মেইন ম্যেনু

সাতক্ষীরার গফফার করেছেন ৪১টি বিয়ে : নাম মনে নেই সব স্ত্রীর!

wert

৪১টি বিয়ে করেছেন তিনি। এখন ঘরে আছেন একজন। অন্যরা হয় ভিন্ন সংসারে চলে গেছেন, না হয় মারা গেছেন। তবে ৪১ স্ত্রীর সবার নাম মনে নেই আবদুল গফফার খানের।

পঞ্চাশোর্ধ্ব এই ব্যক্তি জানান, কখন, কোথায়, কাকে, কীভাবে বিয়ে করেছেন, সে কি আর মনে রাখা যায়?

বিয়ের কোনো কাবিননামা আছে কি না জানতে চাইলে গফফার জানান, কাবিননামা দিয়ে কী হবে? বিয়ে হয়েছে দুজনের মত অনুযায়ী। দুই-একটি কাবিননামা থাকলেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে নেই।

ছিপছিপে চেহারার আবদুল গফফার খান এখন অসুস্থ হয়ে বাড়িতে রয়েছেন। তাঁর হাতে, পায়ে ও দেহের বিভিন্ন স্থানে আঘাত করেছিল ভাগ্নে সাঈদ ও তার সহযোগীরা। অসুস্থতার কারণে বাড়ি থাকার চেষ্টা করলেও দেনার দায়ে টিকে থাকা দায় হয়ে পড়েছে।

গতকাল শনিবার সকালে আবদুল গফফারের বাড়ি সাতক্ষীরার তালা উপজেলার দাদপুর গ্রামে পৌঁছাতেই দেখা মিলল বেশ কয়েকজন পাওনাদারের। চেয়ারে বসে মুখে সিগারেট নিয়ে গফফার খান বলেন, ‘আমার কাছে তারা টাকা পাবে, কিন্তু টাকা দেওয়ার সাধ্যি নেই।’

দাদপুর গ্রামের জাফর আলী খানের ছেলে এই গফফার খান। এলাকায় প্রচার রয়েছে তিনি জাদু জানেন। তাঁর দাবি, অনেক মন্ত্রও জানেন তিনি। ইচ্ছা করলে আপনার হাতের ঘড়ি, আংটি একমন্ত্রে উড়িয়ে দিতে পারেন। বললেন, ‘যত বড় তালা হোক, আমি তুড়ি দিলেই তা খুলে যাবে।’

গফফারকে যেভাবে চেনেন স্থানীয়রা

স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা জানান, গফফার খান একটি অজ্ঞান পার্টির নেতৃত্ব দেন। যেকোনো মানুষের সঙ্গে খাতির জমিয়ে বাড়িতে পৌঁছে খাবারের সঙ্গে চেতনানাশক মিশিয়ে বাড়ির লোকজনদের অজ্ঞান করে বাড়ির সব কিছু লুটপাট করার কাজ করে আসছেন তিনি। আর এ নিয়ে বেশ কয়েকবার গণপিটুনির শিকার হয়েছেন তিনি।

সর্বশেষ এক বছর আগে তালার ইসলামকাটীতে একই ঘটনা ঘটাতে গিয়ে গণপিটুনি খেয়ে আহত হয়ে প্রায় পঙ্গুত্ব বরণ করেন আবদুল গফফার।

তবে গফফার খান বলেন, ‘ষড়যন্ত্রমূলকভাবে আমার ভাগ্নে আবু সাঈদ আমাকে মারধর কইরেছ।’

বিয়ের ফিরিস্তি

কয়টি বিয়ে করেছেন জানতে চাইলে আবদুল গফফার খান বলেন, তিন-চারটি করেছি আর কি। কিছুক্ষণ পর বলেন, মোট আটটি বিয়ে করেছেন।

‘আপনি অনেক বিয়ে করেছেন এমন প্রচার কেন?’

জবাবে আবদুল গফফার বলেন, ‘আমি ৪১টি বিয়ে করেছি, কিন্তু এসব জেনে আপনি কী করবেন?’

