মেইন ম্যেনু

সাম্প্রদায়িক সংঘাতে চিন্তিত আওয়ামী লীগ

দলের মধ্যে ব্যক্তিস্বার্থের দ্বন্দ্ব নিয়ে চিন্তিত আওয়ামী লীগ। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে হিন্দু সম্প্রদায় ও গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে সাঁওতালদের ওপর সহিংসতার পেছনে দলের নেতাদের ইন্ধনের অভিযোগ এবং স্বার্থের দ্বন্দ্বের বিষয়টিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এ দুটি ঘটনায় একধরনের চাপে পড়েছে দল ও সরকার। ঘটনা দুটি অসাম্প্রদায়িক আদর্শের মূলে আঘাত বলে মনে করছে আওয়ামী লীগ।

নাসিরনগরে সাম্প্রদায়িক হামলা ও গাইবান্ধায় সাঁওতাল সম্প্রদায়ের তিনজনের প্রাণহানির বিষয়ে সরকারের দুজন মন্ত্রী, আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর দুজন সদস্যসহ কেন্দ্রীয় কমিটির ছয়জনের সঙ্গে এই প্রতিবেদকের কথা হয়। তাঁরা বলেন, সরকার ও দলের ভাবনা হচ্ছে এসব ঘটনার পেছনে দলের নেতাদের সংশ্লিষ্টতার যে অভিযোগ এসেছে, তা ব্যক্তিস্বার্থের কারণে। অতীতেও টেন্ডারবাজিসহ নানা ঘটনায় এমনটা দেখা গেছে। ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে। তবে সাম্প্রদায়িক সংঘাতের মতো গুরুতর বিষয়ে দলের নেতাদের ইন্ধনের খবর তাঁদের চিন্তায় ফেলেছে। এসব অপরাধীর দায় দল নেবে না। ইতিমধ্যে সরকার আইনি ব্যবস্থা নিয়েছে। সাংগঠনিক ব্যবস্থাও নেওয়া হবে।

আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল একাধিক সূত্র জানায়, সরকার ও দলের ভেতরেই আলোচনা আছে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী ছায়েদুল হকের সঙ্গে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাংসদ র আ ম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরীর দ্বন্দ্বের কারণে নাসিরনগরের ঘটনাটি বড় হয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে দলীয় প্রার্থীর মনোনয়ন দেওয়া নিয়ে মূলত মন্ত্রীর সঙ্গে এই সাংসদের দ্বন্দ্বের সূত্রপাত।

সরকারি সূত্র বলছে, নাসিরনগরে হিন্দুদের ওপর ধারাবাহিক হামলার পেছনে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দল কাজ করেছে—এটা পুলিশের তদন্তেও কিছুটা এসেছে। এই প্রতিবেদন এখনো প্রকাশ না পেলেও ইতিমধ্যে একাধিক গণমাধ্যমে এ-সংক্রান্ত খবর বেরিয়েছে।

সরকারের শরিক ১৪ দল থেকেও এসব ঘটনায় আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতা-কর্মীদের জড়িত থাকার প্রসঙ্গটি বিভিন্নভাবে তোলা হয়েছে। সাংগঠনিক চ্যানেলে খোঁজ নিয়ে আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল একাধিক নেতা নিশ্চিত হয়েছেন যে নাসিরনগরের ঘটনা বড় হয়েছে দলের কোন্দলের কারণে।

এরই পরিপ্রেক্ষিতে দলীয় সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৯ নভেম্বর গণভবনে দলের কয়েকজন নেতার কাছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি র আ ম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরীর বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। মোকতাদির চৌধুরীর বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলেন বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।

নাসিরনগরের ঘটনায় ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রসহ দেশে-বিদেশে বিক্ষোভ হয়েছে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী ছায়েদুল হকের পদত্যাগ চেয়ে ঢাকায় বিক্ষোভ হয়েছে। এটা সরকার ও দলকে অস্বস্তিতে ফেলেছে।

জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেন, আওয়ামী লীগ ও সরকার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির জন্য সবকিছুই করছে এবং ভবিষ্যতেও করবে। তাঁর দাবি, সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার জন্য একটা চক্র পেছনে কলকাঠি নাড়ছে। তিনি বলেন, এ ক্ষেত্রে দলের কেউ যদি ব্যক্তিস্বার্থ উদ্ধারের লক্ষ্যে জড়িয়ে পড়ে, তাকে ছাড় দেওয়া হবে না।

নাসিরনগরের স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, মন্ত্রী ছায়েদুল হক গত এপ্রিলে অনুষ্ঠিত ইউপি নির্বাচনে হরিপুরে চেয়ারম্যান পদে মনোনয়ন দিয়েছিলেন ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ফারুক মিয়াকে। কিন্তু তাঁর বাবা যুদ্ধাপরাধী, এমন অভিযোগ তুলে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোকতাদির চৌধুরী মনোনয়ন দেন ব্যবসায়ী ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের সদস্য দেওয়ান আতিকুর রহমানকে। ওই অবস্থায় দলীয় মনোনয়নবঞ্চিত হয়ে ফারুক মিয়া সমর্থন দেন স্বতন্ত্র প্রার্থী রাশেদ চৌধুরীকে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আতিকুর রহমান জয়ী হন। এরপর থেকেই ফারুক মন্ত্রীর লোক ও আতিকুর সাংসদ মোকতাদিরের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিতি পান। ছায়েদুল হক জেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য। ইউপি নির্বাচন নিয়ে দ্বন্দ্বের কারণে তাঁকে অব্যাহতি দেওয়ার জন্য কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের কাছে সুপারিশ পাঠান জেলা সভাপতি মোকতাদির চৌধুরী। সর্বশেষ হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার ঘটনায় আতিকুরের বিরুদ্ধে ইন্ধনের অভিযোগ উঠেছে। এর বাইরে স্থানীয় একটি বিলের নিয়ন্ত্রণ নিয়েও দুই পক্ষের মধ্যে দ্বন্দ্ব আছে।

