মেইন ম্যেনু

নেতার নেতৃত্বশূন্যের দ্বিতীয় মিশন

kabir-chowdhury-tanmoy

কবীর চৌধুরী তন্ময় : জেলখানা কিংবা কারাবাস শব্দটার সাথে এক অজানা ভয়-উৎকন্ঠা আর পরাধীনতার প্রতিচ্ছবি ভেসে আসে। আর সেই পরাধীনতার শিখল কেউ সেচ্ছায় পড়তে চায় বলে আমার জানা নেই বা কেউ কখনও চেয়েছে বলেও খুজে পাওয়া কঠিন। তবে এই অনুভূতি কেমন বা কারাবাসের জীবন সম্পর্কে জানতে ইতোমধ্যেই ঢাকার পুরনো কেন্দ্রীয় কারাগারে ‘ফিল দ্য প্রিজন’ করার কথা জানিয়েছেন উক্ত কারাগারের মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ ইফতেখার উদ্দীন।

জেলখানায় থাকার অভিজ্ঞতা কেমন হয় তা জানতে ইচ্ছুক পর্যটক, নাগরিকদের কিছুদিন কারাবাসের ব্যবস্থা করা হবে। তবে এই অনুভূতি-অভিজ্ঞতা নিতে হবে অর্থের বিনিময়ে। আর ‘ফিল দ্য প্রিজন’ই যে বিশ্বে প্রথম তা নয়। জানা যায়, ভারতের তেলেঙ্গানা রাজ্যের হায়দ্রাবাদের নিজামদের তৈরি মোডাক শহরের ২২০ বছরের পুরানো কারাগারটিও স্থানান্ত করে এখন জাদুঘর করার কাজ চলছে। তারাও ‘ফিল দ্য জেল’ প্রজেক্টের মাধ্যমে পর্যটক ও নাগরিকদের ভারতীয় পাঁচশত রূপির বিনিময়ে ২৪ ঘন্টা বা একদিনের জন্য কারাবাস বা জেলের অনুভূতি-অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ দেওয়ার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।

পৃথিবীর সবচেয়ে কুখ্যাত কারাগার হিসেবে যে কারাগারের নাম সবার আগে চলে আসে তা হলো গুয়ান্তানামো বে কারাগার। সামরিক ঘাঁটি থেকে ৯/১১-এর পর ২০০২ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই কারাগার তৈরি করে এবং তাঁদের শত্রু যোদ্ধাদের আটক রেখে ভয়াবহ নির্যাতনের ছবি ও ঘটনা প্রকাশ হয়েছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে। আবার ২০১৪ সালে বন্ধ হয়ে যাওয়া ইরাকের আবু গারাইব কারাগারে রচিত হওয়া কুখ্যাতিও বিশ্ব সম্প্রদায় অবগত আছেন। প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় এই কারাগারের অত্যাচার-নির্যাতনের সংবাদ-ছবি ছড়িয়ে পড়ে।

kabir

ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারও গুয়ান্তানামো বে আর আবু গারাইব কারাগারের মতোই গৃণার প্রতীক হয়ে থাকবে। কারণ এই কারাগারেই জাতীয় চার নেতাকে পরিকল্পিতভাবে ভবিষ্যত নেতা-নেতৃত্বশূন্য করার ষড়যন্ত্রে দ্বিতীয় মিশনে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।

৭৫-এ ১৫ আগস্ট স্বাধীন বাংলাদেশের মহান স্থপতি জাতির জনক ও তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার মাধ্যমে স্বাধীনতাবিরোধী ও তাঁদের দোসরচক্র প্রথম মিশন পরিচালিত করে। তাঁরা দেখেছে, ৭১-এর ২৫ মার্চের ঘুমন্ত রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী হত্যা-ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে ধানমন্ডির বাসভবন থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেফতার করার পরও জাতির সেই ক্রান্তিলগ্নে হাল ধরতে এগিয়ে আসেন বঙ্গবন্ধুর আদর্শে বিশ্বাসী এবং সহযোগী সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন এম. মনসুর আলী এবং এএইচএম কামরুজ্জামান ।

