মেইন ম্যেনু

৫৭ বছর ধরে একঘরে জওহরলাল নেহরুর আদিবাসী এই ‘স্ত্রী’!

1478174019

সবাই বলে নেহরুর বউ। এই অপবাদে ৫৭ বছর ধরে সমাজচ্যুত আদিবাসী মহিলা। দারিদ্র আর একাকিত্বের লড়াই চালিয়ে ক্লান্ত ওই মহিলা এখন রাহুল গান্ধির শরণাপন্ন। এর আগে রাজীব গান্ধির কাছেও গিয়েছিলেন। রাজীবের হস্তক্ষেপেই DVC-র হারানো চাকরি ফেরত পান। কেন হারিয়েছিলেন DVC-র চাকরি ? সেও সেই একই কারণ। নেহরুর বউ। সালটা ১৯৬২। সে এক দীর্ঘ কাহিনি।

আজ থেকে সাতান্ন বছর আগের কথা। ১৯৫৯ সালের ডিসেম্বর মাস। বুধনি মাঁঝিঞার বয়স তখন কতো হবে। বড়জোর ১৭ বা ১৮। এখনও মনে আছে পরিষ্কার জলের মতো।

-“শীতের সকাল। উত্তুরে হাওয়া বইছে হু হু কইরে। কম্পানি দামোদরের উপর বাঁধ দিছে। তারই কী এক অনুষ্ঠানে মন্ত্রীটন্ত্রী আইসবেক। মন্ত্রী এইলেন বটে। সঙ্গে বাঁধ দিলেন আমার জীবনে। সমাজ থিকে বাইদ গিলাম ওই বাঁধের কারণে।”

আসল ঘটনা DVC-র ড্যাম উদ্বোধনে এসেছিলেন প্রধানমন্ত্রী নেহরু। কিন্তু নেতামন্ত্রীরা যা করে থাকেন আর কী। ১৭ বছরের এক আদিবাসী কিশোরীকে স্টেজে ডেকে, তার হাত দিয়েই উদ্বোধন করিয়েছিলেন ড্যাম। হাতের কাছে ছিল মালা। গলায় দিলেন পরিয়ে। ছবি উঠল পটাপট। চিত্র-সাংবাদিকরা তো সে যুগেও ছিলেন। ছিল না শুধু শিক্ষার আলো। বিশেষত আদিবাসী সমাজে। (আজও আছে কি না সন্দেহ)

(তবে কেউ কেউ বলেন, নেহরু না- প্রধানমন্ত্রীর গলায় মালা পরিয়েছিলেন বুধনিই। নেহরুকে এভাবেই অভ্যর্থনা জানাতে বলেছিল DVC)

নেহরু বুঝতে পারেননি, ওই মালাই কাঁটার হার হয়ে বসবে কিশোরীর গলায়। ওই মালাই তাকে সমাজ থেকে ছুঁড়ে ফেলে দেবে দূরে। ওই মালাই আদিবাসী কিশোরীকে করে রাখবে একঘরে। কিশোরী তখন এই বাংলারই বাসিন্দা।

কিন্তু, কেন ?

ওই ঘটনার পর বুধনির সমাজে বুধনি হয়ে যায় জওহরলাল নেহরুর স্ত্রী । মালা পরিয়েছেন না ? কারণ অবিবাহিত কোনও মেয়ের গলায় কোনও পুরুষ মালা পরানো মানে, সেই মেয়ে ওই পুরুষেরই স্ত্রী। এলাকায় হইহই পড়ে যায়। স্থানীয় পঞ্চায়েত বিষয়টি নিয়ে সালিশি সভা ডেকে বসে। নেহরু তখন অবশ্যই ব্যাক টু দিল্লি। তিনি এসব কিছু শোনেননি।

