মেইন ম্যেনু

‘হামলা হয় সংসদ সদস্যের নির্দেশে’

মুক্তিযোদ্ধা মুক্তার আহমেদ মৃধা। যিনি দেশের মানুষকে রক্ষার জন্য জীবনের মায়া ত্যাগ করে একাত্তরে স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। হাতে তুলে নিয়েছিলেন অস্ত্র।

তিনি এদেশের স্বাধীনতার জন্য যে হাত দিয়ে শত্রুকে পরাস্ত করেছেন, সেই হাতই ভেঙে দিয়েছে এই স্বাধীন দেশের কিছু মানুষ। একটি ওষুধের দোকানে বসে ইনস্যুলিনের অ্যাম্পুল কিনে নিয়ে তা পকেটে রাখছিলেন। এসময় অতর্কিতে তার উপর হামলা চালায় স্থানীয় আওয়ামী লীগের কয়েকজন সন্ত্রাসী নেতাকর্মী।

ঝিনাইদহের শৈলকুপা আওয়ামী লীগের প্রবীন নেতা ও মুক্তিযোদ্ধা মুক্তার আহমেদ মৃধা এখন হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে যন্ত্রণায় ছটফট করছেন। তার ডান হাতে এ পর্যন্ত দুই দফায় অস্ত্রোপচার করা হয়েছে।

শুধু ডান হাত নয়, আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসী নেতাকর্মীরা তাঁর বাম পাও ভেঙে দিয়েছেন। হাসপাতালের বিছানা আর তাঁর ভাল লাগছে না। বলছিলেন, ‘যদি পা না ভাঙতো তাহলে অন্তত হেঁটে চলে বেড়াতে পারতাম। পা’টাও ভেঙে দিলো!’

হামলার সময় তাকে রক্ষা করতে তার ছেলে গোলাম মোর্শেদ মৃধা এগিয়ে আসেন। এসময় হামলাকারীরা মোর্শেদেরও দুই পা ভেঙে দেয়।

মুক্তিযোদ্ধা মুক্তার আহমেদ মৃধা বলেন, ‘স্থানীয় সংসদ সদস্য আব্দুল হাইয়ের নির্দেশে আমার উপর এই হামলা চালানো হয়েছে। ঝিনাইদাহ-১ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল হাই, তার পিএস আব্দুল হাকিম, শৈলকুপা উপজেলা চেয়ারম্যান শিকদার মোশাররফ হোসেন সোনা ও ভাইস চেয়ারম্যান শামীম মোল্লা- এই কয়েকজন ওই এলাকার টেন্ডার নিয়ন্ত্রন করেন। তাদের বাইরে কেউ কাজ পায় না। তারা সিস্টেমে কাজ নিয়ে কমিশনে বিক্রি করে দেয়। সম্প্রতি রাস্তা রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতের চারটি কাজে আমি টেন্ডার জমা দেই এবং কাজ পেয়ে যাই। তারা টেন্ডার না পাওয়ার কারণে আমার উপর ক্ষিপ্ত হয়। যে কারণে আমার উপর হামলা চালানো হয়।’

এই মুক্তিযোদ্ধা বলেন, ‘গড় আয়ু হিসেবে হয়তো আর ১০ থেকে ১২ বছর এ দেশের মুক্তিযোদ্ধারা বাঁচবেন। সে পর্যন্ত না জানি আর কতো মুক্তিযোদ্ধাকে এভাবে হামলার শিকার হতে হয়। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে আমাকে এভাবে নির্যাতন করা হল। যাদের জন্য দেশ স্বাধীন করলাম, জীবন বাজী রাখলাম, তারাই নির্মমভাবে হাত-পা ভেঙে দিলো।’

তিনি আরো বলেন, ‘আওয়ামী লীগের জন্য এখন সবচেয়ে বড় সমস্যা ‘নব্য আওয়ামী লীগ’। এরা খুব ভয়াবহ।’ তাঁর উপর যারা হামলা চালিয়েছে তিনি তাদেরকে নব্য আওয়ামী লীগের লোক বলে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, ‘এদের পূর্ব পুরুষ কখনো আওয়ামী লীগ করেনি। এখন নিজেদের সুবিধার জন্য হঠাৎ করে তারা মস্ত বড় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী বনে গেছে।’

মুক্তার আহমেদ গত ১৮ অক্টোবর শৈলকুপার কবিরপুর বাজারের জাকির ফার্মেসিতে বসে ছিলেন। সিসি টিভির ফুটেজে দেখা যায়, সন্ধ্যা ৬টা ৪৩ মিনিটের দিকে অতর্কিতে তার ওপর হামলা চালায় তিন যুবক এবং নির্দয়ভাবে পেটাতে থাকে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে দুই জন এসে তাদের প্রতিরোধ করার চেষ্টা করে। এদের মধ্যে একজন মুক্তার আহমেদের ছেলে গোলাম মোর্শেদ মৃধা। তাকে হামলাকারীরা দোকানের বাইরে নিয়ে যায় এবং দুই পা ভেঙে দেয়।

হামলার পর মুক্তার আহমেদ ও তার ছেলেকে উদ্ধার করে প্রথমে শৈলকুপা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। সেখান থেকে ঝিনাইদহ সদর হাসপাতলে নেওয়া হয়। এরপর রাতেই ঢাকায় পঙ্গু হাসপাতলে নিয়ে আসা হয়। সেখানে সিট না পাওয়ায় ১৯ অক্টোবর রাজধানীর আরেকটি হাসপাতলে ভর্তি করা হয়। সেখানেই তিনি চিকিৎসাধীন রয়েছেন। বুধবার এই হাসপাতালে তাঁর ডান হাতে দ্বিতীয় দফায় অস্ত্রোপচার করা হয়েছে।

এখানে তার ছেলে-মেয়ে তাকে দেখাশুনা করছেন। তারা বাবার উপর হামলাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শান্তির দাবি জানিয়েছেন। মুক্তার আহমেদের ছেলে সাজল মৃধা জানান, বুধবার বেলা সাড়ে ৩টার দিকে অস্ত্রোপচারের জন্য অপারেশন থিয়েটারে নেওয়া হয়। বিকাল সাড়ে ৫টায় বের করা হয়।

ঘটনার পর দিন ১৯ অক্টোবর মুক্তার আহমেদ মৃধার বড় ছেলে সুমন মৃধা বাদী হয়ে উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান ও যুবলীগের সভাপতি, উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি, যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক ও ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকসহ ১০ জনকে আসামি করে থানায় মামলা দায়ের করেন।

আসামিরা হলেন, মো. হাকিম (৪৮), শামীম মোল্লা (৪০), আশরাফুল এমপি (২৮), সুমন (২৮), সিহাব মোল্লা (৩৮), রিপন মোল্লা (৩৫), শাওন শিকদার (৩০), কর্নেল (৩৫) ও শামীম জোয়াদ্দার।

শৈলকুপা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. তরিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা দুইজনকে গ্রেফতার করে আদালতে হাজির করেছিলাম। আদালত থেকে তারা জামিনে ছাড়া পেয়েছে। এছাড়া অন্য আসামিরাও জামিনে আছে।

এ ঘটনায় এ পর্যন্ত দল থেকে চারজনকে বহিস্কার করেছে আওয়ামী লীগ। হামলাকারীদের বিচারের দাবিতে বৃহস্পতিবার জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা সন্তানদের মানববন্ধন করার কর্মসূচি রয়েছে।

এদিকে ঝিনাইদহ-১ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল হাই ঝিনাইদহ প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে জানিয়েছেন, তিনি এ ঘটনার সাথে জড়িত নন।