মেইন ম্যেনু

‘পশ্চিমবঙ্গের মেয়েরাই মানবপাচারের শিকার হচ্ছে বেশি’

231113pachar-kalerkantho-pic

ভারতে প্রতিবছর যতজন মানব পাচারের শিকার হন, তাদের একটা বড় অংশই পশ্চিমবঙ্গের নারী অথবা নাবালিকা।

পুলিশের দেওয়া এক হিসাবে কলকাতার লাগোয়া দক্ষিণ ২৪ পরগণা জেলা থেকেই গত তিনবছরে হারিয়ে গেছে প্রায় ১২ হাজার জন।

মনে করা হয় এদের সিংহভাগকেই পাচার করে দেওয়া হয়েছে – কাউকে দেহব্যবসায় নামানো হয়েছে, কাউকে ভিক্ষাবৃত্তিতে।

দক্ষিণ ২৪ পরগণা থেকে এই ব্যপক সংখ্যায় নারীপাচার রুখতে স্কুলছাত্রী এবং তাদের মায়েদের সচেতন করার উদ্যোগ নিয়েছে সেখানকার পুলিশ।

নারী পুলিশ কর্মী এবং স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো স্কুলে গিয়ে বোঝাচ্ছে কীভাবে সমৃদ্ধির লোভ দিয়ে ফাঁদে ফেলার চেষ্টা করে পাচারকারীরা।

সেরকমই এক সচেতনতা শিবিরে গিয়ে কথা হয় পনেরোর এক কিশোরীর সাথে – যাকে পাচার করে নিয়ে গিয়ে বিক্রী করে দেওয়া হয়েছিল দিল্লিতে।

“বছর দেড়েক আগে স্কুল থেকে বাড়ী ফেরার পথে পেছন থেকে একটা ছেলে এসে আমার মুখে কিছু চেপে ধরে, তারপর আমার আর হুঁশ ছিল না। যখন হুঁশ ফিরল, তখন একটা ছেলেকে পাশে দেখে জানতে চাইলাম কোথায় নিয়ে এসেছে আমাকে, সে বলেছিল দিল্লিতে। এরমধ্যে চারদিন কেটে গেছে” – বলছিল পাচার হয়ে যাওয়ার পরে সম্প্রতি উদ্ধার হওয়া কিশোরীটি।

বিক্রী করে দেওয়ার পরে ওই কিশোরীর ওপরে যৌন নির্যাতন চলত নিয়মিত, সঙ্গে জুটত মারধর। উত্তর ভারতের বিভিন্ন পর্যটন স্থলে নিয়ে গিয়ে তাকে দেহব্যবসায় কাজে লাগান হত। বেশী অসুস্থ হয়ে পড়ায় দিল্লির একটি হাসপাতালে তাকে ফেলে দিয়ে যাওয়া হয়েছিল।

ওই কিশোরীটির শরীরে ততদিনে বাসা বেঁধেছে এইচ আই ভি। সেই কারণেই তার নাম গোপন রাখা হল।

“হাসপাতালে ওর শরীর থেকে ২২ লিটার পুঁজ বেরিয়েছে, তাহলেই কল্পনা করুন কী অত্যাচার হয়েছে ওর ওপরে,” বলছিলেন দক্ষিণ ২৪ পরগণা জেলার এক পুলিশ কর্তা।

ওই কিশোরীটি তার মায়ের সঙ্গে মঙ্গলবার এসেছিল নিজের সমবয়সী বা একটু ছোট স্কুলপড়ুয়া আর তাদের অভিভাবকদের কাছে, নারী পাচার রোধে একটি সচেতনতা শিবিরে।

‘স্বয়ংসিদ্ধা’ নাম দেওয়া হয়েছে পুলিশের এই সচেতনতা অভিযানকে।

পুলিশ অফিসারেরা স্কুল পড়ুয়া আর তাদর অভিভাবকদের বোঝাচ্ছেন কীভাবে পাচারকারীরা আসলে তাদের কাজ চালায়।

ডায়মন্ড হারবার মহিলা পুলিশ থানার অফিসার ইনচার্জ পিঙ্কি ঘোষ নিয়মিত এই সচেতনতা শিবিরগুলিতে যোগ দেন।

