মেইন ম্যেনু

১৫ জঙ্গি অর্থদাতাকে খুঁজছে র‌্যাব

pq018

১৫ জঙ্গি অর্থদাতাকে খুঁজছে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)।তাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট তথ্য প্রমাণ হাতে পাওয়ার পরই এমন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এদের মধ্যে ৮ জনের নামের তালিকা রয়েছে র‌্যাবের হাতে।

এরইমধ্যে তারা বিভিন্ন সময়ে ২৮ লাখ টাকা জঙ্গিদের হাতে তুলে দেয়। ধারণা করা হচ্ছে এসব টাকা নাশকতা ও ভেঙে পড়া নতুন জেএমবির নেটওয়ার্ক সচল করা কাজে ব্যয় করা হয়েছে। বুধবার রাতে র‌্যাবের হাতে গ্রেফতার ৫ জঙ্গিকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

র‌্যাবের আইন ও গনমাধ্যেম শাখার পরিচালক মুফতি মাহমুদ খান জানান, বুধবার রাতে আদাবর ও উত্তরা এলাকায় অভিযান চালিয়ে ৫ জঙ্গিকে গ্রেফতার করা হয়। এরপর তাদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জঙ্গি সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। এরমধ্যে জঙ্গি অর্থদাতারা অন্যতম। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তাদের কাছ থেকে ৮ জনের সম্পর্কে জানা গেছে। ধারণা করা হচ্ছে এগুলো তাদের সাংগঠনিক নাম। তবে তদন্ত শেষে এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যাবে।

তিনি বলেন, অর্থদাতাদের আইনের আওতায় আনা সম্ভব হলে জঙ্গি নির্মূল করা সহজ হবে। এ কারণে জঙ্গি অর্থদাতাদের গ্রেফতারে র‌্যাবের অভিযান চলছে এবং চলবে। প্রাথমিকভাবে ৮ জনের সম্পর্কে জানা গেলেও ধারণা করা হচ্ছে এরসংখ্যা আরো বেশি।

জানা গেছে, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে বুধবার রাতে এয়ারপোর্ট রেলওয়ে স্টেশন এলাকা থেকে মাওলানা আব্দুল হাকিম ফরিদী ওরফে সুফিয়ান (৪০), রাজীবুল ইসলাম ওরফে রাজীব ওরফে আহমেদকে (২৯) গ্রেফতার করে। এরপর তাদের দেওয়া তথ্যমতে আদাবরের মোহাম্মদীয়া ক্যাফেতে অভিযান চালিয়ে গাজী কামরুস সালাম ওরফে সোহান ওরফে আবু আব্দুল্লাহ (২৭), মো. সোহেল রানা ওরফে খাদেম ওরফে মোয়াজ্জিন ওরফে সোহেল ওরফে শহীদুল্লাহ (২৩), শেখ মো. আবু সালেহ ওরফে লিটন ওরফে হুরাইয়াকে (৪২) গ্রেফতার করা হয়। এসময় তাদের কাছ থেকে ১টি ৯ এমএম পিস্তল, ২টি ম্যাগজিন, ২০ রাউন্ড গুলি, ১০টি ককটেল, ৫টি ডেটোনেটর, ১ কয়েল তার, ১ কেজি সাদা পাউডার, ২শ গ্রাম বারুদ দেড় কেজি তারকাটা ও বল, ২টি সার্কিট বোর্ড এবং ১৫টি ক্লিপ টাইপ সার্কিট উদ্ধার করা হয়।

এরপর রাতভর তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করলে তারা জঙ্গি সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য দেয়। একে একে বেরিয়ে আসে জঙ্গি অর্থদাতাদের নামের তালিকা। এরমধ্যে ৮জনের সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়। তারা সম্প্রতি ২৮ লাখ টাকা জঙ্গিদের হাতে তুলে দেয়।

