মেইন ম্যেনু

প্রতিবন্ধী ও অসহায় মানুষের বেঁচে থাকার স্বপ্ন দিনাজপুরের ‘সোহেল ভাই’

আবু রায়হান মিকাঈল : ‘জীবে প্রেম করে যেই জন, সেই জন সেবিছে ঈশ্বর’ স্বামী বিবেকান্দের এই বাণী প্রতিফলিত হয়েছে একজন সাদা মনের মানুষের মাঝে। নামটি তার সোহেল আহম্মেদ, বাড়ি দিনাজপুরের বীরগঞ্জ। যিনি দীর্ঘ ২০ বছর নিঃস্বার্থভাবে প্রতিবন্ধী ও দুস্থ্য মানুষের জন্য নিজেকে উৎস্বর্গ করে চলেছেন। এ পর্যন্ত কয়েক হাজার মানুষের পাশে তিনি দাঁড়িয়েছেন, সাধ্যমত করেছেন তাদের সাহায্য সহযোগিতা। তার এই কার্যক্রমটির নাম দিয়েছেন “পথ মানব সেবা”। বাল্যকাল থেকে শুরু করে আজও অব্দি চলছে সোহেল আহম্মেদের পথ মানব সেবা। যেটি ইতোমধ্যে উত্তরাঞ্চলের মানুষের কাছে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। আজও এই মানুষটির উপর নির্ভর করে বহু পরিবারের অন্ন-বস্ত্র। এমনিভাবে নীরবে প্রাদ-প্রদীপের আলোর বাহিরে নিভৃতে মানব সেবায় নিয়োজিত আছেন সোহেল আহম্মেদ। যার উপর নাই এই সমাজের লাইট, ক্যামেরার ফোকাস; তবুও আপন মনে চলছে তার মহতী কাজ পথ মানব সেবা।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বীরগঞ্জ তথা দিনাজপুর অঞ্চলের অনেক প্রতিবন্ধী, বিধবা, সাঁওতাল, আদিবাসী, সুইপার এমনকী রাস্তার পাগলদের কাছে প্রিয় একটি নাম ‘সোহেল ভাই’। তিনি যেন এই মানুষগুলোর বেঁচে থাকার স্বপ্ন, আশার প্রদীপ। যখনই তারা পড়েছেন দারিদ্রতার করাঘাতে তখনই পাশে পেয়েছেন এই মহান মানুষটিকে। সোহেল আহম্মেদের মানবিতার ভালবাসা শুধু মানুষই নয়, সমানভাবে পেয়েছে অবালা জীব-জন্তুও। অনুসন্ধানের অনেক ছবি ও ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে তিনি রাস্তার ক্ষুধার্ত কুকুর, বেড়ালকেও খাওয়াচ্ছেন।

আওয়ার নিউজ বিডি’র বার্তা কক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হয় বীরগঞ্জের বাসিন্দা প্রতিবন্ধি রিতা রাণীর সাথে। যে রিতাকে নিয়ে ইতোমধ্যে বিভিন্ন অনলাইন-অফলাইন সহ টিভি মিডিয়ায় সংবাদ প্রচার হয়েছে। তিনি আমাদেরকে বলেন- ‘বলতে পারেন সোহেল ভাইয়া আমার জীবনে একটা আশার প্রদীপ। আমার পড়াশুনা বা পারিবারিক অভাব অনাটনে সোহেল ভাইয়ার কাছ থেকে অনেক সহযোগিতা পেয়েছি। এইতো কিছু দিন আগেও তিনি আমাকে শীত বস্ত্র দিয়েছেন।’

রিতা রাণী আওয়ার নিউজ বিডিকে আরো জানান- প্রতিবন্ধী বলে অনেকে ভৎসনার দৃষ্টিতে দেখে, কিন্তু সোহেল ভাইয়া আমাকে তার নিজের বোনের মতো দেখতেন। শুধু আমাকে নয়, তিনি আমার মতো অনেক প্রতিবন্ধী মেয়ে ও অসহায় পরিবারের পাশেও দাঁড়িয়েছেন।

অপরদিকে, আদিবাসী প্রতিবন্ধী কান্ত সরেন-এর মা আওয়ার নিউজ বিডিকে জানান, ‘উনার (সোহেল) কাছ থেকে আমরা সহ আশপাশের অনেকেই সাহায্য সহযোগিতা পেয়েছেন এবং এখনো পাচ্ছেন। সুখে-দুঃখে সব সময় আমরা উনাকে পাশে পায়।’

