মেইন ম্যেনু

নাফ নদীতে রোহিঙ্গাদের ওপর বিজিপির গুলি

105145naf-river-check-post-001

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেদেশের সেনাবাহিনী ও পুলিশের নির্যাতনের মুখে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে নাফ নদী হয়ে পালাতে গিয়েও রেহাই পাচ্ছেন না নির্যাতিত মুসলিম

রোহিঙ্গারা। দেশ ছেড়ে পালাতে গিয়ে রোহিঙ্গা বোঝাই একটি নৌকা বুধবার রাতে সে দেশের বর্ডার গার্ড পুলিশ- বিজিপির টার্গেটে পড়ে। ৪২ জন রোহিঙ্গা বহনকারী নৌকায় গুলি চালায় বিজিপি। এতে নারী ও শিশুসহ বেশ কয়েকজন গুলিবিদ্ধ হন। তবে কতজন মারা গেছে সে খবর জানা যায়নি। আহত একজনকে মুমূর্ষু অবস্থায় নাফ নদীর পানিতে ভাসতে দেখে বাংলাদেশের জেলেরা উদ্ধার করে টেকনাফের লেদা অনিবন্ধিত রোহিঙ্গা ক্যাম্পে নিয়ে আসে। বুধবার রাতে নৌকাযোগে দুই ছেলেকে নিয়ে পালানোর সময় আহত হয়ে কোনো মতে বেঁচে আসা ওই রোহিঙ্গার নাম ইমান হোসেন। জেলেরা তাকে উদ্ধার করলেও তার দুই ছেলের ভাগ্যে কি ঘটেছে জানেন না ইমান।

এদিকে নতুন করে রাখাইন রাজ্যের বুচিডং থানার বিভিন্ন বাড়িঘরে হামলা শুরু করেছে সে দেশের সেনা বাহিনী। সেখানে কয়েকটি গ্রামে একযোগে হামলার পর সামনে যাকে পাওয়া যাচ্ছে, তাকেই ধরে নিয়ে যাচ্ছে সেনারা। এর আগে মংডু থানার অন্তত ১৫টি গ্রাম আক্রান্ত হয়। সেসব গ্রাম এখন বিরানভূমি। গ্রামের নারী, পুরুষ, শিশু কেউই অত্যাচার থেকে রেহাই পায়নি। পুরুষদের ধরে নিয়ে হত্যা, নারীদের ধর্ষণ, শিশুদের আগুনে নিক্ষেপ করে হত্যার মতো নিষ্ঠুর ঘটনাও ঘটছে সেখানে। এমনকি সে দেশের সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের ওপর হেলিকপ্টার গানশিপও ব্যবহার করেছে। হামলায় সেনাবাহিনীর সঙ্গে স্থানীয় মগ যুবক, বিজিপি এবং পুলিশও অংশ নেয় বলে লেদা ক্যাম্পে আসা নির্যাতিত রোহিঙ্গারা জানিয়েছেন। হামলার পর বেঁচে যাওয়া রোহিঙ্গারা দলে দলে নাফ নদী পাড়ি দিয়ে নৌকাযোগে বাংলাদেশে এসে উঠছে। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ-বিজিবির কড়া নজরদারির মধ্যেও গত দু’দিনে অন্তত আড়াই হাজার রোহিঙ্গা প্রবেশ করেছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।