অর্থদাতারা হচ্ছে, শামীম, সাইদ, রেজওয়ান, আমিন বেগ, সাইফ, শেলী, জাকির, পলাতক জঙ্গি সাইফুল্লার এক নিকটাত্মীয়। এছাড়া আরো কয়েকজন জঙ্গি নামের তালিকা যাচাইবাছাই করা হচ্ছে। তদন্ত ও গ্রেফতারের স্বার্থে এসব জঙ্গি অর্থদাতাদের সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করতে রাজি হয়নি র‌্যাবের ঊর্ধতন কর্তারা।

এদের মধ্যে, শামীম ১ লাখ ২২ হাজার, সাইদ ২ লাখ ১০ হাজার, রেজওয়ান ৫ লাখ, আমিন বেগ ৩ লাখ, সাইফ ৩ লাখ, শেলী ৪ লাখ ৬৫ হাজার, জাকির ৩ লাখ, জঙ্গি সাইফুল্লার আত্বীয় ৪ লাখ ও নাম অজানা আরো কয়েকজনের কাছ থেকে ২ লাখ ৩ হাজার টাকা আসে। এসব টাকা দিয়ে তারা থানা আক্রমণসহ ভেঙে পড়া নতুন জেএমবির নেটওয়ার্ক পুনরায় চালু করার চেষ্টা করছে।

র‌্যাব কর্মকর্তারা জানান, গত ৮ অক্টোবর গাজীপুর, টাঙ্গাইল ও ঢাকার বাইপাইল-আশুলিয়ায় পৃথক তিনটি জঙ্গি আস্তানায় অভিযানকালে চার জঙ্গি নিহত হয় এবং আব্দুর রহমান নামের অপর এক জঙ্গি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়। পরে আব্দুর রহমানের পরিচয় নিশ্চিত করে র‌্যাব। তার প্রকৃত নাম সারোয়ার জাহান ওরফে শাইখ আবু ইব্রাহিম আল হানিফ। এর আগে পুলিশের অভিযানে নতুন জেএমবি শীর্ষ নেতা তামীম চৌধুরীসহ আরো একাধিক জঙ্গি নিহত হন। এসব ঘটনার পর নতুন জেএমবি সাংগঠনিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। পাশাপাশি কয়েকজন জঙ্গি আত্মসমর্পণ করলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা জঙ্গিদের মনোবল ভেঙে পড়ে।

মুফতি মাহমুদ খান জানান, সম্প্রতি জঙ্গিদের মনোবল ভেঙ্গে পড়ার পর নতুন করে জঙ্গিদের চাঙ্গা করার দায়িত্ব নেন মাওলানা আব্দুল হাকিম ফরিদী ওরফে সুফিয়ান। তিনি বিভিন্নভাবে অর্থসংগ্রহ করে আসছিলো। র‌্যাবের গোয়েন্দারা এসব বিষয়ে তথ্য পাওয়ার পর তাকে গ্রেফতারে অভিযান শুরু করে। মাওলানা আব্দুল হাকিম ফরিদী ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মাদ্রাসায় পড়াশোনা করে। পরে ১৯৯৭ সালে খিলগাওস্থ মাখাবাপুর উলুম মাদ্রাসায় দাওরায়ে হাদিসে (মাস্টার্স সম্মান) সম্পূর্ণ করেন। তিনি একজন ভাল বক্তা ও প্রশিক্ষক ছিলেন । এরআগে পুলিশের হাতে গ্রেফতার জসীমউদ্দিন রাহমানিয়ার মাধোমে সে জঙ্গিবাদে অনুপ্রাণিত হন। এক সময় তিনি আনসারুল্লাহ বাঙলা টিমের শীর্ষ পর্যায়ে চলে যান। জসীম উদ্দিন রাহমানিয়া গ্রেফতার হলে ওই সংগঠনের হাল ধরেন তিনি। এক পর্যায়ে জেএমবির সারোয়ার-তামিম গ্রুপে তার মত একজন বক্তার খুব প্রয়োজন হলে তাকে আধ্যাত্মিক প্রশিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এরপর জেএমবির কর্মীদের জিহাদের জন্য আত্নঘাতি করে তোলার দায়িত্ব দেওয়া হয় তার উপর। এছাড়াও হাবিবুর রহমান শেখ ওরফে তৌহিদ নামে এক অস্ত্র ব্যবসায়ীর কাছ থেকে বিভিন্ন সময়ে নাশকতার কাজে ব্যবহৃত অস্ত্র ও গুলি যোগানোরও ব্যবস্থা করেন। মূলত তিনিই ভেঙ্গে পড়া নিউ জেএমবির হাল ধরেন।