৩৭ বছরের এই সোহেল আহম্মেদ আজ হতে পারেন এ সমাজের জন্য একটা দৃষ্টান্ত। যে বয়সটি তারুণ্যের, যে বয়সটি উড়ে বেড়ানোর, সেই বয়সটি তিনি কাটিয়েছেন নিভৃত সমাজের অবহেলিত মানুষগুলোর সাথে। কখনো কোনো কিছু পাওয়ার আশায় নয়, যেটি করেছেন নিজের প্রতি সমাজের দায়বদ্ধতা থেকেই করেছেন। বলতে পারি, সত্যি আজ স্বার্থক হয়েছে সোহেল আহম্মেদের তারুণ্যের বয়সটি।

সম্প্রতি এই সাদা মনের মানুষ সোহেল আহম্মেদ-এর একটি সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আওয়ার নিউজ বিডি’র বার্তা সম্পাদক আবু রায়হান মিকাঈল। সাক্ষাৎকারের দীর্ঘ আলাপচারিতায় উঠে এসেছে ‘পথ মানব সেবার কিছু ঘটনাবহুল তথ্য। যেটি এ প্রজন্মের তরুণদের জন্য অনুপ্রেরণার প্রতীক হতে পারে। পাঠকদের জন্য সাক্ষাৎকারটি নিম্নে হুবহু তুলে ধরা হলো :

আওয়ার নিউজ বিডি : কেমন আছেন? আওয়ার নিউজ বিডি’র পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা নিন।
সোহেল আহম্মেদ : আলহামদুলিল্লাহ ভাল আছি। আওয়ার নিউজ বিডিকেও আমার পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা।

আওয়ার নিউজ বিডি : আপনার ‘পথ মানবসেবা’ সম্পর্কে কিছু বলুন।15128670_365000163847039_1323614647_n
সোহেল আহম্মেদ : ধর্ম, বর্ণ, জাতি, গোত্র আমার কাছে কোনো ভেদাভেদ নেই। সকল ধর্মের মানুষকে আমি শ্রদ্ধার সাথে দেখি। কে কোন ধর্ম বা গোত্রের মানুষ আমার কাছে সেটি বড় পরিচয় নয়, আমরা সবাই মানুষ এটাই বড় পরিচয়। আর মানুষ তো মানুষের জন্য। আমি সব সময়ই চেষ্টা করেছি সুখে-দুঃখে মানুষের পাশে থাকার জন্য। আমার ‘পথ মানব সেবা’ সম্পর্কে কি আর বলব, বলতে পারেন এটা আমার এক ধরণের নেশা। কোনো কিছু পাওয়ার আশায় নয়, একেবারে নিঃস্বার্থভাবে দীর্ঘ ২০ বছরের বেশি সময় ধরে আমি মানুষের সেবা করে যাচ্ছি। আর যতদিন বাঁচব অসহায় মানুষের পাশে থাকব (ইনশা আল্লাহ)।

আওয়ার নিউজ বিডি : আচ্ছা, কেন আপনি মানব সেবায় নিজেকে এভাবে উৎস্বর্গ করলেন?
সোহেল আহম্মেদ : আমি একজন মুসলমান। পবিত্র আল-কুরআন সহ আমি বিভিন্ন ধর্মের গ্রন্থগুলো পড়েছি। আমি সব জায়গাতে দেখেছি মানব সেবাই হলো পরম ধম। শুধু মানুষ কেন, আল্লাহ সৃষ্টি জীব-জন্তুর প্রতিও রয়েছে আমাদের অনেক দায়বদ্ধতা।

আওয়ার নিউজ বিডি : কখন থেকে আপনি মানব সেবা শুরু করেন?
সোহেল আহম্মেদ : বর্তমানে আমার বয়স চলছে ৩৭ বছর। যখন আমার বয়স ১৬/১৭ বছর ছিল তখন থেকে অসহায় মানুষের পাশে থাকার চেষ্টা করেছি। আমি তখন ছাত্র ছিলাম, পড়াশুনার খরচ ও টিফিন খরচ থেকে টাকা বাঁচিয়ে ভিক্ষুক-অসহায় মানুষ দেখলেই তাদের সাহায্য করতাম। সেই ছোট থেকেই অসহায় মানুষগুলো প্রতি কেন জানি সব সময় আমার দুর্বলতা কাজ করতো।

আওয়ার নিউজ বিডি : আপনার আয়ের উৎসব কী?
সোহেল আহম্মেদ : আয়ের উৎস বলতে আমার একটা জুতার দোকার আছে। সেখান থেকে যেটা আসে সেটা দিয়ে আমরা চলি এবং বিভিন্ন মানুষের সাহায্য সহযোগিতা করি।

