোবেল জয়ের পরও রোহিঙ্গা ইস্যুতে বিতর্কিত ভূমিকার কারণে মিয়ানমারের নেত্রী আং সা সুচির নোবেল পুরস্কার প্রত্যাহারের দাবি ক্রমাগত জোরালো হচ্ছে। পিটিশন ওয়েবসাইট চেঞ্জ ডট ওআরজি-তে জমা হচ্ছে একের পর এক আবেদন। আগে থেকে পিটিশনতো ছিলই; তাছাড়া সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে নতুন করে সহিংসতা শুরুর পর গত কয়েকদিনে চেঞ্জ ডট ওআরজি-তে বেশ কয়েকটি নতুন পিটিশন জমা হয়েছে। সেইসঙ্গে পুরনো পিটিশনে স্বাক্ষরদাতাদের সাড়া বেড়েছে। তবে সমালোচনা যতই উঠুক না কেন, আজ পর্যন্ত পুরস্কার প্রদানের পর কারও পুরস্কার প্রত্যাহার করে নেয়নি নোবেল কমিটি। কেবল তাই নয়, নোবেল ফাউন্ডেশনের নীতিমালা অনুযায়ী, নোবেল পুরস্কার প্রত্যাহার করে নেওয়ার সুযোগ নেই। ফাউন্ডেশনের নিয়ম অনুযায়ী, নির্দিষ্ট কোনও ব্যক্তিকে নোবেল দেওয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠলে ‌এবং তা পর্যালোচনার প্রয়োজন পড়লে তা পর্যালোচনা করা যাবে; তবে তাও ৫০ বছরের আগে নয়।

উল্লেখ্য, চেঞ্জ.ওআরজি হলো একটি পিটিশন ওয়েবসাইট। মূলত মানবাধিকার, শিক্ষা, পরিবেশগত সুরক্ষা, প্রাণী অধিকার, স্বাস্থ্য এবং টেকসই খাদ্যসহ বিভিন্ন ইস্যুতে বিভিন্ন দেশের বিপর্যয়পূর্ণ পরিস্থিতিতে পরিবর্তন চেয়ে কিংবা আন্তর্জাতিক কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ চেয়ে এখানে পিটিশনের জন্য স্বাক্ষর গ্রহণ করা হয়। অর্থাৎ চেঞ্জ.অর্গ ওয়েবসাইটটি পিটিশনের স্বাক্ষর গ্রহণের জন্য প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করে। যেকেউ, যেকোনও জায়গা থেকে এখানে পিটিশন শুরু করতে পারে এবং মানুষের স্বাক্ষর গ্রহণের মাধ্যমে সমর্থন যোগাড় করতে পারে। ভার্জিন আমেরিকার মতো কর্পোরেশন এবং অ্যামনেস্টি ও হিউম্যান সোসাইটির মতো সংস্থাগুলো এ ওয়েবসাইটের অর্থ যুগিয়ে থাকে।

যে কারণে ক্ষোভের মুখে সু চি

১৯৯১ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পাওয়া সু চির বিরুদ্ধে পিটিশনগুলো করার কারণ হলো রোহিঙ্গা মুসলিম প্রশ্নে তার নীরব অবস্থান। মিয়ানমারের সংখ্যালঘু মুসলমানরা দীর্ঘদিন ধরেই রাষ্ট্রীয় ও সংখ্যাগুরু বৌদ্ধদের সন্ত্রাসের শিকার হচ্ছেন। এ বিষয়ে বরাবরই নিশ্চুপ থেকেছেন শান্তিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী এ নেত্রী। সু চির এমন আশ্চর্যজনক নীরবতা তার অনেক কট্টর সমর্থকের মনেও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। ২০১৫ সালের ৮ই নভেম্বর মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় পদার্পণের ঐতিহাসিক নির্বাচনে সু চির দল কোনও মুসলিম ব্যক্তিকে প্রার্থী না করার পর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে আল জাজিরা তুলে আনে মুসলিমদের ওপর নিপীড়ন নিয়ে সু চির ধারাবাহিক নীরবতার প্রশ্ন। দলের বিভিন্ন শীর্ষ নেতাকে উদ্ধৃত করে ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, মিয়ানমারের সাধারণ নির্বাচনকে সামনে রেখে ইচ্ছাকৃতভাবে মুসলিম প্রার্থীদের নিজ দল থেকে সরিয়ে দিয়েছেন দেশটির গণতন্ত্রপন্থী নেত্রী এবং এনএলডি’র প্রধান অং সান সুচি।