৩০ বছর আগে তালার ইসলামকাটীর নওশের আলীর মেয়ে মঞ্জুয়ারাকে বিয়ে করেছিলেন গফফার খান। সেই প্রথম স্ত্রী এখন আর বেঁচে নেই। শেষদিকে যশোরের মনিরামপুরের হাসাডাঙা গ্রামের কোরবান আলীর মেয়ে রওশন আরাকে বিয়ে করেন গফফার। পরে কেশবপুর উপজেলার মধ্যকূল গ্রামের জয়নাল হোসেনের মেয়ে আছিয়াকে বিয়ে করেন তিনি। আছিয়ার একটি ছেলে প্রতিবন্ধী জাহাঙ্গীর।

এর আগে নিজ গ্রামের শমসের খাঁর মেয়ে খুকি বিবিকে ঘরের বউ হিসেবে নিয়ে আসেন গফফার খান। খুকির ছেলে আব্দুস সেলিম এখন বরিশালে একজন শ্রমজীবী। ঘরে থাকা স্ত্রী আছিয়ার মেয়ে ফাতেমা। তাঁর বিয়ে হয়েছে তালার আটারোইতে। গফফার খানের আরেক স্ত্রীর নাম পাওয়া গেছে। তিনি রিজিয়া খাতুন।

বউ আসে, বউ যায়

স্থানীয় কিছু বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গফফার খান হঠাৎ বিয়ে করে বাড়িতে বউ নিয়ে আসেন। কিছুদিন থাকেন। তারপর দুজনই উধাও হয়ে যান। এরপর দেখা যায়, আবারও কোনো নারীকে বিয়ে করে এনেছেন। কিছুদিনের মধ্যে তিনিও উধাও। এসব স্ত্রীর পিত্রালয় কোথায় বা তাদের নাম-পরিচয় কী, সে সম্পর্কে গ্রামের লোকজন সম্পূর্ণ অন্ধকারে। তাদের দাবি, গফফার খান এতটাই জাদুবিদ্যা জানেন যে, তিনি ইচ্ছা করলে বাড়ির সম্পদ তো দূরের কথা, একজন ব্যক্তিকেও নিখোঁজ করে দিতে পারেন। আর এই ভয়ে গফফার খানের বিরুদ্ধে কেউ কোনো কথা বলতে চান না।

দাদপুর গ্রামের বৃদ্ধা রিজিয়া খাতুন ও সেলিনা বেগম জানান, গফফার খানের অগণিত বিয়ে। এটা জেনেও তাঁকে কেউ কিছু বলে না। এর একটাই কারণ, তিনি একটি অজ্ঞান পার্টির পরিচালক এবং জাদুকর। তাঁর ক্ষতি করলে তিনিও ক্ষতি করে দেবেন।

অভিনব উপায়ে চুরি

কুমিরা ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান দাদপুর গ্রামের আবদুর রশিদ জানান, তিন বছর আগে গফফার খান দল নিয়ে তাঁর বাড়িতে ঢুকে খাবারের সঙ্গে বিষ মিশিয়ে তাঁকে ও তাঁর স্ত্রীকে অজ্ঞান করে সবকিছু লুট করে নিয়ে যান।

ইসলামকাটী উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক শামসুর রহমান জানান, গফফার খান তাঁর বাড়িতে এক বছর আগে এসে পরিচয়পর্ব সেরে কৌশলে রান্নাঘরে ঢোকেন। এরপর রান্না করা মাংসে চেতনানাশক মিশিয়ে দেন। এই মাংস খেয়ে তাঁর স্ত্রী তহমিনা খাতুন ও প্রতিবেশী বিল্লাল ও ইসমাইল রাতে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। এই সুযোগে গফফার ঘরে ঢুকে টাকা-পয়সা, সোনা গয়না লুটপাট করার সময় হাতেনাতে ধরা পড়েন। পরে মারপিট দিয়ে তাঁকে আটকে রাখা হয়। খবর পেয়ে পুলিশ এসে তাঁকে নিয়ে যায়।

