মেইন ম্যেনু

বাবা তাজউদ্দিনকে নিয়ে সোহেল তাজের আবেগঘন স্মৃতিচারণ

fghjl

আজ থেকে ৪১বছর আগে এইদিনে বাবাকে হারান তানজিম আহম্মেদ সোহেল তাজ। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার তিন মাসের কম সময়ের মধ্যে ১৯৭৫ সালের এইদিনে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম বীর সেনানী তাজের বাবা তাজউদ্দীন আহমদসহ চার জাতীয় নেতাকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের অভ্যন্তরে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। দিনটি দেশের ইতিহাসে অন্যতম বর্বরোচিত এক কালো অধ্যায় হিসেবে গণ্য।

তাজউদ্দিনসহ চার নেতাকে সারাদেশে যখন শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হচ্ছিল তখন আনুষ্ঠানিকতায় নিজেকে জড়াননি সোহেল তাজ। তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুকে বাবাকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করে বিকালে একটি লেখা দেন তিনি। ঢাকাটাইমসের পাঠকদের জন্য হুবহু তা তুলে ধরা হলো।

‘আজ থেকে ঠিক ৪১ বছর আগে এই দিনে একটি পাঁচ বছর বয়সের ছোট্ট ছেলে হারাল তার প্রিয় বাবাকে। যার হাত ধরে সে যেত বাড়ির পাশে আবাহনীর মাঠে। যার হাত ধরে ধানমন্ডির সাত মসজিদ রোডের রাস্তা দিয়ে হেঁটে হেঁটে খুঁজে পেয়েছিল তার প্রথম স্কুল। টেলিভিশনের পর্দায় বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত আর জাতীয় পতাকা পরিবেশিত হলে যিনি সব সময় মনে করিয়ে দিতেন দাঁড়িয়ে স্যালুট করে শ্রদ্ধা প্রদর্শন করতে। যিনি কোমলভাবে বোঝাবার চেষ্টা করতেন মুক্তিযুদ্ধে লাখো মানুষের আত্মত্যাগের কথা। যিনি এই ছোট্ট ছেলেটিকে একটি আত্মবিশ্বাসী দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবে নিজেকে তৈরি করার গুরুত্ব শেখাবার চেষ্টা করেছিলেন এবং অনুপ্রেরণা যোগানোর চেষ্টা করেছিলেন নানা কায়দায়।

এ ছেলেটির জীবনটা হঠাৎ করে পাল্টে গেলো একদিন। ছেলেটি দেখতে পেল একটি লাশ, তার বাবার লাশ। লাশটি রাখা হলো একটি রুমে আর সেই লাশ দেখতে আসলো হাজার হাজার মানুষ। সেও অবাক হয়ে দেখতে লাগল সবার সাথে। পরে সেও গেলো বনানী কবরস্থানে। সেখানে সবাই তাকে প্রথমে মাটি দিতে বললো- সেও দিলো। তার কাছে মনে হচ্ছে এটা যেন একটি স্বপ্ন এবং এই স্বপ্নের মধ্য দিয়ে সে ভেসে যাচ্ছে।

আস্তে আস্তে সময় পার হতে লাগলো আর সেই স্বপ্নের আবরণ ধীরে ধীরে কেটে যেতে লাগলো। তারপর থেকে তার মনে খালি প্রশ্ন আর প্রশ্ন। তার কেন বাবা নেই? অন্য সবার তো বাবা আছে। আরও সময় পার হলো কিন্তু প্রশ্নগুলো আরও জটিল হতে লাগলো। কেন মেরে ফেলা হলো তার প্রিয় বাবাকে? উনি কি অন্যায় করেছিলেন? ওনাকে জেলে কেন রাখা হয়েছিল? আর জেলখানায় মেরে ফেললো কারা এবং কেন? এই প্রশ্নগুলো যখন তার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে তখন সে তার মাকে বলতে শুনত, ‘আমি আমার স্বামী হারিয়েছি আর আমার সন্তানরা তাদের বাবাকে হারিয়েছে,কিন্তু দেশ কি হারাল? আমাদের ক্ষতি থেকে দেশের আরো মারাত্মক ক্ষতি হয়ে গেলো।’

তারপর ৪১ বছর পার হয়ে গেল। ছোটবেলার সেই দুঃখ, কষ্ট আর যন্ত্রণা নিয়েই বছরগুলো পার করল। সে বুঝতে পারল যে তার সত্ত্বা তার সেই হারানো বাবার মাঝেই লুকিয়ে আছে।

আজ ৩রা নভেম্বর ২০১৬। আজ থেকে ৪১ বছর আগে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে নির্মম ভাবে হত্যা করা হয়েছিলো বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দানকারী জাতীয় চার নেতা গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রথম সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ, অর্থমন্ত্রী ক্যাপ্টেন (অব.) এম মুনসুর আলী, খাদ্য ও ত্রাণমন্ত্রী এ এইচ এম কামরুজ্জামান।

বাংলাদেশ তার সত্ত্বা খুঁজে পাবে তখনই যখন জাতির জনক বঙ্গবন্ধুসহ সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন (অব.) এম মুনসুর আলী ও এ এইচ এম কামরুজ্জামানদের মতো সকল নেতাদের আত্মত্যাগ, অবদান আমরা সঠিক এবং পৃথক ভাবে মূল্যায়ন করতে পারব। তাদের আত্মত্যাগ ও আত্মদান খুলে দিক ইতিহাসের সেই জানালা যার গভীরে ঢুকে এই জাতি খুঁজে পাবে তার সত্ত্বা।’