সু চি’র বিরুদ্ধে চেঞ্জ ডট ওআরজি-তে এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ স্বাক্ষর আদায়কারী পিটিশনটি করা হয়েছে ইন্দোনেশিয়া থেকে। ২০১৩ সালে বিবিসির মুসলিম উপস্থাপককে নিয়ে সুচির বিতর্কিত মন্তব্যটি আট মাস আগে ফাঁস হওয়ার পর ওই পিটিশনটি করা হয়। মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক সহিংসতার প্রেক্ষাপটে পিটিশনটিতে এখন খুব দ্রুত স্বাক্ষরের সংখ্যা বাড়ছে। এরইমধ্যে ওই পিটিশনে লক্ষাধিক স্বাক্ষর সংগৃহীত হয়েছে। নির্দিষ্ট সংখ্যক অর্থাৎ একটি পিটিশনে অন্তত দেড় লাখ স্বাক্ষর সংগ্রহ হলেই কেবল তা নোবেল কমিটিতে উপস্থাপন করা যাবে।

সুচির বিরুদ্ধে ক্যাম্পেইন

মিয়ানমারের গণতন্ত্রপন্থী নেত্রী হিসেবে বিবেচিত সু চি’র নোবেল পুরস্কার প্রত্যাহার করে নেওয়ার জন্য ক্যাম্পেইন শুরু হয় মূলত ২০১২ সালে মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে জাতিগত সহিংসতা শুরু হওয়ার পর। ২০১‌২ সালের ওই সহিংসতায় শতাধিক মানুষের প্রাণহানির পাশাপাশি হাজার হাজার মানুষকে ঘরহারা হতে হয়েছিল।

মিয়ানমারের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি না পাওয়া রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সম্প্রতি নতুন করে সহিংসতা শুরু হওয়ার পর আবারও সরব হয়ে উঠেছে অনলাইন প্রচারণা। রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর সাম্প্রতিক দমন-পীড়নের ঘটনায় এখন পর্যন্ত অন্তত দেড়শো মানুষের প্রাণহানির ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া গেছে। এমন প্রেক্ষাপটে আট মাস আগে সু চির নোবেল প্রত্যাহার চেয়ে করা আবেদনে স্বাক্ষরের সংখ্যা দ্রুত হারে বাড়ছে। বাংলাদেশ সময় রবিবার দুপুর ২ টা নাগাদ ওই পিটিশনে ১ লাখ ৪০ হাজারেরও বেশি মানুষ স্বাক্ষর করেছেন। নরওয়ের নোবেল কমিটির কাছে পিটিশনটি উপস্থাপন করতে হলে অন্তত দেড় লাখ স্বাক্ষর লাগবে পিটিশনে। অং সান সু চির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ কেবল ওই এক পিটিশনে থেমে থাকেনি। খোলা হচ্ছে নতুন নতুন পিটিশন। চলছে স্বাক্ষর সংগ্রহ। এরমধ্যে বাংলাদেশ থেকে করা পিটিশনও রয়েছে। চেঞ্জ.অর্গের ওয়েবসাইটে গিয়ে দেখা গেছে দুইদিন আগে এম.ডি আসাদুজ্জামান নামে এক ব্যক্তি বাংলাদেশ থেকে একটি পিটিশন শুরু করেছেন। সেখানে এখন পর্যন্ত ১৪০ জনেরও বেশি মানুষ স্বাক্ষর করেছেন। একইসময়ে বাংলাদেশ থেকে রাসেল আহমেদ সোহাগ নামে একজনও চেঞ্জ.অর্গে একটি পিটিশন খুলেছেন। সেখানে রবিবার দুপুর নাগাদ স্বাক্ষরকারীর সংখ্যা ১০। এছাড়া আরও কয়েকটি পিটিশন দেখা গেছে।

ইন্দোনেশিয়া থেকে আট মাস আগে যে পিটিশনটি খোলা হয়েছিল সেখানে বলা হয়, ‘আন্তর্জাতিক শান্তি এবং ভ্রাতৃত্ববোধ রক্ষায় যারা কাজ করেন, তাদেরকেই নোবেল শান্তি পুরস্কারের মতো সর্বোচ্চ পুরস্কার দেয়া হয়। সুচির মতো যারা এই পুরস্কার পান, তারা শেষ দিন পর্যন্ত এই মূল্যবোধ রক্ষা করবেন, এটাই আশা করা হয়। যখন একজন নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী শান্তি রক্ষায় ব্যর্থ হন, তখন শান্তির স্বার্থেই নোবেল শান্তি পুরস্কার কমিটির উচিত এই পুরস্কার হয় জব্দ করা নয়তো ফিরিয়ে নেওয়া।