আওয়ার নিউজ বিডি : আপনি তো বিশ বছর ধরে মানব সেবা করেন; তো বিশ বছর আগে আপনার আয়ের উৎস কি ছিল।25
সোহেল আহম্মেদ : আগেই বলেছি- তখন তো আমি ছাত্র ছিলাম। পড়াশুনা ও টিফিন খরচের টাকা বাঁচিয়ে সঞ্চয় করতাম। এরপর বেশি মতো টাকা সঞ্চয় হলে সেটা ভিক্ষুক ও অসহায় মানুষদের দান করে দিতাম। তাছাড়া ঐ সময় বাবার ব্যবসায় আমি সহযোগিতা করতাম, বাবা আমাকে পকেট খরচ বাবদ যে টাকা দিত সেটিও আমি সঞ্চয় করে রাখতাম।

আওয়ার নিউজ বিডি : আপনার এই মানব সেবা কাজে স্ত্রী বা পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো ধরণের বাঁধা পেয়েছেন কী?
সোহেল আহম্মেদ : আল্লাহর দরবারে লাখো শুকরিয়া। আমার মনে হয় আমি অনেক ভাগ্যবান। কারণ আমি বিবাহের পর থেকে আজ পর্যন্ত স্ত্রীর কাছ থেকে সহযোগিতা ছাড়া কখনো কোনো বাঁধা পায়নি। শুধু তাই নয়, স্ত্রী আমাকে বরাবরই উৎসাহ দিয়ে আরো সাহস জুগিয়েছে। আমার মানব সেবার পেছনে তার অবদানও কম নয়। আমি মনে করি খুব কম স্বামীরই ভাগ্যে এমন স্ত্রী জোটে। অপর দিকে সেই ছোট্ট থেকে আমি বাবা-মায়ের সহযোগিতা সব সময় পেয়েছি। আমার জীবনের প্রতিটি বিন্দুকণায় তাদের অবদান সত্যি অপরিসীম।

আওয়ার নিউজ বিডি : কাদের প্রতি আপনার সাহায্যের হাত বেশি বাড়িয়েছেন?15209264_371281299885592_381061804_n
সোহেল আহম্মেদ : প্রতিবন্ধি, বিধবা, সাঁওতাল, আদিবাসী, সুইপার, রাস্তার পাগল ও ভিক্ষুকদের প্রতি আমার ভালবাসাটা একটু বেশি। সব সময় চেষ্টা করি তাদের পাশে থাকার। এবার শীতেও প্রতিবন্ধি সহ কয়েজনকে শীতবস্ত্র দিয়েছি।

আওয়ার নিউজ বিডি : মানব সেবা করতে গিয়ে আপনার আশপাশের বা সমাজের কারো কাছ থেকে কি কখনো বাঁধার সম্মূখীন হয়েছেন?
সোহেল আহম্মেদ : সরাসরি কখনো বাঁধার সম্মূখীন হয়নি, তবে আমাকে নিরুৎসায়িত করে আমার এই কার্যক্রমকে
থামানোর চেষ্টা চালিয়েছে অনেকেই। কিন্তু কেউ আমাকে দমিয়ে রাখতে পারিনি। কারণ আমি তো সম্পূর্ণ নিঃস্বার্থভাবেই এই কাজ গুলো করে থাকি। নিজের পরিশ্রম তখন স্বার্থক মনে হয় যখন ভ্যান-রিকসা চালক সহ নিম্নশ্রেণীর মানুষগুলো আমাকে অনেক সম্মান করে, অনেক ভালবাসে। তাদের ঐ অকৃত্রিম ভালবাসায় আমি যেন আকাশ ছোঁয়া অনুপ্রেরণা পেয়েছি।

আমি যেখানে যে অবস্থাতেই কোনো অসহায় মানুষ দেখি, তখনই সাধ্যমত সাহায্য সহযোগিতা করার চেষ্টা করেছি। সম্প্রতি ঢাকায় গিয়েছিলাম; দেখি ফুটপথে বিবস্ত্র অবস্থায় একজন মানুষ কাতরাচ্ছে। একটু কাছে গিয়ে লোকটির কথা শুনে জানতে পারলাম তিনি খুব ক্ষুধার্ত। এরপর আমি আশপাশের একটা দোকান থেকে একটি লঙ্গী, হোটেল থেকে ১ প্যাক খেচুড়ি ও ১ বোতল পানি কিনে লোকটিকে দিলাম। খাদ্য ও বস্ত্র পাওয়ার পরে লোকটির মধ্যে আমি যে আনন্দের ঝিলিকটা দেখলাম সেটি আমাকে জন্য ছিল হিমালয়সম অনুপ্রেরণা।