মিয়ানমারে গত কয়েক সপ্তাহে সেনাবাহিনী ও পুলিশের নির্যাতনের মুখে পড়ে কত রোহিঙ্গা দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছে তার সঠিক পরিসংখ্যান না থাকলেও জাতিসংঘের উদ্বাস্তু সংস্থা বলছে, অন্তত ১০ হাজার সংখ্যালঘু মুসলমান বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে। এছাড়া মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী পশ্চিমাঞ্চলীয় রাখাইন প্রদেশে রোহিঙ্গা মুসলিমদের বিরুদ্ধে যে রক্তাক্ত দমন অভিযান চালাচ্ছে, তাতে অন্তত ৩০ হাজার মানুষ তাদের বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কতজন নারী, পুরুষ ও শিশুকে নানাভাবে হত্যা করা হয়েছে, কতজনকে গুম করা হয়েছে তার সঠিক তথ্য কেউই বলতে পারছে না। তবে এই সংখ্যা যে কয়েক হাজার হবে তা নিয়ে কারও সংশয় নেই। টেকনাফ ও উখিয়ার ক্যাম্পে যারা আশ্রয় নিয়েছেন, তাদের সঙ্গে কথা হলে, প্রায় সবাই জানিয়েছেন, কেউ হারিয়েছেন স্বামী, কেউ বাবা, কেউ ভাই কিংবা কেউ তার সন্তানকে হারিয়ে রাতের আঁধারে কোনো মতে পালিয়ে এসেছেন। এদিকে মিয়ানমারের মংডু থানাধীন কাউয়ার বিল গ্রামের শত শত নারী, পুরুষ ও শিশু বুধবার রাতের আঁধারে সে দেশের সীমান্ত পাড়ি দিয়ে নৌকাযোগে বাংলাদেশে আসতে থাকে। প্রতি রাতেই তারা নাফ নদী পাড়ি দিয়ে আসছে। কিন্তু ৯ নভেম্বরের পর ২০-২১ দিনে কেউ আসার পথে সে দেশের সীমান্তে আক্রান্ত হয়েছে বলে খবর পাওয়া না গেলেও বুধবারের ঘটনা নির্যাতনের একেবারে নতুন মাত্রা। আহত ইমান হোসেনকে নাফ নদীর জালিয়ার দ্বীপে পানিতে ভাসতে দেখে তীরে নিয়ে আসেন বাংলাদেশের জেলে আবদুস সালাম। রাত ১০টার দিকে তিনি ইমান হোসেনকে উদ্ধার করেন।

জানা গেছে, বিজিপি তাদের সীমান্তের কাছে নাফ নদী সংলগ্ন জাঙ্গালা খাল এলাকায় রোহিঙ্গা ভর্তি নৌকা আটকে যাত্রীদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালায়। রাত ৮টার দিকে গুলি করার পর বিজিপি তাদের স্পিডবোর্ডের সঙ্গে বেঁধে নৌকাটি নদীতে টেনে নিয়ে যায়। এ সময় নৌকায় পানি উঠে গেলে আহতরা চিৎকার করতে থাকেন। যাদের এভাবে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, তাদের প্রাণে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে কিনা কেউ বলতে পারছেন না। বাংলাদেশের কোস্টগার্ডের এক কর্মকর্তা জানান, তাদের টহল টিম এপার থেকেই একযোগে অনেকের কান্নার আওয়াজ শুনেছে। কিন্তু কাউকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। কোস্টগার্ডের টেকনাফ স্টেশন কমান্ডার লে. আতাউর রহমান বলেন, আমাদের টহল টিম যাদের কান্নার শব্দ শুনতে পেয়েছে, তাদের বেশির ভাগ ছিল নারী ও শিশু। তবে বাংলাদেশের সীমানায় তল্লাশি করে ওই নৌকার আরোহীদের কাউকে পাওয়া যায়নি।

মৃত্যুর কাছ থেকে ফিরে আসা ইমান : ৪৮ বছর বয়সী রাখাইন রাজ্যের পেরামপুরো গ্রামের কৃষক ইমান হোসেনের বাবার নাম পিতা মৃত কালু মিয়া। ১২ অক্টোবর তাদের এলাকায় সেনাবাহিনী হামলা শুরু করে। তাদের ঘরটি পুড়িয়ে দেয়। স্ত্রী ও ছোট সন্তান পাশের এক আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নেন। আর তিনি বড় দুই ছেলের জীবন রক্ষার জন্য বাড়ি থেকে পালিয়ে আসেন। কিন্তু নিয়তির কি পরিহাস, যে ছেলেদের জীবন বাঁচাতে তিনি বাড়ি ছাড়েন, তাদের দু’জনকে মৃত্যুর মুখে রেখে আসতে হয়েছে বাবাকে।