বিশ্ব মহামানব, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানকে রাষ্ট্রপতি এবং তাঁর অবর্তমানে অন্যতম সহচর সৈয়দ নজরুল ইসলামকে অস্থায়ীরাষ্ট্রপতি, তাজউদ্দীন আহমদকে প্রধানমন্ত্রী, ক্যাপ্টেন এম. মনসুর আলীকে অর্থমন্ত্রী এবং এইচএম কামরুজ্জামানকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী করে ১৭ এপ্রিল কুষ্টিয়ার মেহেরপুর মহকুমার বৈদ্যনাথতলার আমবাগানে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের প্রথম সরকার গঠন করা হয়।

বঙ্গবন্ধুর বিশ্বস্ত এই চার নেতা শক্ত হাতে তখন লাগাম না ধরলে হয়তো আমাদের সেদিনের স্বাধীনতার স্বপ্ন, স্বপ্নই থেকে যেত। বর্বর পাকিস্তানি বাহিনীর নির্মম গণহত্যা, অত্যাচার, নির্যাতন, ধর্ষণ, অগ্নীসংযোগ, লুটপাট ও নিপীড়নের চিত্র বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরে বিশ্বজনমতের সমর্থন, প্রতিবেশি ভারতে প্রাণ ভয়ে পালিয়ে যাওয়া লক্ষ-লক্ষ শরণার্থীর আশ্রয় সুনিশ্চিত করা, মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয়-প্রশ্রয় ও প্রশিক্ষনের ব্যবস্থা করা এবং শেষ পর্যন্ত ভারতীয় মিত্রবাহিনীর সহায়তায় দেশ স্বাধীন করার মতো এক ঐতিহাসিক কাজ এই চার নেতা সম্পাদন করেন অত্যন্ত দক্ষতার সহিত ও সফলভাবে।

বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর বঙ্গবন্ধুর আরেক অন্যতম ঘনিষ্ট সহচর খন্দকার মুশতাক আহমেদ জাতীয় এই চার নেতাকে তাঁদের দলে আসার জোড় প্রস্তাব দিলে তখন মুজিব নগর সরকারের সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন এম. মনসুর আলী এবং এইচএম কামরুজ্জামান অত্যন্ত ঘৃণাভরে তা প্রত্যাখান করায় পরিকল্পিতভাবে তাঁদের গ্রেফতার করে কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে পাঠানো হয়।

পরবর্তী অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ক্যু-পাল্টা ক্যুর রক্তাক্ত অধ্যায়ে মানবতার শত্রু ও বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারী ওই একই পরাজিত শক্তির দোসর অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে কারাগারে ঢুকে জাতীয় এই চার নেতাকে নির্মমভাবে হত্যা করে।

স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের শত্রুরা সেদিন দেশমাতৃকার সেরা সন্তান এই জাতীয় চার নেতাকে শুধু গুলি চালিয়েই ক্ষান্ত হয়নি, কাপুরুষের মতো গুলিবিদ্ধ দেহকে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে ক্ষতবিক্ষত করে একাত্তরে পরাজয়ের জ্বালা মিটিয়েছিল। বাঙালিকে প্রগতি-সমৃদ্ধির অগ্রমিছিল থেকে পিছিয়ে দিয়েছিল। ইতিহাসের এই নিষ্ঠুর হত্যাযজ্ঞের ঘটনায় শুধু বাংলাদেশের মানুষই নয়, স্তম্ভিত হয়েছিল বিশ্ব সম্প্রদায়।

জাতীয় চার নেতার হত্যাকান্ডটি ছিল প্রথম ষড়যন্ত্রের দ্বিতীয় ধারাবাহিকতা। স্বাধীনতাবিরোধী ও বিশ্বাসঘাতক খুনীদের পরিকল্পনা, তাঁদের নোংরা উদ্দেশ্য আজ জাতির সামনে পরিষ্কার। মিথ্যা কুয়াশার ধূ¤্রজাল ছিন্ন করে আজ নতুন সূর্যের আলোকের মতো প্রকাশিত হয়েছে আজ সত্য।

