মেইন ম্যেনু

সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষার বাতিঘর

habiganj_220161024091548

হবিগঞ্জ জেলার বাহুবল ও চুনারুঘাট উপজেলায় টিলা চা বাগান আর সমতল ভূমি। অসাধারণ নান্দনিক দৃশ্যসংবলিত চা-বাগান অধ্যুষিত এই দুটি উপজেলায় সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের লেখাপড়া গ্রহণ করা কঠিন ছিল। আজ সেখানে আলো ছড়িয়েছে ‘শিখন স্কুল’ নামের একটি উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা উদ্যোগ।

শিক্ষাবঞ্চিত শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষা অর্জনে ২০১৩ সাল থেকে চালু হয় শিখন স্কুল। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের অর্থায়নে ‘সেভ দ্য চিলড্রেন’ এর সহায়তায় বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা আরডিআরএস বাংলাদেশ এই উদ্যোগ নেয়। বাহুবল ও চুনারুঘাটের সকল ইউনিয়নের পিছিয়ে পড়া, যোগাযোগবিচ্ছিন্ন এলাকার ঝরে পড়া ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের সুশিক্ষা নিশ্চিতের অগ্রাধিকার দিয়ে চালু করা হয় শিখন স্কুল। এসব স্কুলে ভর্তি হয়ে বিনা মূল্যে পাঠগ্রহণ করে আলোকিত হচ্ছে এখানের সুবিধাবঞ্চিত শিশুরা।

সংস্থার দায়িত্বপ্রাপ্ত ফিল্ড কো-অর্ডিনেটর আব্দুর রব জানান, বাহুবল ও চুনারুঘাট উপজেলার ১১৯টি গ্রামে ১৫৪টি শিখন স্কুল চালু রয়েছে। এর মধ্যে বর্তমানে দ্বিতীয় শ্রেণির ৪৯টি এবং পঞ্চম শ্রেণির ১০৫টি শিখন স্কুল আছে। দ্বিতীয় শ্রেণিতে শিক্ষার্থী সংখ্যা ১ হাজার ৫১০। যারা এ বছর কর্মসূচির মেয়াদ শেষে নিকটবর্তী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তি হবে। আর পঞ্চম শ্রেণিতে শিক্ষার্থী সংখ্যা ২ হাজার ৭৭১, যারা এ বছর প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনীতে অংশগ্রহণ করছে।

আরডিআরএস বাংলাদেশ চলতি বছরে সরকারি শিক্ষা অফিসের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করে বছরের শুরুতে অর্থাৎ ১ জানুয়ারিতে দ্বিতীয় ও পঞ্চম শ্রেণির বই শিশুদের হাতে তুলে দিতে সক্ষম হয়েছিল। সংস্থা থেকে নিয়মিত যোগাযোগের মাধ্যমে বিভিন্ন সময়ে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার, উপজেলা নির্বাহী অফিসার, উপজেলা শিক্ষা অফিসারসহ বিভিন্ন সরকারি স্কুলের শিক্ষকেরা নিয়মিত কর্মসূচি পরিদর্শন করে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন।

শিখন কর্মসূচির বাহুবল ফিল্ড অফিসের মাঠ সমন্বয়কারী আব্দুর রব জানান, প্রতিটি স্কুল পরিচালনার জন্য রয়েছে একটি করে পরিচালনা কমিটি। ওই কমিটি প্রতি মাসে স্কুল উন্নয়নের জন্য একটি সভা করে থাকেন। আবার অভিভাবকদের সচেতন করার লক্ষ্যে প্রতি মাসে সব স্কুলে একটি করে অভিভাবক সভা করা হয়।

এ ছাড়া শিশুদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য নিয়মিত হাত ধোয়ার জন্য সাবান, দৃষ্টিশক্তি পরীক্ষা, আয়রন ট্যাবলেট, ভিটামিন এ ক্যাপসুল ও কৃমিনাশক ট্যাবলেট সংশ্লিষ্ট সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সঙ্গে যোগাযোগ করে যথাসময়ে খাওয়ানো নিশ্চিত করা হয়।

পড়ালেখার পাশাপাশি কর্মসূচির সহায়তায় খেলাধুলা, আনন্দ বিনোদন, বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক দিবসসমূহ পালন করা হয়। সপ্তাহে এক দিন ছবি আঁকা, কারুকাজ ও সাংস্কৃতিক ক্লাস নেওয়া হয়। যা শিশুদের মননশীলতার বিকাশ ঘটাতে বিরাট ভূমিকা রাখছে। নিয়মিত বইয়ের পাশাপাশি অনেক বিখ্যাত লেখকদের শিশুতোষ বই, বিভিন্ন ধরনের গল্পের বই পড়ার সুযোগ পাচ্ছে শিশুরা, যা শহরের অনেক নামিদামি স্কুলের শিশুরাও পড়ার সুযোগ পায় না।

তিনি বলেন, ‘চা-বাগানগুলোতে অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করার ফলে বিশালসংখ্যক পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর প্রাথমিক শিক্ষায় অভিগম্যতা বৃদ্ধি পেয়েছে। কিছু বাগানে এনজিও পরিচালিত স্কুল থাকলেও তা আছে শুধু যোগাযোগ ভালো এমন জায়গায় কিন্তু শিখন কর্মসূচি প্রায় সব বাগানের স্কুলগুলো প্রতিষ্ঠিত হয়েছে প্রত্যন্ত টিলায়।’

শিখন স্কুল পরিদর্শনকালে দেখা যায়, কমিউনিটি কর্তৃক প্রদত্ত একটি উপযুক্ত ঘরে সংস্থা থেকে সরবরাহকৃত উপকরণের মাধ্যমে আনন্দদায়ক পরিবেশে ৩০ জন শিশু লেখাপড়া করছে। প্রতিটি স্কুলে স্থানীয় এলাকা থেকে এসএসসি পাস একজন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষিকা যত্নসহকারে ক্লাস নিচ্ছেন। সংস্থা থেকে শিশুদের বই, খাতা, কলম, বিনা মূল্যে দেওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের উন্নত শিক্ষা উপকরণ ব্যবহার করে শিশুরা পড়ালেখা শিখছে, যা বিচ্ছিন্ন একটি অজপাড়াগাঁয়ে কল্পনাও করা যায় না।

আলাপ করলে অভিভাবকরা জানান, তাদের শিশুরা স্কুলের অভাবে লেখাপড়া থেকে বঞ্চিত ছিল। শিখন কর্মসূচি আসার ফলে তাদের শিশুরা এ পর্যন্ত পড়ালেখার সুযোগ পেয়েছে। শিশুরা নিয়মিত শিক্ষার বাতিঘরে গিয়ে সঠিকপথে আলোকিত হচ্ছে।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো. নুর ইসলাম জানান, সরকারি বিদ্যালয়ের পাশাপাশি শিশুদের মেধা বিকাশে কাজ করছে শিখন স্কুল।