ইমান হোসেন বলেন, বুধবার রাত ৯টার দিকে রাখাইন রাজ্যের মংডুর পেরামপুরো চরে এক থেকে দেড় হাজার রোহিঙ্গা ছিল এপারে আসার অপেক্ষায়। সেখান থেকে ৬টা নৌকা রওনাও হয়। তারা যে নৌকায় ওঠেন সেখানে ছিল ৪২ জন রোহিঙ্গা। তাদের সঙ্গে তার দুই ছেলে সলিমুল্লাহ (১৮) ও সালামত খানও (১৪) ছিল। নৌকার আরও যারা ছিলেন তাদের মধ্যে ১০ জন নারী, ৮-১০ জন শিশু ও ২০ জন পুরুষ ছিল। সব মিলিয়ে ৪২ ছিলেন। নৌকাটি রওনা হয়ে মাত্র নাফ নদীর কাছে আসে। এ সময় গুলির শব্দ শুনি। হঠাৎ করে দেখি মিয়ানমারের বিজিপির স্পিডবোর্ড চলে আসে। এসেই গুলি শুরু করে। এ সময় নৌকার মধ্যে পানি ঢুকে যায়। সবাই নৌকার পাটাতনের নিচে আশ্রয় নেয়। কিন্তু বিজিপি খুঁজে খুঁজে বের করে তাদের ওপর গুলি করতে থাকে। এক সময় নৌকাটি স্পিডবোর্ডের সঙ্গে বেঁধে টানতে শুরু করে বিজিপি।

ইমান জানান, নৌকার মাঝি লাফ দিয়ে নদীতে পড়ে যায়। তিনিও জীবন রক্ষার জন্য দুই সন্তান ফেলে নদীতে ঝাঁপ দেন। এখন তিনি জানেন না তার দুই ছেলেসহ অন্যদের জীবনে কি ঘটেছে। তিনি বলেন, আমি দেড় ঘণ্টার মতো সাঁতরে নাফ নদীর মাঝখানে চলে আসি। বাঁচাও বাঁচাও চিৎকার শুনে জেলেরা আমাকে উদ্ধার করে। পরে জেলে আবদুস সালামের বাড়িতে আমাকে আশ্রয় দেয়। একটা লুঙ্গি দেয়। রাতের খাবার দেয়।

নতুন করে বুচিডং থানায় নিপীড়ন শুরু : মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের মংডু থানা এলাকায় রোহিঙ্গা মুসলমানদের নিশ্চিহ্ন ও তাদের বাড়িঘর ধ্বংস করার পর সে দেশের সেনা ও পুলিশ বাহিনী এবার ওই রাজ্যের আরেকটি এলাকায় নির্যাতন শুরু করেছে বলে খবর পাওয়া গেছে। নতুন করে নির্যাতন ও রোহিঙ্গাদের উচ্ছেদের জন্য এবার বেছে নেয়া হয়েছে বুচিডং থানা এলাকার মুসলিম জনবসতির গ্রামগুলো। হামলা চালিয়ে রাতের বেলা যুবকদের ধরে নিয়ে যাচ্ছে। কাউকে কাউকে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে গুলি করা হচ্ছে। এই তালিকার বেশির ভাগই যুবক। খেয়ারিপ্রাং গ্রামের বাসিন্দা ৩১ বছর বয়সী ফজল আহমেদ সেদেশের একজন পল্লী চিকিৎসক। তিনি সেনাদের রকেটল্যান্সার হামলায় আহত হয়ে পরিবারের ১০ জন নিয়ে বুধবার টেকনাফের লেদার ক্যাম্পে উঠেছেন। তিনি সে দেশের সর্বশেষ অবস্থা বর্ণনা করতে গিয়ে জানান, সেনারা মংডু থানার মুসলিম রোহিঙ্গাদের নিঃশেষ করে এখন বুচিডং থানার বসতবাড়িতে হামলা চালাচ্ছে।