অবশ্য আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল নেতাদের কেউ কেউ মন্ত্রী ছায়েদুল হকেরও সমালোচনা করছেন। ওই নেতারা বলেন, নিজের নির্বাচনী এলাকায় হিন্দুদের ওপর হামলার পর মন্ত্রী তাৎক্ষণিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের পাশে দাঁড়াননি। চার দিন পর তিনি এলাকায় গেছেন। এ ছাড়া নিজ নির্বাচনী এলাকায় বিপুলসংখ্যক হিন্দু সম্প্রদায়ের বসবাস সত্ত্বেও তাদের বিষয়ে মন্ত্রীর উদাসীনতা রয়েছে বলেও মনে করেন অনেক নেতা।

দলীয় সূত্র জানায়, নাসিরনগরের ঘটনার পর প্রধানমন্ত্রী সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নেতাদের একাধিকবার গণভবনে ডেকে বিষয়টি বোঝার চেষ্টা করেছেন। এরপর দলের বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের নেতাদের সমন্বয়ে আলাদা দল পাঠিয়েছেন। সর্বশেষ দুটি গোয়েন্দা সংস্থাকে অনুসন্ধান করে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।

আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় দুজন নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, দল সাত বছর ধরে ক্ষমতায়। তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত নানা স্বার্থের দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়েছে। দলীয়ভাবে পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন করার কারণে বিভক্তি চরমে পৌঁছেছে। জমি দখল থেকে শুরু করে সরকারি উন্নয়নকাজের টেন্ডার দখল—সবকিছুতেই পক্ষ-বিপক্ষ এখন আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরাই। এসব নিয়ে কখনো নিজেদের দুই পক্ষের মধ্যে মারামারি হয়। কখনো চলে ‘প্রক্সি ওয়ার’ (ছায়াযুদ্ধ)। এক পক্ষ বিপদে পড়লে আরেক পক্ষ ঘায়েল করার কাজে নেমে পড়ে।

গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে সাঁওতাল অধ্যুষিত দুটি গ্রামে সহিংসতার পর আওয়ামী লীগের দুজন সাংগঠনিক সম্পাদক বি এম মোজাম্মেল হক, খালিদ মাহমুদ চৌধুরীসহ কেন্দ্রীয় নেতাদের একটি দল রোববার ওই এলাকা পরিদর্শন করে। দলটির সদস্যরা গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার সাপমারা ইউনিয়নের মাদারপুর গির্জার সামনে এক সমাবেশে অংশ নেন। সেখানে সাঁওতালরা প্রকাশ্যে অভিযোগ করেছে, তাদের ওপর সহিংসতায় সরকারদলীয় সাংসদ আবুল কালাম আজাদ ও স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান শাকিল আহমেদের ইন্ধন রয়েছে। এ সময় জাতীয় আদিবাসী পরিষদ, জাতীয় আদিবাসী ফোরাম ও বিশিষ্ট নাগরিকদের দুটি প্রতিনিধিদলও উপস্থিত ছিল।

কেন্দ্রীয় কমিটির যে দলটি সাঁওতাল এলাকা পরিদর্শনে যায়, ওই দলের দুজন নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, স্থানীয় আওয়ামী লীগের একাংশ গাইবান্ধার ঘটনায় সুযোগ নেওয়ার চেষ্টায় ছিল। তবে সাংসদের বিরুদ্ধে ইন্ধনের অভিযোগের ভিত্তি তাঁরা পাননি। এই দুই নেতার দাবি, সাঁওতালরা মনে করছে, সাংসদের পরামর্শ ছাড়া পুলিশ গুলি করত না। এ জন্যই তারা সাংসদের বিষয়ে অভিযোগ করছে। এ ছাড়া এলাকাটি জামায়াত অধ্যুষিত। তাদের ইন্ধনও থাকতে পারে।

আবুল কালাম আজাদ গত নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন না পেয়ে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়ে জয়ী হন। পরে তিনি দলের উপজেলা শাখার সভাপতি হন। স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান শাকিল আহমেদও বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে জয়ী হন। তিনি উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি। ফলে ওই এলাকায় দলে বেশ বিভাজন রয়েছে।

সাঁওতালদের অভিযোগ, চিনিকলের সঙ্গে জমি নিয়ে বিরোধ মেটাতে সাংসদ আবুল কালাম ও ইউপি চেয়ারম্যান শাকিলের সহযোগিতায় তাঁরা চার বছর আগে আন্দোলন শুরু করেন। কিন্তু সাংসদ ও চেয়ারম্যান পরে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে সহিংস ঘটনায় ইন্ধন জুগিয়েছেন। এ কারণে সাঁওতালদের বাড়িঘর পুড়িয়ে, তাদের হত্যা করে উল্টো সাঁওতালদের বিরুদ্ধেই মামলা হয়েছে বলে তাঁরা মনে করেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আওয়ামী লীগের সম্পাদকমণ্ডলীর একজন সদস্য বলেন, সাম্প্রদায়িক সহিংসতার পেছনে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বৈষয়িক লাভের বিষয়টি কাজ করে। এর পেছনে ইন্ধনও থাকে। এখন ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও গাইবান্ধার ঘটনা আওয়ামী লীগের জন্য অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।খবর প্রথম আলো’র।