মেইন ম্যেনু

ব্রাজিল থেকে প্রেমের টানে আলিপুরদুয়ারে ঘর বাঁধছেন লুডমিলা

strange-story-1041

প্রেমের ডানায় ভর করে পেরনো যায় সাত সমুদ্র তেরো নদী৷ সেই প্রেমের টানেই সুদূর ব্রাজিল আর উত্তরবঙ্গের প্রত্যন্ত গ্রামের দূরত্বও ঘুচে যায়৷ দু’বছর আগে ফেসবুকে যোগাযোগ হয়েছিল দুই তরুণ -তরুণীর৷ শেষ পর্যন্ত প্রায় পনেরো হাজার কিলোমিটার পথ উজিয়ে সটান আলিপুরদুয়ারের ঘরঘরিয়ার পাঁচকন্যারপাটের মতো প্রত্যন্ত গ্রামে হাজির হয়েছেন ব্রাজিলিয়ান তরুণী লুডমিলা৷ তাঁর মনের মানুষ ওই গ্রামেরই যুবক সজল রায়৷ আদ্যোপান্ত কৃষক পরিবারের ছেলে৷ বর্তমানে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে এডুকেশন নিয়ে এমএ পড়ছেন সজল৷ দু’জনের আর্থিক অবস্থার কোনও মিল না থাকলেও লুডোর পরিবারও কৃষিজীবী৷ ব্রাজিলের ভিল্লা ভিলায় একটি পূর্ণাঙ্গ খামারবাড়ি রয়েছে ওই তাঁদের৷ বেশ কিছু দিন ধরেই সজলকে লুডো বারবার করে অনুরোধ করছিলেন দুনিয়ার দুই প্রান্তে থেকে কোনও ভাবেই আর দিন কাটছে না তাঁর৷ ১৯ মার্চ খুব ভোরে সজলকে ফোন করেন লুডো৷ জানান , ২২ মার্চের মধ্যে আলিপুরদুয়ারের ঘরঘরিয়ায় আসছেন তিনি৷ প্রথমে বিষয়টি স্বপ্নের মতো মনে হলেও ২২ মার্চ সকালে মুম্বাইয়ের সান্তাক্রুজ বিমানবন্দর থেকে ফের সজলকে ফোন করে লুডমিলা বলেন , তিনি ইতিমধ্যেই ভারতে এসে গিয়েছেন৷ শুনেই ঘোর কাটে সজলের৷ বিষয়টি পরিবারের সবাইকে জানিয়ে বাগডোগরার উদ্দেশে রওনা হন তিনি৷ বেলা সাড়ে তিনটে নাগাদ লুডোর বিমান বাগডোগরায় অবতরণ করে৷ এত দিন ধরে তাঁদের যোগাযোগের মাধ্যম ছিল শুধুই ফেসবুক আর হোয়াটসঅ্যাপ৷ এই প্রথম লুডো আর সজল নিজেদের চাক্ষুষ করলেন৷ সমস্ত বাধা কাটিয়ে বেশ খানিকক্ষণের জন্য বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন তাঁরা৷ সজলের কথায় , ‘মানুষের স্বপ্ন যে এই ভাবে বাস্তবায়িত হতে পারে তা কল্পনা করিনি৷ পাঁচ মিনিট আমরা কোনও কথা বলতে পারিনি৷ ‘ লুডোর পরিষ্কার কথা , ‘আমি সজলকে চিনি৷ আর কিছুই চাই না , তাই এতদূরে অচেনা জায়গায় ছুটে এসেছি৷ সংসার করতে চাই৷ ‘ সমাজবিদ্যার ছাত্রী লুডো৷ সম্ভ্রান্ত কৃষক পরিবারের মেয়ে৷ তিনি জানিয়েছেন , ব্রাজিলে তাঁদের পরিবার একেবারেই আধুনিক প্রযুক্তি নির্ভর পদ্ধতিতে কৃষিকাজ হয়৷ গ্রামে বিদেশিনীর আসার খবর রটে যেতেই মানুষের মেলা লেগে গিয়েছে পাঁচকন্যারপাটের বাড়িতে৷ সবাইকে সামলাতে আর মিষ্টিমুখ করাতে গিয়ে হিমশিম অবস্থা সজলের পরিবারের৷ শুধুমাত্র আশপাশের গ্রামগুলি থেকেই নয় , আলিপুরদুয়ার শহর থেকেও উত্সুক মানুষ ভিড় জমাতে শুরু করেছেন৷ ভাঙা ইংরেজি আর পর্তুগিজ ভাষায় নিজের মনের ভাব অনেক কষ্টে প্রকাশ করেছেন ব্রাজিলের ওই তরুণী৷ কিছু বোঝাতে না পারলেই চোখের কোল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে জল৷ সঙ্গে সব সময়ের জন্য থাকছে প্যাড আর কলম৷ ইংরেজিতে সব কিছু লিখতে পারলেও বলার ক্ষেত্রে ততটা সড়গড় নন লুডো৷ গ্রামে তাঁর একমাত্র ভরসা সজল৷ সজলের পরিবার লুডোকে আলিপুরদুয়ারের কোনও ভালো হোটেলে থাকার প্রস্তাব দিয়েছিল৷ কিন্তু বিনয়ের সঙ্গে তা প্রত্যাখ্যান করছেন তিনি৷ জানিয়েছেন , ‘সজলের ভালোবাসার টানে যখন একবার সব ছেড়ে চলে এসেছি , তখন হোটেল থাকতে যাব কেন ? এই পরিবার , এখানকার আকাশ বাতাসকে একান্তই আপন করে নিতে চাই৷ ‘ তবে ভিল্লা ভিলার আবহাওয়ার সঙ্গে খুব একটা অমিল নেই পাঁচকন্যারপাটের৷ তবে ওই বিদেশিনীর খাওয়া -দাওয়ার বিষয়ে কোনও ভাবেই ঝুঁকি নিতে রাজি নন রায় পরিবার৷ তাঁর জন্য থাকছে মিনারেল ওয়াটার৷ ফলমূলটাই বেশি পছন্দ লুডোর৷ দুপুরে সামান্য ভাত আর সেদ্ধ সব্জি৷ এটাই দৈনিকের মেনু ওই তরুণীর৷ সজল জানিয়েছেন , ‘আমাকে এত বিশ্বাস করে যে সব ছেড়ে চলে আসতে পেরেছে তাঁকে তো যোগ্য মর্যাদা দিতেই হবে৷ খুব তাড়াতাড়ি আমরা বিয়েটা সেরে ফেলতে চাই৷ ‘ আর লুডো অকপটে সকলকে বলছেন , ‘পৃথিবীর বহু দেশ ঘুরছি৷ অনেক মানুষের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে৷ কিন্তু সজলের মতো নির্মল মনের মানুষ কোথাও খুঁজে পাইনি৷ আমাদের পরিবারের তরফেও কোনও আপত্তি নেই৷ গ্রামটার উন্নতি করতে চাই৷ ভবিষ্যতে এখানকার শিশুদের পড়াশোনা নিয়ে কাজ করতে চাই৷ আর এলাকার কৃষকরা যাতে প্রযুক্তি নির্ভর চাষ আবাদ করতে পারেন , সেই দিকটায় বিশেষ ভাবে নজর দেব৷ ‘ সজলের মা প্রমীলা থেকে শুরু করে বাবা খুলেন রায় অথবা ওই গ্রামের বাসিন্দারা মনে প্রাণে মেনে নিয়েছেন এই বিদেশিনী বৌমাকে৷ প্রমীলা জানিয়েছেন , ‘এটা অনেকটা আমাদের কাছে রূপকথার গল্পের মতো৷ স্বচ্ছল পরিবারের একটি মেয়ে কত আশা নিয়ে আমাদের কাছে ছুটে এসেছে কোনও ভাবেই তার অমর্যাদা হতে দেব না৷ আমাদের পরিবার থেকে শুরু করে সমাজ সবাই মিলেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে৷ ‘