দুই দালালকে মিয়ানমার বিজিপি আটকে রেখেছে : নাফ নদী দিয়ে নৌকাযোগে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আনায় জড়িত বাংলাদেশী দুই দালাল কবির হোসেন ও সাদেককে আটক করেছে মিয়ানমার বর্ডার গার্ড পুলিশ-বিজিপি। এরা দু’জন টেকনাফের বাসিন্দা। এর আগের দিন মঙ্গলবার রাতে আরও দু’জনকে একইভাবে আটকে রাখে বিজিপি। পরে তাদের স্বজনরা বিজিপিকে ৪০ হাজার টাকা মুক্তিপণ দিয়ে তাদের ছাড়িয়ে আনে।

এদিকে নাফ নদীতে বৃহস্পতিার সকাল ১০টার দিকে টেকনাফের নীলা ইউনিয়নের জাজিমোড়া এলাকা বরাবর নাফ নদীর ওপরে মিয়ানমারের তিনটি হেলিকপ্টার অনেকক্ষণ চক্কর দেয়। এ সময় নদীতে মাছ শিকারে যাওয়া জেলেরা আতংকিত হয়ে পড়ে। জেলেরা জানায়, হেলিকপ্টার তিনটি বাংলাদেশের সীমানার কাছাকাছি চলে আসে। তবে বিজিবি বলছে, তারা মিয়ানমার সীমানার মধ্যেই নাফ নদীতে টহল দিচ্ছিল। অন্যদিকে, বুধবার রাতে রোহিঙ্গা বোঝাই ৯টি নৌকা টেকনাফের চারটি পয়েন্ট দিয়ে ফেরত পাঠায়।

এদিকে বিজিবি-২ এর উপ-অধিনায়ক আবু রাসেল সিদ্দিকী বুধবার গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, গত এক মাসে রোহিঙ্গা বোঝাই ২০০টি নৌকায় আসা আনুমানিক ২০০০ রোহিঙ্গাকে প্রতিহত করেছে বিজিবি। একই সঙ্গে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশে সহায়তা করায় ১৩ দালালকে আটক করা হয়।

মিয়ানমারের সঙ্গে ফুটবল ম্যাচ বাতিল মালয়েশিয়ার : রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের নিষ্ঠুর দমনপীড়নের বিরুদ্ধে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ মালয়েশিয়া এবার সরব হয়ে উঠেছে। নিরীহ মুসলমানদের হত্যা নির্যাতনের প্রতিবাদে মিয়ানমারের সঙ্গে অনূর্ধ্ব-২২ ফুটবলের দুটি প্রীতি ম্যাচ বাতিল করেছে মালয়েশিয়া। মালয়েশিয়ার জাতীয় ফুটবল দলের মুখপাত্র বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে এই তথ্য জানিয়েছেন। নাম প্রকাশ না করে মালয়েশিয়ার জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক এক খেলোয়াড় বলেন, চলতি মাসে মিয়ানমারের সঙ্গে দুটি প্রীতি ফুটবল ম্যাচ হওয়ার কথা ছিল। রোহিঙ্গা ইস্যুকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে তা বাতিল করা হয়েছে। মিয়ানমারের ইয়াঙ্গুনে ৯ ও ১২ ডিসেম্বর ম্যাচ দুটি হওয়ার কথা ছিল।

রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর জাতিগত নির্মূল করার যে তৎপরতা শুরু করেছে মিয়ানমার, তার বিরুদ্ধে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জোট আসিয়ানে মিয়ানমারের সদস্য পদ রাখার বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা উচিত বলে বুধবার অভিমত প্রকাশ করেন মালয়েশিয়ার ক্রীড়ামন্ত্রী খাইরি জামালউদ্দিন।