আওয়ার নিউজ বিডি : মানব সেবার ক্ষেত্রে কখনো কি সরকারী বা বেসরকারী কোনো সংস্থার সহযোগিতা আপনি পেয়েছেন?20
সোহেল আহম্মেদ : না, আমার পথ মানব সেবার ক্ষেত্রে আমি কোনো সংস্থা বা স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সহযোগিতা আজও পর্যন্ত পায়নি। কালকের আমার এলাকার একটা ঘটনা বলি, আমি যখন সন্ধ্যার পর রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি তখন দেখি ক্ষুধার্ত রাস্তার এক পাগল হোটেলের সামনে গিয়ে হাত বাড়াচ্ছে। সে সময় আমার সঙ্গে ছিল একজন চাকুরিজীবী কর্মকর্তা, তখন আমি তাকে বললাম ভাই একটু দাঁড়ান; এরপর আমি পাগলে কাছে গিয়ে তাকে হোটেল নিয়ে পছন্দ মতো খাওয়ালাম। আমার সাথে যিনি ছিলেন পরে তিনি বললেন- ভাই, আল্লাহ আপনার চেয়ে আমাকে অনেক টাকা পয়সা দিয়েছে, কিন্তু আপনার মতো অত বড় মনের মানুষ আমি হতে পারিনি। আজ আপনার মানসিকতার কাছে সত্যি আমি হেরে গেলাম।

আওয়ার নিউজ বিডি : দীর্ঘ বিশ বছরে আপনি কি পরিমাণ মানুষের সেবা করেছেন?
সোহেল আহম্মেদ : হিসাব নাই কি পরিমাণ মানুষের সেবা করেছি। যখন যেমন পেরেছি তখন সেখানে তেমন সহযোগিতা করার চেষ্টা করেছি। এতদিনে হয়তো কয়েক হাজার ছাড়িয়ে গেছে এর পরিমাণ। বিশ বছরে যে টাকাগুলো মানুষের জন্য বিলিয়েছি ঐ টাকা গুলো যদি রাখতাম তাহলে আজ হয়তো আমি অনেক বিলাশ বহুল জীবন যাপন করতে পারতাম। এতো দিনে আমার বাড়ি গাড়ী সবই হয়ে যেতো। তবুও আমি অনেক আনন্দিত এই কারণে যে, ঐ টাকা গুলো দিয়ে আমি এ পর্যন্ত হাজার হাজার মানুষের মুখে হাসি ফুটাতে পেরেছি। আর তাদের ভিতর থেকে আমি যে প্রশান্তির ঘ্রাণ ও ভালবাসাটা পেয়েছি সেটি হয়তো আলিশান অট্টালিকায় কখনই পেতাম না।

আওয়ার নিউজ বিডি : এবার একটু ব্যক্তিগত প্রসঙ্গে আছি। আপনার লেখাপড়া কত দূর?
সোহেল আহম্মেদ : আমি বি.কম পাস করেছি।

আওয়ার নিউজ বিডি : আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে কিছু বলুন।
সোহেল আহম্মেদ : আমার ইচ্ছা আছে আমি একটি ‘কেয়ার হোম’ ও হাসপাতাল তৈরি করব। যেখানে গৃহহীন মানুষেরা আশ্রয় পাবে এবং অর্থের অভাবে যারা চিকিৎসা নিতে পারে না তাদের এখান থেকে ফ্রি চিকিৎসা সেবা দেওয়া হবে। জানিনা নিম্নবৃত্ত শ্রেণীর মানুষ হয়ে আমি আমার স্বপ্নগুলো কতটুকু পূরণ করতে পারব!!!

আওয়ার নিউজ বিডি : ধন্যবাদ, দীর্ঘক্ষণ আওয়ার নিউজ বিডিকে আপনার মূল্যবান সময় দেওয়ার জন্য।
সোহেল আহম্মেদ : আওয়ার নিউজ বিডিকেও অসংখ্য ধন্যবাদ।


বিঃ দ্রঃ পাঠক, চাইলে আপনিও সোহেল আহম্মেদ-এর “পথ মানবসেবা” কার্যক্রমে একাত্মতা প্রকাশ করতে পারেন। Path worship charity mission নামক ফেসবুক ফ্যান পেইজ থেকে চালানো হয় পথ মানবসেবার কিছু কিছু প্রচারণা।

এই পথ মানব সেবা সম্পর্কে সরাসরি আপনার মতামত জানাতে পারেন সোহেল আহম্মেদকে।

যোগাযোগঃ

ব্যক্তিগত ফেসবুক : facebook.com/Sohel Ahmed

ফোন নাম্বার : +88 01750526899


পাঠকদের জন্য পথ মানবসেবার কিছু ছবি নিচে দেওয়া হলো :

2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18

1