মেইন ম্যেনু

দুদকের কাঠগড়ায় কর্মকতা: ১৪ লাখ টাকার ক্যামেরা ৫১ লাখ, ৮০ হাজার টাকার এলইডি টিভি ২ লাখ টাকা

dudok20151129064826

চৌদ্দ লাখ টাকার ক্যামেরা কেনেন ৫১ লাখ টাকায়। ৮০ হাজার টাকার এলইডি টিভি ক্রয় দেখানো হয় ২ লাখ টাকা। টিটিটিসির কাজে ব্যয় দেখানো হয় ৮০ লাখ টাকা। নিম্নমানের দুটি প্রাইভেটকার ও দুটি মাইক্রোবাসও কেনা হয় প্রকল্পের জন্য। যার প্রতিটি গাড়ি থেকে তিনি নিয়েছেন ৫ লাখ টাকা করে। আর ফার্নিচার ও অন্য স্টেশনারি দ্রব্যাদি কেনেন কয়েক কোটি টাকার। যার অধিকাংশই অপ্রয়োজনীয়, যা পড়ে আছে স্টোর রুমে। টিচার্স ট্রেনিংয়ের নামে অতিরিক্ত ও বিভিন্ন খরচ দেখিয়ে ভুয়া ভাউচারে লাখ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগও তার বিরুদ্ধে। শুধু তাই নয়, নিয়োগ বাণিজ্য আর ২৭ স্বজনকে চাকরি দিয়ে ব্যাপক আলোচনায় তিনি। এসব অনিয়ম আর দুর্নীতির অভিযোগে দুদকের কাঠগড়ায় বাবর আলী। তিনি কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের সাবেক পরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন)।

বর্তমানে তিনি কুমিল্লা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের অধ্যক্ষ। তার অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয় তদন্তে মাঠে নেমেছে দুদক। ইতিমধ্যে দুদকের সহকারী পরিচালক মো. আবদুল ওয়াদুদকে অনুসন্ধানী কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়েছে।

২০১২ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত তিন বছরে তিনি দুর্নীতি ও অনিয়ম করে বিশাল বিত্ত-বৈভবের মালিক হয়েছেন। বাবর আলী কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরে ৪৬০ কোটি টাকার স্কিলস ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্টের প্রকল্প পরিচালক ছিলেন। গত বছর দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান বরাবর এক অভিযোগে বাবর আলীর দুর্নীতির ফিরিস্তি তুলে ধরা হয়।

ওই অভিযোগে বলা হয়, মাত্র তিন বছরে কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী নিয়োগ করা হয়। নিয়ম অনুযায়ী নিয়োগ কমিটির আহ্বায়ক হওয়ার কথা পরিচালক (প্রশাসন)-এর। কিন্তু রহস্যজনক কারণে পরিচালক প্রশাসনের পরিবর্তে পরিচালক পরিকল্পনা ও উন্নয়ন বাবর আলীকে করা হয় নিয়োগ কমিটির আহ্বায়ক। তিন বছরে অধিদপ্তরে রাজস্ব খাতে কমপক্ষে সাড়ে তিনশ’ কর্মচারী নিয়োগ দেয়া হয়। এ নিয়োগ দিতে শুরু হয় বাণিজ্য। যার মধ্যমণি এই বাবর আলী। কর্মচারী নিয়োগের ক্ষেত্রে পোষ্য, জেলা, প্রতিরক্ষা, মহিলা এমনকি মুক্তিযোদ্ধা কোটাও লঙ্ঘন করেছেন তিনি। সে সময় তার ২৭ জন আত্মীয়-স্বজনকে চাকরি দেন।

