মেইন ম্যেনু

রাজধানীতে প্রতিদিন ভাঙছে ২৬ সংসার : অধিকাংশ স্ত্রীরাই দিচ্ছে স্বামীকে তালাক

রাজধানী ঢাকার শুধুমাত্র সিটি করপোরেশন এলাকায় দৈনিক গড়ে ২৬টি করে তালাক হচ্ছে। তালাক দেওয়ার দিক থেকে এগিয়ে রয়েছেন নারীরা। মোট তালাকের ৭৬ শতাংশই স্ত্রীর মাধ্যমে স্বামীকে দেওয়া হচ্ছে। চলতি বছর ১৯ অক্টোবর পর্যন্ত ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় তালাক দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে মোট ৩ হাজার ৮৫০টি। অন্যদিকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে এই সংখ্যা প্রায় চার হাজার। দৈনিক হিসেবে প্রতিদিন রাজধানীতে প্রায় ২৬ দম্পতির মধ্যে বিচ্ছেদের ঘটনা ঘটছে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের হিসাব মতে, চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে মোট তালাক দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে ৮৭৬টি। এর মধ্যে স্বামীর স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে মাত্র ২১৩টি। আর বাকি ৬৬৩টি তালাক দিয়েছে স্ত্রী।

১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের ৭ (১) ধারা অনুযায়ী, স্বামী স্ত্রীকে মুখে তিনবার তালাক উচ্চারণের পর পরই তালাক দেওয়ার সংবাদটি একটি নোটিশের মাধ্যমে সালিশী কমিটির চেয়ারম্যানকে (স্ত্রী যে স্থানে বসবাস করছে সেখানকার জনপ্রতিনিধি) জানাতে হবে। সেই নোটিশের একটি কপি স্ত্রীকে পাঠাতে স্বামী বাধ্য থাকবেন। কোনো তালাক নোটিশ প্রত্যাহার না করা হলে চেয়ারম্যান বরাবর তালাকের নোটিশ পাঠানোর ৯০ দিন পর তালাক কার্যকর হয়েছে বলে গণ্য করা হয়। তবে তালাক প্রদানের প্রথম ৩০ দিনের মধ্যে সালিশী কমিটির চেয়ারম্যান উভয়পক্ষকে ডেকে সমঝোতার জন্য পুনর্মিলনের চেষ্টা করবেন। যদি তারা সমঝোতায় পৌঁছাতে না পারেন তাহলে ৯০ দিন পর তালাক কার্যকর হয়ে যাবে বলে ধারাটিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে মুসলিম বিবাহ বিচ্ছেদ আইন ১৯৩৯ অনুযায়ী, মুসলিম আইনে বিবাহিত কোনো মহিলা এক বা একাধিক কারণে বিবাহ বিচ্ছেদের আবেদন করতে পারবেন।

কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে-

১. চার বছর পর্যন্ত স্বামীর কোনো খোঁজখবর পাওয়া না গেলে।

২. দুই বছর যাবত স্বামী কর্তৃক অবহেলিত এবং স্বামী ভরণপোষণ দিতে ব্যর্থ হলে।

৩. মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১’র বিধান লঙ্ঘন করে অন্য স্ত্রী গ্রহণ করলে।

৪. স্বামী ৭ বছর বা তার বেশি মেয়াদের জন্য কারাদণ্ডপ্রাপ্ত হলে।

৫. স্বামী কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়া তিন বছর ধরে বিবাহিত দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে।

৬. বিয়ে করার সময় স্বামী পুরুষত্বহীন হলে এবং এই অবস্থা অব্যাহত থাকলে।

৭. দুই বছর ধরে স্বামী অপ্রকৃতিস্থ থাকলে বা, কুষ্ঠ রোগ বা, সংক্রামক যৌন ব্যাধিতে ভুগলে।

৮. ১৮ বছর বয়স হওয়ার আগেই যদি অভিভাবকের মাধ্যমে বিয়ে দেওয়া হয় এবং স্বামী-স্ত্রী সহবাস বা বসবাস না করে তাহলে ১৯ বছর বয়স হওয়ার আগেই এই বিয়ে প্রত্যাখ্যান করলে।

