মেইন ম্যেনু

মাত্রাতিরিক্ত অহংকার সম্পর্কের অবনতি ঘটায়

বন্ধুত্ব,স্বামী-স্ত্রী, প্রেমিক-প্রেমিকা বা যেকোনো সম্পর্ক শেষ হতে একটি জিনিসই যথেষ্ট। আর সেটি হলো ইগো বা অহম বা অহমিকা। আরো সোজা বাংলায় যে সমস্যার নাম অহংকার। বন্ধুকে হয়তো খুব মিস করছেন, কিন্তু সে ফোন দিল না বলে আপনিও ফোন দিলেন না। বাড়তে থাকল দূরত্ব। এভাবে হয়তো সম্পর্ক শেষের দ্বারপ্রান্তে এসে ঠেকলেন।
আবার সহকর্মীর কোনো কাজে হয়তো খুব বিরক্ত লাগল। কথা বলা বন্ধ করে দিলেন তার সাথে। এতেও সম্পর্ক তিক্ত হতে শুরু করল, এক সময় সম্পর্কটাই আর টিকলো না।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শাহিনূর রহমান বিয়টিকে ব্যাখ্যা দেন এভাবে, ‘ফ্রয়েডের ইগো’ আর ‘বর্তমান সময়ের ইগো’ একটা আরেকটা থেকে আলাদা। ইগো বলতে এখন যা বোঝানো হয়, তা হলো ব্যক্তির আত্মমর্যাদাবোধ অথবা নিজকে আপনি কতটুকু গুরুত্ব দিচ্ছেন বা সম্মান করছেন, সেটি। আপনি যদি ইগোকে ঠিকমত নিয়ন্ত্রণ করতে না পারেন তাহলে ইগোই আপনাকে নিয়ন্ত্রণ করবে। আর এর ফলাফল আমাদের আচরণের জন্য মোটেও ইতিবাচক নয় বলে মনে করেন তিনি।
নিচে কিছু লক্ষণ দেখে আপনি সহজেই বুঝতে পারবেন যে আপনি ইগো দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছেন।
* যখন দেখবেন আপনি অন্যের খুঁত ধরে কিংবা পরচর্চা করে মানসিক প্রশান্তি লাভ করছেন।
* সব সময়েই অন্যের সঙ্গে নিজেকে তুলনা করা, বিশেষ করে যারা আপনার চেয়ে ভালো (দেখতে, বুদ্ধিতে, সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যে কিংবা সম্পদে) কিংবা খারাপ (কম বুদ্ধি, কম সামাজিক মর্যাদা প্রভৃতি)।
* অন্যের ভালো দেখে যদি আপনার হিংসা লাগে।
* কথা বলার সময় অন্যের খোঁজ খবর না নিয়ে নিজের সম্পর্কেই শুধু বলে যাওয়া।
* কোনো কাজে না জেতা পর্যন্ত ওই কাজে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা না করা।
* কোনো কাজে কিংবা খেলায় না জিতলে প্রায়ই মুখ গোমড়া করে থাকা অথচ খেলায় অংশগ্রহণ করে জেতার উপক্রম হয়েছি এটা ভেবে গর্ব না করা।
* সবসময় অবাস্তব লক্ষ্য স্থির করা এবং সে লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হলে নিজেকে কষ্ট দেওয়া।
* নিজের কাজ ঠিক মতো না হলে, অন্যকে দোষারোপ করা।
সব দ্বন্দ্বের কারণ হলো ইগো জানিয়ে মনোবিশেষজ্ঞ শাহিনূর রহমান আরো জানান, কেউ ইগো দিয়ে নিয়ন্ত্রিত হলে বন্ধু-বান্ধব, সহকর্মী এমনকি প্রিয় জীবনসঙ্গীর সাথেও সম্পর্কের অবনতি হতে পারে।
ইগো কীভাবে সমস্যা তৈরি করে এ সম্বন্ধে শাহিনূর রহমানের বক্তব্য :
ইগো সহানুভূতিশীলতা কমিয়ে দেয় : দ্বন্দ্বের সময় ইগো অন্যের খারাপ দিকগুলো সামনে নিয়ে আসে এবং মনে করতে বাধ্য করে যে অন্যেরা তাকে ভুল বুঝছে এবং ব্যক্তিগত ও আবেগীয় আক্রমণ করছে। এরা নিজের ভুলের জন্য দুঃখ প্রকাশ করে না। এতে সহজেই প্রিয়জনদের সাথে সম্পর্কের অবনতি ঘটে।
কাছের মানুষদের দূরে ঠেলে দেয় : ইগো অনেক সময় কিছু ভুল মানুষকে আপনার দিকে প্রলুদ্ধ করে ফেলে, আর সত্যিকারের শুভকাক্সক্ষীদের দূরে সরিয়ে দেয়।
নিজেকে জাহির করা : কথা বলার সময় বেশি ইগো সম্পন্ন ব্যক্তিরা অন্যকে বলার সুযোগ না দিয়ে নিজের সম্পর্কেই বলতে থাকে। যেটা অনেকে কাছে বিরক্তিকর হয়ে দাঁড়ায়। যেটা সম্পর্কের ওপর বিরূপ প্রভাবে ফেলে।