পুলিশকে গফফার খান জানান, ‘আমি ৮০ হাজার টাকা নিয়ে বরই গাছ কিনেছিলাম, সেই টাকা কেড়ে নিয়ে মাস্টার শামসুর রহমানের ছেলে ও অন্যরা আমাকে মারধর কইরেছে।’

উল্টো গফফার বাদী হয়ে মামলা করেন হাসিবুর রহমান, রওশন আলী, মেজবাউর রহমান, আলম মোড়ল, কালাম শেখ ও আকরামের নামে। এতে তাঁরা জেলও খেটেছেন। সে মামলা এখনো চলছে।

ইসলামকাটীর মাজিদা খাতুন বলেন, গফফার তাঁর বাড়িতে এসে ছেলেকে মুড়ি-চানাচুর কিনে আনতে পাঠান। এই ফাঁকে গফফার রান্না করা বেগুনের তরকারিতে ট্যাবলেট গুঁড়ো করে দেন। জানাজানি হওয়ায় তাঁরা অজ্ঞান হওয়ার হাত থেকে রক্ষা পেয়েছেন।

ইসলামকাটী গ্রামের আনিসুর, বাবু, রওশন ও আকরামদের বাড়িতে একইভাবে খাবারের সঙ্গে চেতনানাশক মিশিয়ে তাঁদের অজ্ঞান করে লুটপাট করে নিয়ে যান গফফার খান। ১৩ হাজার টাকা দিলে মাত্র এক ঘণ্টার মধ্যে ২৬ হাজার টাকা দিতে সক্ষম দাবি করে গফফার খান সুফিয়া খাতুন লক্ষ্মীর বাড়িতে একটি মেশিন নিয়ে কাজ করতে থাকেন। একপর্যায়ে ঘরে আগুন ধরে গেলে গফফার সেখান থেকে পালিয়ে যান। গফফার খান এভাবেই জাল টাকা এনে সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করে আসছেন।

প্রতারণার জাল

আবদুল গফফারের প্রতারণার জাল ছড়িয়ে রয়েছে বরিশাল, রাজশাহী, বগুড়া, যশোর, খুলনাসহ বিভিন্ন জেলায়। সেসব স্থানে অঘটন ঘটিয়ে দিব্যি পালিয়ে চলে আসেন নিজ গ্রামে। তবে নিজ গ্রামে তিনি তেমন কোনো অঘটন ঘটাননি বলে দাবি দাদপুরের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের। যে পরিবারকে টার্গেট করবেন গফফার সেখানে তিনি মিষ্টি হাতে নিয়ে যান। আলাপচারিতার সুযোগে তিনি বাড়ির রান্নাঘরে ঢুকে হাড়ি খুঁজে তাতে থাকা খাবারের সঙ্গে মিশিয়ে দেন ঘুমের ওষুধ অথবা অচেতন করার ওষুধ। এভাবে পরিবারের সদস্যদের অজ্ঞান করে গফফার খান লুটে নেন টাকা ও সোনা-গয়না। ম্যাজিক দেখিয়ে নারীদের নজর কাড়েন তিনি। এই সুযোগে ভাব জমিয়ে বিয়ে করেন তাঁকে। তারপর নিয়ে আসেন বাড়িতে। কিছুদিন থাকার পর গফফার আর নববধূ নিখোঁজ হয়ে যান।
এ পর্যন্ত ১৭ বার জেলে গেছেন গফফার খান। অথচ একবার মাত্র ৯১ দিন জেলে ছিলেন। আর বাকি সময় কয়েকদিনের মধ্যে বেরিয়ে আসেন তিনি।

এ প্রসঙ্গে গ্রামের লোকজন বলেন, জেলখানার মধ্যেও তিনি জাদুবিদ্যা ফলিয়ে সবার সঙ্গে প্রতারণা করে থাকেন। কীভাবে এত দ্রুত জামিন পান, তা নিয়ে তাঁরা বিস্মিত।