৯. স্ত্রীর প্রতি স্বামী নিষ্ঠুর আচরণ করলে।

এক্ষেত্রে নিষ্ঠুরতা গণ্য হবে,

ক) স্বভাবগতভাবে তাকে মারপিট বা শারীরিক নির্যাতন ছাড়াও নিষ্ঠুর আচরণ করে স্ত্রীর জীবন দুর্বিষহ করে তুললে।

খ) খারাপ চরিত্রের মহিলাদের সঙ্গে মেলামেশা করলে বা অনৈতিক জীবনযাপন করলে।

গ) স্ত্রীকে অনৈতিক জীবনযাপানে বাধ্য করার চেষ্টা করলে।

ঘ) স্ত্রীর সম্পত্তিতে হস্তক্ষেপ করলে বা তার স্ত্রীর সম্পত্তির অধিকারে বাধা প্রদান করলে।

ঙ) স্ত্রীর ধর্মকর্ম পালনে বাধা দিলে।

চ) একাধিক স্ত্রী থাকলে পবিত্র কোরআনের বিধান মোতাবেক সমান মর্যাদা দিতে ব্যর্থ হলে।

এসব নিষ্ঠুর আচরণের জন্য কাবিননামায় তালাকের ক্ষমতা না থাকা সত্বেও স্ত্রী তার স্বামীকে তালাক দিতে পারবেন।

ঢাকা দুই সিটি করপোরেশনে পাঠানো তালাকের নোটিশের বিপরীতে সমঝোতার মাধ্যমে তালাক প্রত্যাহারের সংখ্যা খুবই কম বলে জানিয়েছেন করপোরেশনের একাধিক আঞ্চলিক কর্মকর্তা।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অঞ্চল-১ এর নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সানাউল হক বলেন, ‘ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আওতাভূক্ত এলাকার তালাকের নোটিশগুলো প্রথমে নগর ভবনে আসে। সেখান থেকে তালাক প্রাপ্তের ঠিকানার ভিত্তিতে অঞ্চল অফিসগুলোতে ভাগ করে দেওয়া হয়। আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা সালিশী কমিটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। সেই হিসেবে আমি অঞ্চল-১ এর সালিশী কমিটির চেয়ারম্যান। অধিকাংশ ক্ষেত্রে আমরা দেখি, প্রায় শতভাগ তালাক কার্যকর হয়ে যায়। সালিশী কমিটির দায়িত্ব হিসেবে আমরা উভয় পক্ষকে আমন্ত্রণ জানাই সমঝোতার জন্য। কিন্তু সাড়া পাওয়ার সংখ্যা খুবই কম।’

তিনি বলেন, ‘গত কয়েক বছরের তালাকের নোটিশের হিসাব অনুযায়ী রাজধানীতে স্ত্রীর মাধ্যমে স্বামীকে বেশি তালাক দেওয়া হচ্ছে। আর এক্ষেত্রে সালিশী কমিটির সমঝোতার আগেই দেখা যায় মামলার পর্যায়ে গড়িয়ে যায়। ফলে আশানুরূপ কোনো সমঝোতায় কেউ পৌঁছাতে পারে না।’

এ ব্যাপারে মুসলিম পারিবারিক আইন ও তালাকের উপরে দীর্ঘ দিন কাজ করা ঢাকা সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট দিলরুবা সরমিন বলেন, ‘আমার কাজের অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি বর্তমান সময়ে স্ত্রী কর্তৃক স্বামীকে তালাক দেওয়ার সংখ্যাই বেশি। আর এসব তালাকের ক্ষেত্রে স্বামীর বিরুদ্ধে প্রধান অভিযোগগুলো হলো, নির্যাতন, যৌতুক, বহুবিবাহ, ভরণপোষণ না দেওয়া এবং পরকিয়া সংক্রান্ত সমস্যা। আসলে তালাকের ক্ষেত্রে এসব অভিযোগের সত্যতা প্রমাণের কোনো সুযোগ নেই। যদি কেউ চান তিনি তার স্বামীর সঙ্গে বা কেউ তার স্ত্রীর সঙ্গে আর সংসার করবেন না। তাহলে আইনজীবী বা আইনের কিছুই করার নাই। পারিবারিকভাবে যদি সমঝোতায় না পৌঁছাতে পারে তাহলে আইন, আদালত দিয়ে কেউ কাউকে সংসার করতে বাধ্য করতে পারেন না।খবর পরিবর্তনের।