জানা গেছে, গ্রেফতার ৫ জঙ্গির মধ্যে গাজী কামরুস সালাম ওরফে সোহান ওরফে আবু আব্দুল্লাহ পেশায় একজন ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। তার জন্ম যশোরে। সে ২০০৭ সালে মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করে ২০০৮-২০১১ গাজীপুরে ইসলামী ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি থেকে ইলেকট্রিক্যাল এন্ড ইলেকট্রনিক্সে বিএসসি পাশ করে। লেখাপড়া অবস্থায়েই তার কলেজ বন্ধু সিফাতের মাধ্যমে সে জঙ্গিবাদের ঝুঁকে পড়ে। সিফাত চলতি বছরে র‌্যাবের অভিযানে ৬ সহযোগিসহ গ্রেফতার হন। তার মাধ্যেমেই গাজী কামরুল হাতেমবাগে জসীম উদ্দিন রাহমানির মসজিদে যাতায়াত করত। এভাবেই গাজী কামরুল নতুন জেএমবির দলে ঢুকে পড়েন। গাজী কামরুলের দায়িত্ব ছিলো বিভিন্নস্থান থেকে অর্থ সংগ্রহ করা।

গ্রেফতার সোহেল রানা ২০১৫ সালে সারোয়ার-তামিমের দলে যোগ দেয়। সে ঝিনাইদহ শহরের একটি মসজিদের মোয়াজ্জিন হিসেবে কর্মরত ছিল। ঝিনাইদহে জঙ্গিদের নিরাপদ অবস্থানের দায়িত্ব ছিল সোহেল রানার। সেখানে বসেই একটি থানায় হামলার পরিকল্পনা করা হয়। থানা এলাকায় তথ্য সংগ্রহ করার দায়িত্ব দেওয়া হয় শহীদুল্লাহকে।

এছাড়া শেখ মো. আবু সালেহ ওরফে লিটন ওরফে হুরাইরা নতুন জেএমবির কারাতের প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করত। ২০০৩ সালে তিনি কারাত শেখার জন্য কিউকুশান কলাবাগান শাখায় ভর্তি হন। এরপর ২০০৯ সালে তিনি ব্লাক বেল্ট পান। ২০০৬ সালে একটি সভায় মাওলানা হাকিমের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। মাওলানা হাকিম জেএমবির সারোয়ার-তামিম গ্রুপে যোগ দিলে তাকে জেএমবির কারাতে প্রশিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।

রাজীবুল ইসলাম ওরফে রাজীব ওরফে আহমেদ জেএমবির সক্রিয় সদস্য। সে আধা স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র চালনায় বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। মূলত নতুন জেএমবির সদস্যদের অস্ত্র প্রশিক্ষণের দায়িত্ব ছিল তার উপর।

২০১৫ সালে সে মাওলানা হাকিমের মাধ্যমে জেএমবির সারোয়ার-তামিম গ্রুপে যোগ দেয়। এরপর সে সিলেটে অস্ত্র চালানোর ওপর প্রশিক্ষণ নেয়। ঢাকা কলেজ অর্থনীতিতে মাস্টার্স পাশ এই মেধাবী ছাত্র ফাইভ স্টার সিমেন্ট কোম্পানির বিক্রয় প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরত রয়েছে।