এছাড়া ১২৫ জনকে চাকরি দিয়েছেন লাভবান হয়ে। স্বজনদের মধ্যে তার ভাই, ভাগনি, ভাগনি জামাই, মামা, খালাত ভাই, মামাত বোনের স্বামী, মামীও রয়েছেন। এরা হলেন- বাবর আলীর ভাগনি জামাই কেয়ারটেকার মো. তারেকুজ্জামান, ভাগনি রেজিস্ট্রার ইসরাত জাহান, ভাই স্টোরকিপার মো. মাসুদুর রহমান, ভাগিনা ক্যাশ সরকার মো. আজমল শেখ, খালাত ভাই ক্লিনার মো. মায়নুল ইসলাম, মামাত বোনের স্বামী প্রধান সহকারী মো. আবদুল্লাহ, মামাত বোন ডাটা প্রসেসর সোনালী আখতার, মামা মো. নাসির উদ্দিন ক্লিনার, প্রতিবেশী ভাগিনা ক্লিনার মো. রেজাউল করিম, প্রতিবেশী ভাই মো. হাবিব এলাহী ক্রাফট ইনস্ট্রাক্টর, আরেক প্রতিবেশী মিজানুর রহমান সিকিউরিটি গার্ড, মামা তরিকুল ইসলাম সিকিউরিটি গার্ড, মামী সমিনা খাতুন কুক সর্টার, প্রতিবেশী সুলতানা পারভীন রেজিস্ট্রার, ভাগনি জেসমিন আক্তার ল্যাব সহকারী, প্রতিবেশী শায়লা শারমীন ল্যাব সহকারী, প্রতিবেশী ভাগিনা আবু বাক্কার ক্লিনার, ভাইয়ের শালিকা মোসলেমা খাতুন ডাটা প্রসেসর, মামাত ভাই এমদাদ হোসেন ইনস্ট্রাক্টর আর.ই.সি, খালাত ভাই কামাল হোসেন প্রধান সহকারী, মামাত বোন সাবরিনা খাতুন কোষাধ্যক্ষ, মামাত বোনের স্বামী আল মাসুম ল্যাব সহকারী, প্রতিবেশী এসবাবুল হক স্টোর কিপার, প্রতিবেশী বাবুল হোসেন ক্লিনার, ভাগিনা আবু তাহের ইলেকট্রিশিয়ান। বাবর আলী কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের ২০টি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের আধুনিকীকরণ ও ১৮টি নতুন পলিটেকনিক স্থাপন প্রকল্পের সহকারী পরিচালক হিসাবে ক্রয় কমিটির সদস্য সচিবের দায়িত্ব পালন করেন। সে সময় তিনি টেন্ডার সিডিউল তৈরি করে নিম্নমানের মালামাল ক্রয় করেন। এছাড়া ৩৮টি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে প্রায় ২০০০ কম্পিউটার ক্রয় করা হয়। এসব কম্পিউটারে স্পেসিফিকেশনে ব্র্যান্ড কম্পিউটার উল্লেখ থাকলেও কোলন কম্পিউটার নেয়া হয়। এসব করা সিঙ্গেল টেন্ডারে। এ অভিযোগ তদন্তে শিক্ষা সচিব বরাবর রেকর্ডপত্র চেয়ে চিঠি পাঠান তদন্ত কর্মকর্তা। এতে বলা হয়, ঠিকাদারের সঙ্গে যোগসাজশে পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে নিম্নমানের ইলেকট্রনিক সামগ্রী ক্রয় করে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ, নিয়োগ বাণিজ্য, অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ সুষ্ঠু অনুসন্ধানের স্বার্থে রেকর্ডপত্র পর্যালোচনা করা অপরিহার্য। আর তাই তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী নিয়োগ সংক্রান্ত আদেশ, নিয়োগ কমিটির তালিকা, নিয়োগবিধি, নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ও এর পত্রিকা কার্টিং, আবেদনকারীদের তালিকা, আবেদন রেজিস্ট্রার, পরীক্ষা কমিটির তালিকা, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার ফলাফলের রেজিস্ট্রার ও টেবুলেশন শিট, নিয়োগপ্রাপ্তদের তালিকা ও নিয়োগপ্রাপ্তদের লিখিত পরীক্ষার খাতাসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সরবরাহের অনুরোধ জানানো হয়।

গত ৫ই অক্টোবর কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বরাবরও অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা দুদকের সহকারী পরিচালক মো. আবদুল ওয়াদুদ একটি পত্র দেন। এতে অনুসন্ধানের স্বার্থে রেকর্ডপত্র ও তথ্যাদি সরবরাহের অনুরোধ জানানো হয়। একই সঙ্গে গত ৯ই অক্টোবর বাবর আলীকে তলব করা হয় দুদক কার্যালয়ে। বাবর আলী ওইদিন তদন্ত কর্মকর্তার মুখোমুখি হন।