গ্রামে অনেকবার সালিস হয়েছে গফফার খানকে নিয়ে। কিন্তু কোনো সালিস কার্যকর হয়নি বলে জানালেন গ্রামের আতিয়ার রহমান। প্রতিদিনই তাঁর খোঁজে গ্রামে আসেন বাইরের লোক। তাঁরা বলেন, বিয়ে নিয়ে প্রতারণার কথা। অথবা টাকার কথা। জাল টাকার কথা।

গফফার খান বলেন, তাঁর বিরুদ্ধে যে যাই বলুক সব মিথ্যা কথা। তিনি বলেন, ‘আগে অনেক কিছু করেছি। এখন কিছু করি না।’

দাদপুর গ্রামের হাবিবুর রহমান জানান, গফফার কোনো নারীর চোখের দিকে একবার চোখ রাখলে ওই নারী প্রায় অচেতন হয়ে যান। এমন অবস্থায় তাঁকে সুস্থ করার নামে অনেক অপকর্ম করেন তিনি। এই সুযোগে তাঁর কাছে ভালো সেজে তাঁকে বিয়ে করেন। এভাবে গ্রামে দফায় দফায় নতুন বউদের নিয়ে আসেন গফফার খান। ফলে তাঁদের নাম-পরিচয় জানা সম্ভব হয় না।

কুমিরা ইউপির চেয়ারম্যান শেখ আজিজুল ইসলাম বলেন, গফফার খান একজন পাকা চোর ও প্রতারক। মানুষকে অজ্ঞান করে, চুরি-ডাকাতি করে সম্পদ লুটপাট করেন তিনি। এ ছাড়া জাল টাকার ব্যবসাও করেন। তিনি বলেন, গফফার খান বারবার জেলে যান। বারবার ফিরে আসেন।

ওই এলাকার ইউপি সদস্য দাদপুর গ্রামের লালু চৌধুরী বলেন, ‘গফফার খান অনেক নারীর সর্বনাশ করেছেন। এখন অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তাঁকে ভালো পথে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছি আমরা। প্রতারণা করে অনেক টাকা কামাই করলেও গফফার খান তা রাখতে পারেন না। আপন লোকজনের পেছনে সেই টাকাপয়সা খরচ করেন।’

গফফারের একটি অজ্ঞান বাহিনী আছে। এই বাহিনীর অন্য সদস্যদের চিহ্ণিত করতে পারলে ব্যবস্থা গ্রহণ সহজ হতো।

গফফার খানের স্ত্রী আছিয়া খাতুন ও প্রতিবন্ধী ছেলে জাহাঙ্গীর জানান, তাঁরা তাঁকে অসৎ পথ থেকে ফিরে আসার আহ্বান জানিয়েছেন। কিন্তু কোনো কথা তিনি শোনেন না।

পুলিশ যা জানে, গফফার যা বলেন

পাটকেলঘাটা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মহিবুল ইসলাম বলেন, গফফার খান একজন তালিকাভুক্ত চোর ও প্রতারক। সুনির্দিষ্ট মামলা হলেই তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। কিন্তু আইনের ফাঁক-ফোকর দিয়ে দ্রুত বেরিয়ে যান তিনি।

গফফার খানের দাবি, তিনি প্রতারক নন। বহু বিয়ে করলেও কাউকে নিজে বঞ্চিত করেননি।

‘বউ চলে গেলে তাতে আমার কি। আমি তো তাকে ফেরত কিংবা তালাক দেওয়ার জন্য আনিনি। তার ভালো লাগেনি, তাই চইলে গেছে। যাকগে।’

জেলে গিয়েছিলেন মিথ্যা ডাকাতি, চুরি ও প্রতারণার কারণে।

‘আগে যাই করি না কেন, এখন ভালো হয়ে গেছি। এখন শুধু দেনার টাকা নিয়ে দুশ্চিন্তা।’

আলাপের একপর্যায়ে গ্রামের বহু লোক সেখানে হাজির হন। তাঁরা সবাই এসেছেন পাওনা টাকার জন্য। কথা না বাড়িয়ে শৌচাগারে যাওয়ার কথা বলে পালিয়ে যান আবদুল গফফার খান।