পিটিশনটি করেন, এমারসন ইয়ুনথো নামের দুর্নীতিবিরোধী এক কর্মী। আবেদনের শুরুতে বিবিসির এক সাংবাদিক মিশাল হোসেন সম্পর্কে সু চি যে মন্তব্য করেছিলেন, সেই ঘটনার উল্লেখ করা হয়। ওই সাক্ষাৎকারের অফলাইন সময় চলাকালে নাকি মুসলমানদের প্রতি বিদ্বেষপূর্ণ মন্তব্য করেছিলেন সু চি। পিটার চলতি বছর পোপহামের ‘দ্য লেডি অ্যান্ড দ্য জেনারেল: অং সান সু চি এবং মিয়ানমারের গণতন্ত্রের লড়াই’ শীর্ষক বইয়ে ওই সাক্ষাৎকারের প্রসঙ্গ এসেছে। সেখানেই বিশ্বাসযোগ্য তথ্যের বরাতে লেখক দাবি করেছেন, সু চি ওই সাক্ষাৎকারে মুসলিম উপস্থাপক থাকা প্রশ্নে আপত্তি জানিয়ে বলেছিলেন, ‘কোনও মুসলমান যে আমার সাক্ষাৎকার নেবে সেটা আগে আমাকে বলা হয়নি’ বলে মন্তব্য করেছিলেন।

ইন্দোনেশিয়া থেকে করা ওই পিটিশনের উদ্যোক্তা এমারসন বলেন, ‘সুচির মুখ থেকে এরকম কথা শুনে অনেকেই হতবাক হয়েছিলেন। এটি এক বাক্য হতে পারে, কিন্তু যারা শান্তিকামী তাদের জন্য এ বাক্যটির অর্থ খুব গভীর।’

যারা বিশ্ব শান্তি বজায় রাখতে অঙ্গীকারবদ্ধ তাদেরকেই শুধু শান্তিতে নোবেল দেওয়া উচিত বলে উল্লেখ করা হয় আবেদনে।

নোবেল কমিটি কি পুরস্কার প্রত্যাহার করতে পারে?
নোবেল পুরস্কারের ইতিহাসে আজ পর্যন্ত কারও পুরস্কার প্রত্যাহার করতে দেখা যায়নি। তবে মাঝে মাঝে পুরস্কারজয়ীদেরকে দেখা গেছে পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করতে। যারা প্রত্যাখ্যান করেন তাদের নামও পুরস্কারের তালিকাতেই রেখে দেয় নোবেল কমিটি। কেননা পুরস্কার ফিরিয়ে দেওয়া কিংবা ফিরিয়ে নেওয়ার নিয়ম নেই নোবেল ফাউন্ডেশনের। বলা চলে ফাউন্ডেশনের নীতিমালা অনুযায়ী তা নিষিদ্ধ। নোবেল ফাউন্ডেশনের নীতিমালায় বলা আছে, ‘পুরস্কার প্রদানকারী কর্তৃপক্ষ যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তার বিরুদ্ধে কোনও আবেদন জানানো যাবে না।’

পুরস্কার প্রত্যাহারের সুযোগ রাখার জন্য বিভিন্ন পিটিশন হলেও সে ব্যাপারে নোবেল ফাউন্ডেশনকে নির্বিকারই দেখা গেছে। অবশ্য নোবেল ফাউন্ডেশন এটা স্বীকার করেছে যে তাদের প্রদান করা কোনও কোনও পুরস্কার নিয়ে সমালোচনা হয়েছে। এ ব্যাপারে তাদের সিদ্ধান্ত সংক্রান্ত যে রেকর্ড রয়েছে তা প্রকাশ করতেও সম্মত হয়েছেন তারা। কিন্তু সেগুলো ৫০ বছরের আগে প্রকাশ করা হবে না। অর্থঅৎ একটি পুরস্কার ঘোষণার পর সে পুরস্কার নিয়ে সিদ্ধান্তজনিত রেকর্ড প্রকাশ হবে ৫০ বছর পর। এ ব্যাপারে নোবেল কমিটির যুক্তি হলো, নির্দিষ্ট সময় পরিক্রমা বা কালপর্বের সামাজিক ইস্যুর কথা মাথায় রেখে তারা বিজয়ী নির্বাচিত করেন না। এক একটি পুরস্কারের পরিপ্রেক্ষিত বোঝার জন্য কিছু সময় লাগবে। সূত্র: চেঞ্জ.ওআরজি, ডেইলি সান, ওয়াইজ গিক, নোবেলপ্রাইজ.অর্গ