মিজ ঘোষ বিবিসিকে জানাচ্ছিলেন, “বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই ১৮ বছর বা তার কম বয়সীরা পাচারের শিকার হয়। ওই বয়সটায় তো দেহে অনেকরকম হরমোনজনিত পরিবর্তন ঘটতে থাকে, তাই নানা স্বপ্ন দেখতে থাকে মেয়েরা এই বয়:সন্ধির সময়ে। অনেকের বাড়ীতে এমন কেউ থাকেনও না যাঁরা এই শারীরিক আর মানসিক পরিবর্তনগুলো ধরতে পারবেন বা মেয়েদের বোঝাতে পারবেন। এই ফাঁদটাই পাতে পাচারকারীরা – একটা রঙীন ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখিয়ে পাচার করে দেওয়া হয়।”

নারী পাচার গোটা জেলায় কতটা ব্যাপক আকার ধারণ করেছে, সেটা আজকের সচেতনতা শিবিরে হাজির অনেক পুলিশ কর্তাই বলছিলেন।

কিন্তু এতদিন বাড়ীর মেয়েরা নিখোঁজ হয়ে গেলে একটা অভিযোগ গ্রহণ ছাড়া বিশেষ কোনও উদ্যোগ দেখা যেত না পুলিশের।

দক্ষিণ ২৪ পরগণার অতিরিক্ত পুলিশ সুপারিন্টেডেন্ট চন্দ্রশেখর বর্ধন, যিনি এই স্বয়ংসিদ্ধা প্রকল্পটি তৈরী করেছেন, তাঁর কথায়, সেই পদ্ধতিটাই বদল করা হচ্ছে।

“এতদিন মানব পাচারের ব্যাপারে আমরা রিঅ্যাক্টিভ পুলিসিং করতাম, অর্থাৎ নিখোঁজ হওয়ার অভিযোগ পাওয়ার পরে ব্যবস্থা নেওয়া শুরু হত। কিন্তু পাচারের পেছনে যে জটিল আর্থ-সামাজিক কারণগুলো আছে, সেগুলোর দিকে নজর দেওয়া হত না। পাচারের মূল টার্গেট যারা, তাদের যতক্ষণ না বোঝানো যাবে পাচার ব্যাপারটা কী, একটি মেয়ে পাচার হয়ে যাওয়ার পরে কী অত্যাচার হয় তার ওপরে, ততদিন পাচার বন্ধ করা যাবে না। সেজন্যই আমাদের স্কুলপড়ুয়াদের আর তাদের বাবা-মায়ের কাছে পৌঁছনর এই নতুন প্রচেষ্টা,” বলছিলেন মি. বর্ধন।

মঙ্গলবার ঢোলা হাইস্কুলে যে সচেতনতা শিবিরের আয়োজন করা হয়েছিল, সেখানে আশপাশের আরও ৫টি স্কুলের ছাত্রছাত্রী আর অভিভাবকরা হাজির ছিলেন।

শিবির শেষ হওয়ার পরে তাঁদেরই কয়েকজনের কাছে জানতে চেয়েছিলাম নারী পাচারের ব্যাপারে আসলই তাঁরা কতটা সচেতন হলেন আজকের শিবিরের পরে।

নবম শ্রেণীর এক ছাত্রী বলছিল, “আমরা আজ বুঝতে পারলাম যে কতটা সতর্ক থাকা দরকার আমাদের। বাল্য বিবাহের নাম করেও তো পাচার হয়ে যায় অনেকে। এরপর থেকে এরকম কোনও ঘটনা কানে এলেই মহিলা পুলিশের কাছে ফোন করে দেব।”

দুজন অভিভাবকের কথায়, “পথেঘাটে যে চাকরী দেওয়ার নাম করে বা বিয়ে করার নাম করে দালাল ফড়েরা ঘুরছে, তাদের হাতে যাতে মেয়েরা না পড়ে, সেটাই মা হিসাবে বোঝাতে হবে আমাদের। আর বাচ্চাদেরও সতর্ক থাকতে হবে।”

সচেতনতা শিবির শেষ হওয়ার আগে দেখানো হচ্ছিল পাচার হয়ে যাওয়ার ভয়াবহ কয়েকটি ঘটনা নিয়ে তৈরী একটি ছোট তথ্যচিত্র।

সেই সময়ে স্কুল ছাত্রী আর তাদের অভিভাবকদের বিস্মিত চোখমুখ দেখে এটা আন্দাজ করা শক্ত হয় নি, যে জেলা থেকে প্রতিবছর কয়েক হাজার নারী – নাবালিকা নিখোঁজ হয়ে যান, সেখানকার সাধারণ মানুষের কাছে পাচারের ভয়াবহতা সম্বন্ধে বিশেষ একটা ধারণাই ছিল না এতদিন।-বিবিসি বাংলা