একগুয়েমি তৈরি করে : বেশি মাত্রায় ইগো ব্যক্তির মধ্যে একগুয়েমি তৈরি করে। আর একগুয়েমি ব্যক্তিরা অন্যের কিংবা অভিজ্ঞদের উপদেশ ও কথায় কান না দেওয়ায়, সেসব ব্যক্তিদের সাথে সম্পর্কের ক্ষতি করে এবং ভবিষ্যতের পথনির্দেশনার সুযোগ ও জীবনে সফলতার পথে নিজেই প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে।
ভালবাসা থেকে বঞ্চিত করে : ইগো দিয়ে নিয়ন্ত্রিত ব্যক্তি তাদের জীবনে ভালোবাসা আসার সুযোগ বন্ধ করে দেয়। কেননা তারা কাছের মানুষ, বন্ধু-বান্ধব ও প্রিয়জনদের সাথে সম্পর্কের অবনতি করায় অনেক সময় তারা ভালোবাসা কম পায়।
আবার বেশি ইগোসম্পন্ন ব্যক্তি জীবনের গুরুত্বপূর্ণ কাজের ঝুঁকি নিতে চায় না। যারা ঝুঁকি নিতে চায় না তাদের জীবনের রোমাঞ্চ আসার সম্ভাবনাও কম থাকে।
অযৌক্তিক করে দেয় : সবাই যখন যুক্তি দিয়ে অন্যের ভুল ধরিয়ে দিয়ে, নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে চায় সেখানে অতি ইগোসম্পন্ন ব্যক্তিরা দুর্বল যুক্তি দিয়ে নিজেদের জাহির করতে চায়। অনেক সময়, অহেতুক তর্কে জড়িয়ে পড়ে। এরা যুক্তির পরিবর্তে আবেগ দিয়ে অধিকার প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। এটি অনেক সময় সম্পর্ক নষ্ট করে দেয়।
মাত্রাতিরিক্ত সমালোচনা : সমালোচনা করা ভালো চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। কিন্তু অতি ইগোসম্পন্ন ব্যক্তি সর্বদাই অন্যের অতি কঠোর সমালোচনা ও অতি মাত্রায় অভিযোগ করে। এটা মোটেই ইতিবাচক নয়। এতে বন্ধু কিংবা সহকর্মীর কাছে এরা অপ্রিয় হয়ে যায়।
প্রতিযোগী করে তোলে : বেশি ইগো সম্পন্নরা অন্যের ক্ষতি করে হলেও প্রতিযোগিতায় জয়লাভ করতে চায়। কিংবা সাফল্য পেতে চায়। অন্যের জন্য সবচেয়ে ভালোটা কামনা করা এবং জীবন নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে ইগো নিজেকে বিরত রাখে। এতে অন্যের সাথে তিক্ত সম্পর্কের তৈরি হয়।
তবে একটু সচেতন হলেই আমরা আমাদের ইগোকে পরাস্ত করে নিজের নিয়ন্ত্রণ নিজেই নিতে পারি জানিয়ে ইগো নিয়ন্ত্রণের বেশ কিছু পরামর্শ দিয়েছেন মনোবিশেষজ্ঞ শাহিনূর রহমান।
সচেতন হোন : নিজের ইগোবৃত্তিক আচরণ সম্পর্কে সজাগ থাকা। কখন কীভাবে ইগো আমাদের আচরণে প্রভাব বিস্তার করে তা খেয়াল রাখুন এবং পরবর্তীকালে সে আচরণের যাতে পুনরাবৃত্তি না হয়, সে সম্পর্কে সতর্ক থাকুন।
সত্যকে মেনে নিন : নিজেকে যতটা গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন প্রকৃতপক্ষে আপনি অতটা গুরুত্বপূর্ণ নন এটা মেনে নেওয়া। কেননা, পৃথীবিতে কোনো কিছুই থেমে থাকে না, আপনি না থাকলেও আপনার সেই কাজটা অন্য কেউ ঠিকই করে ফেলবে। অন্যরা আপনার থেকে বেশি স্মার্ট না হলেও তাদের কাজ করার জন্য যথেষ্ট স্মার্ট এটা মেনে নেওয়া।
অন্যকে বোঝার চেষ্টা করুন : নিজের দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে বিবেচনা না করে বিভিন্ন প্রেক্ষাপট থেকে অপরকে বোঝার চেষ্টার প্রতি গুরুত্বারোপ করুন।
অন্যের কথায় ব্যাঘাত না ঘটানো : অন্যের কথা বলার মাঝে নিজের বক্তব্য চাপিয়ে না দিয়ে সময় নিন এবং অন্যকে বলার সুযোগ দিন। অন্যের বক্তব্য শেষ হলে আপনার বক্তব্য উপস্থাপন করুন।
অন্যের সম্পর্কে দ্রুত সিদ্ধান্ত না নেওয়া : অন্যের মতামত ভালোভাবে শুনুন। কোনো রকম সংশয় থাকলে তা দূর করুন। পর্যাপ্ত তথ্য নিয়ে তারপর কারো সম্পর্কে পক্ষপাতহীনভাবে আপনার সিদ্ধান্ত দিন।-এনটিভি