আসলে হত্যাকারী ও তাঁদের দোসররা বুঝতে পেরেছিল, ৭১-এর মতই তাঁরাও বঙ্গবন্ধুর অনপুস্থিতে একদিন মুজিব নগর সরকারের মতো আবারও বাঙালি ও বাংলাদেশকে ঐক্যবদ্ধ করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় অসাম্প্রদায়িক মূল্যবোধে এগিয়ে নিতে সক্ষম হবে। আর তাই পাকিস্তান ভাঙ্গার প্রতিশোধ নিতে রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ ও সীমাহীন ত্যাগের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীন-সার্বভৌন বাংলাদেশকে হত্যা করতে চেয়েছিল। ষড়যন্ত্রের চাদরে আবর্তে নিক্ষেপ করেছিল। তাদের উদ্দেশ্য ছিল পুনর্গঠন ও গণতান্ত্রিকতার পথ থেকে সদ্য স্বাধীন দেশটিকে বিচ্যুত করা এবং বাংলাদেশের নামের মধ্যে থেকেই একটি মিনি পাকিস্তান সৃষ্টি করা।

স্বাধীনতাবিরোধী ও তাঁদের দোসর মহল হত্যাকান্ড সংঘটিত করেই বসে থাকেনি। ৭৫-এর পর থেকে বছরের পর বছর বঙ্গবন্ধু-চার নেতার নাম-নিশানা মুছে ফেলার চেষ্টা করেছে। বঙ্গবন্ধু ও জেল হত্যাকান্ডের নেপথ্যের কুশীলবদের বিভিন্ন ভাবে পদোন্নতি, জাতীয়ভাবে পুরস্কিতসহ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অধিকারী করা হয়েছে। আর এই বর্বরতম হত্যাকান্ড জেনারেল জিয়াউর রহমানের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ জড়িত থাকার প্রমাণ আত্মস্বীকৃত খুনী-ঘাতকদের মুখ থেকেই বেরিয়ে এসেছে।

শাস্তিকে সরাসরি দৈহিক শাস্তি থেকে আলাদা করার নিমিত্তে বা শাস্তির কৌশল পরবির্তন করার লক্ষ্য নিয়ে আধুনিক কারাগার বা জেলখানা তৈরি করলেও অত্যাচার-নির্যাতন, হত্যা-ধর্ষণ আগেরকার মতন প্রকাশ্যে না হয়ে বর্তমানে কখনও রাতের অন্ধকারে আবার কখনও গোপনে নিরবে-নিভৃতে সেই শাস্তি আরও বর্বর, আরও কঠিনতম আকারে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। আর জাতীয় চার নেতাকে হত্যার মাধ্যমে তা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার মাধ্যমে ভবিষ্যত নেতার সূর্য্যকে অস্তমিত করেছিল। শেখ মুজিবুর রহমানের ভবিষ্যত নেতৃত্বকে হত্যা করার উদ্দেশ্যে পরিকল্পিতভাবে জাতীয় চার নেতাকে ৩রা নভেম্বর জেল হত্যার মধ্য দিয়ে দ্বিতীয় মিশন পরিচালনা করে স্বাধীনতাবিরোধী ও তাঁদের দোসর। কিন্তু তাঁরা ভুলে গিয়েছিল- ‘সত্যের জয়, পরে হলেও হয়; খানিকটা এদিক-সেদিক। মিথ্যের ক্ষয়, সব-সময়ই রয়; যখন ফুটে ওঠে নিজের দিক’। দীর্ঘ ২১ বছর নয়, শত-সহস্র বছর-যুগ পরেও সত্য তার নিজেস্ব নিয়মে জানান দিয়ে যায়।

লেখক : সভাপতি, বাংলাদেশ অনলাইন অ্যাক্টিভিষ্ট ফোরাম-বোয়াফ