বুধনিকে ডেকে মাতব্বররা নিদান দেয়, আদিবাসী রীতি অনুযায়ী সে নেহরুর স্ত্রী। আর যেহেতু নেহরু আদিবাসী নন, তাই তার আর গ্রামে থাকা চলে না। অন্য জাতের পুরুষ তাকে বিয়ে করেছে, এই কারণে তার সঙ্গে সম্পর্কও রাখতে পারবে না কেউ। চোখের সামনে অন্ধকার নেমে আসে বুধনির। সেদিনই তাকে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া হয় সমাজ থেকে। করে দেওয়া হয় একঘরে।

বুধনি অবশ্য তখন কাজ করত দামোদর ভ্যালি কর্পোরেশনের ওই ড্যামে। ফলে প্রথম দিকে খাওয়া-পরার অসুবিধা হয়নি। কিন্তু সে সুখও কপালে টিকল না বেশিদিন। ‘৬২ সাল নাগাদ সেখান থেকেও তাকে বের করে দেওয়া হয়। এরপর এরাজ্যের মায়া কাটিয়ে বুধনি চলে যায় বিহারে (অধুনা ঝাড়খণ্ডে)। সেখানেই লড়াই শুরু হয় নতুন করে।

বিহারে গিয়ে সাতবছর ধরে বেঁচে থাকার লড়াই চালিয়ে যায় বুধনি। সেসময় দেখা হয় সুধীর দত্ত নামে এক ব্যক্তির সঙ্গে। আলাপ জমে। বাড়ে ঘনিষ্ঠতা। কিন্তু, ওই যে সমাজ। সামাজিক নিদানের কারণে বিয়ে করতে পারেননি তারা। তবে একসঙ্গে থাকতে শুরু করেন। জন্ম হয় ৩ সন্তানের।

১৯৮৫ সাল। জওহরলাল নেহরুর নাতি, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধি জানতে পারেন বুধনির কথা। ওড়িশায় গিয়ে রাজীব গান্ধির সঙ্গে দেখা করে বুধনি। তার পরে কোনও এক অজ্ঞাত কারণে DVC-র হারানো চাকরি ফিরে পায় সে। প্রায় একরকম ডেকে নিয়ে গিয়ে চাকরি দেয় DVC। নিজের গ্রামে, নিজের লোকেদের কাছে এরপরও বারবার ছুটে গেছেন বুধনি। একটাই আবেদন সমাজ তাকে মেনে নিক। কিন্তু প্রতিবারই ফিরতে হয়েছে খালি হাতে। গ্রামের কাছে, পরিবারের কাছে-আজও সে কুলহারা।

আজ ৭৪ বছর বয়সেও বুধনি জানে না, কোন অপরাধে অপরাধী সে। বার্ধক্য এসেছে শরীরে। কিন্তু, কুলহারা তকমাটা এখনও কুরে কুরে খায় বুধনিকে। ‘নেহরুর স্ত্রী’ হয়ে বেঁচে থাকাটা যে কত যন্ত্রণার, তা বুধনির মুখ দেখে বোঝা না গেলেও, শক্ত চোয়াল তার আভাস দেয়। তার আদিবাসী সমাজ তাকে স্বীকৃতি দেয়নি এখনও। তবে হার না মানা বুধনি নিজের সম্মানরক্ষার লড়াই ছাড়তে নারাজ।

বুধনির এখন দাবি, তার হৃতসম্মান ফিরিয়ে দিক কেউ। কেউ গলায় মালা দিলেই যে কেউ কারোর বউ বা বর হয়ে যায় না, তা সমাজকে বুঝিয়ে দিক কেউ। বুধনি চায়, একটিবার রাহুল গান্ধির সঙ্গে দেখা করে, তার দুঃখের কথা বলতে। চায়, তাকে একটা বাড়ি করে দিক সরকার। তার ছেলেকে একটা চাকরি দেওয়া হোক। যাতে বাকি জীবনটা একটু শান্তি আর সম্মান নিয়ে বাঁচতে পারে। চোখ বুজতে পারে সসম্মানে। ইনান্ডু ইন্ডিয়া।