মেইন ম্যেনু

স্কুলের ঠিকানায় ঘর নেই, শিক্ষক নেই, শিক্ষার্থী নেই; আছে বৃক্ষ বাগান

image-9571

শিক্ষক নেই, শিক্ষার্থী নেই, জমি নেই, ঘর নেই, আছে কমিটি ও স্কুল। তবে খাতা-কলমে। কুড়িগ্রামের রৌমারীতে এ রকম অস্তিত্বহীন স্কুল আছে অন্তত ডজন খানেক। সব বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণের সরকারি আশ্বাসে শিক্ষা অফিসের একশ্রেণির দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীর মদদে স্থানীয় কিছু চক্র এই স্কুল-বাণিজ্য খুলে বসে এমনই একটি অস্তিত্বহীন স্কুলের নাম ওকড়াকান্দা বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। সরকারি ঘরেও এর নাম আছে। পিএসসিতে গোটা কয়েক ভাড়া করা শিক্ষার্থী পরীক্ষা দেয়। কিন্তু স্কুলের ঠিকানায় ঘর নেই, শিক্ষক নেই, শিক্ষার্থী নেই। আছে বৃক্ষ বাগান।

অভিযোগের তীর রৌমারী উপজেলা শিক্ষা অফিসের সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম ও উচ্চমান সহকারী কাম হিসাবরক্ষক (ইউডিএ) আবুল হাশেমের দিকে। তাদের বদৌলতে নাকি উপজেলায় খাতা-কলমে বিদ্যমান এমন আরও অনেক অস্তিত্বহীন ও ভুঁইফোঁড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। আর তাতে বাণিজ্য হয়েছে লাখ লাখ টাকা। এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে ওকড়াকান্দা বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, শিমলাকান্দি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, যাদুরচর চাক্তাবাড়ী বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, এসব কাগুজে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখতে সব ধরনের সহযোগিতা করছে উপজেলা শিক্ষা অফিস।

জানা গেছে. ২০০৩ সালে উপজেলার ওকড়াকান্দা গ্রামের দারাজ উদ্দিন নামের এক ব্যক্তি ৩৩ শতাংশ জমি ওকড়াকান্দা বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নামে ওয়াকফ করে দেন। পরে জমিদাতা দারাজ উদ্দিনের মৃত্যু হলে তার সম্পত্তি ভাগ-বাটোয়ারা হয় সন্তানদের মধ্যে। স্কুলে দান করা ওই ৩৩ শতাংশ জমি পড়ে দারাজ উদ্দিনের ছেলে আব্দুস সালামের ভাগে। দীর্ঘদিনেও স্কুলের কার্যক্রম চালু না হলে আব্দুস সালাম ওই জমির এক অংশে বসতি স্থাপন ও বাকি অংশে বিভিন্ন প্রজাতির গাছ লাগান।

সম্প্রতি ওই স্কুলের নামে মিলন মিয়া (রোল নম্বর ১০৬৮), তোহা মিয়া (রোল ১০৬৯), মনি আক্তার (রোল ১০৭০), মিতা পারভীন (রোল ১০৭১) ও দিশা মনি (রোল ১০৭২) নামের পাঁচ পরীক্ষার্থী শৌলমারী এমআর উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্র থেকে চলতি পিএসসি পরীক্ষায় অংশ নিলে বেরিয়ে আসে থলের বিড়াল। ওই পরীক্ষার্থীরা এমআর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী বলে স্বীকার করেছেন স্কুলের প্রধান শিক্ষক সাইদুর রহমান।

জমির মালিক আব্দুস সালাম খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, কে বা কারা খাতায় কলমে স্কুলটি জারি রেখে চলেছেন। আর এ কাজে সহযোগিতা করছেন রৌমারী উপজেলা শিক্ষা অফিসের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী। এ নিয়ে গত বৃহস্পতিবার (২৪ নভেম্বর) রৌমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে একটি লিখিত অভিযোগ দেন আব্দুস সালাম। অভিযোগে তিনি বলেন, ওই জায়গায় স্কুলের কোনো অস্তিত্ব নেই। শিক্ষা অফিসসহ এর সঙ্গে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন তিনি।

রবিবার সকালে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, উপজেলার শৌলমারী ইউনিয়নের ওকড়াকান্দা এলাকায় কথিত ওই স্কুলের জমিতে বিভিন্ন প্রজাতির গাছের বাগান। বাগানের পূর্ব পাশে ওকড়াকান্দা টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজ নামের একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। বাগানের পশ্চিম অংশে কয়েকটি বসতঘর।

সেখানে কথা হয় ওই জমির মালিক আব্দুস সালামের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমার বাবা স্কুলঘর তোলার জন্য জমি দান করলেও সেখানে কোনো প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়নি। তাই বছর পাঁচেক আগে ওই জায়গায় গাছ রোপণ করি এবং বসতঘর তুলে বাস করছি।’ সেখানে ওই নামে কোনো স্কুল নেই বলে জানান এলাকার আলতাফ হোসেন, জাকিরুল ইসলাম, আব্দুল করিমসহ অনেকে।

এ ব্যাপারে উপজেলার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত শিক্ষা কর্মকর্তা নজরুল ইসলামের সঙ্গে কথা বললে তিনি বলেন, রৌমারীতে এখন ১৭টি এমন স্কুল রয়েছে। এগুলো প্রাথমিকভাবে যাচাই করার জন্য দায়িত্ব পালন করেন শিক্ষা অফিসের উচ্চমান সহকারী কাম হিসাবরক্ষক (ইউডিএ) আবুল হাশেম। তিনি তথ্য দেয়ার পর আমরা এটা মিনিস্ট্রিতে পাঠিয়েছি।’ তবে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেন তিনি।