মেইন ম্যেনু

৬০ বছর ধরে পত্রিকা বিলি করছেন গৌর চন্দ্র পাল

6ae29fc8e62b02c2d63a6110b6b3f5e2-online_kushtia-paper-2

একেবারে তরতাজা তরুণ থাকতে পত্রিকা বিলির কাজ শুরু করেন কুষ্টিয়া শহরের গৌর চন্দ্র পাল। জীবনের পড়ন্ত বেলায় এসে দেখেন, পত্রিকা বিলি করার এই কাজে ৬০ বছর পার হয়ে গেছে।

১৯৫১ সালের কথা! পত্রিকা বিলির সুযোগ পেতে ভারতের লোকসেবক ও স্টেটমেন্ট পত্রিকায় আবেদন করেন গৌর। ২০ দিন পর তাঁর কাছে ট্রেনে করে পাঁচ কপি লোকসেবক পত্রিকা আসে। কুষ্টিয়া রেলস্টেশন থেকে তিনি তা সংগ্রহ করেন। কদিন পর এলাকার আইনজীবী অপূর্ব কুমার নন্দীর (এখন বেঁচে নেই) মাধ্যমে স্টেটমেন্ট পত্রিকাও বিলি করার অনুমোদন পান। নিয়মিতভাবে তাঁর কাছে আসতে থাকে পাঁচটি লোকসেবক ও পাঁচটি স্টেটমেন্ট পত্রিকা। বিভিন্ন গ্রাহকের কাছে বিক্রি করা শুরু করেন পত্রিকাগুলো। সেই শুরু। এরপর থেকে এখনো চলছে।

রোদ-বৃষ্টি-ঝড় বা কনকনে শীত, যা-ই থাকুক না কেন, সব সামলে পত্রিকা ঠিকই পাঠকের দ্বারে পৌঁছে দেন গৌর চন্দ্র। অসুস্থতার কারণে এক বছর ধরে পত্রিকা হাতে নিয়মিত বের হতে পারেন না। তাই বলে দমে যাননি। একটু ভালো বোধ করলেই কয়েকটি পত্রিকা হাতে বেরিয়ে পড়েন। আশপাশের বাসিন্দাদের কাছে বিক্রি করেন।

কুষ্টিয়া শহরের আড়ুয়াপাড়ায় গৌর চন্দ্র পালের বাড়ি। ১৯৩৮ সালে জন্ম। সে অনুযায়ী বয়স এখন ৭৮ বছর। পত্রিকা বিলি করা যেমন তাঁর পেশা, তেমনি পত্রিকা পড়াটা তাঁর নেশা।

কুষ্টিয়া পৌরসভার আড়ুয়াপাড়ার ৩০ নম্বর হেম চন্দ্র লাহিড়ী লেনের রেললাইনের পাশে গৌর চন্দ্র পালের টিনশেডের ঘর। সে ঘরে বসে তাঁর সঙ্গে কথা হয়। টিনের ঘরটিতে একটিই কক্ষ। পৈতৃক সূত্রে এক কক্ষের এই ঘর পেয়েছেন। কক্ষটিতে দৈন্যের ছাপ স্পষ্ট। আসবাব বলতে শুধু একটি খাট। মশারি এক প্রান্তে দড়িতে ঝুলছে। কাপড়চোপড় একটি দড়িতে ঝোলানো। একপাশে কিছু খুচরা তার, প্লাস, নাটবল্টু অগোছালোভাবে রাখা। জানালেন, ফাঁকে ফাঁকে বৈদ্যুতিক মিস্ত্রির কাজও করেছেন। কক্ষের টিনের চালার অ্যাঙ্গেলটি তাঁর নিজের করা। কক্ষে ঢুকলে তাঁর যুবক বয়সের সাদাকালো একটি ছবির দিকে চোখ আটকে যায়। জানালেন, স্বাধীনতার পরপরই ছবিটি তোলা। ছবির নিচে তাঁর নাম, বাবার নামসহ চার পুরুষের নাম লেখা। কক্ষের এক কোণে কিছু পুরোনো পত্রিকা রাখা। জানালেন, যেসব পত্রিকা ভালো লেগেছে, সেসব তিনি সংগ্রহে রেখে দিয়েছেন। এর মধ্যে প্রথম আলোই বেশি। প্রথম আলো তাঁর সবচেয়ে পছন্দের পত্রিকা বলে হাসিমুখে জানালেন। তা ছাড়া এই পত্রিকার সঙ্গে তাঁর আনন্দের কিছু স্মৃতি জড়িত। প্রথম আলোর বিশ্বকাপ কুইজে অংশ নিয়ে গাড়ি জিতেছিলেন। প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক কবি ও কথাসাহিত্যিক আনিসুল হক এবং অভিনেত্রী তিশার হাত থেকে গাড়ির চাবি নেওয়ার ছাপা হওয়া ছবিটি যত্ন করে রেখে দিয়েছেন। জানালেন, ওই গাড়ি চার লাখ টাকায় বিক্রি করেছিলেন।

গৌর চন্দ্র পাল বললেন, পুরস্কারভাগ্য তাঁর খুবই ভালো। বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকের কুইজ প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে তিনি টেলিভিশন, মুঠোফোন, ক্যাসেট প্লেয়ারসহ বিভিন্ন পুরস্কার জিতেছেন।

বিছানায় বসে পত্রিকার হকারির জীবনের কথা বেশ আনন্দ নিয়ে বলা শুরু করলেন ৭৮ বয়সী চিরকুমার গৌর চন্দ্র পাল। তিনি জানান, শুরুতে হেঁটে পত্রিকা বিলি করেছেন। পরবর্তী সময়ে সাইকেল ব্যবহার করেন। সাইকেলের সামনে লেখা ছিল ‘বার্তা কেন্দ্র, সংবাদপত্র পরিবেশক, দৈনিক সংবাদপত্র সরবরাহকারী’। এখন এই সাইনবোর্ডটি বাড়ির সামনে দরজার পাশে লাগিয়ে রেখেছেন, যাতে মানুষ বাড়িটি চিনতে পারে।

১৯৬৩ সালে কুষ্টিয়া শহরের ইউনাইটেড (বর্তমানে কুষ্টিয়া হাইস্কুল) স্কুল থেকে ম্যাট্রিক (বর্তমানে এসএসসি) পরীক্ষা দিয়েছিলেন গৌর চন্দ। পাস করেছিলেন কি না, সে খবর নেওয়া হয়নি। তাঁর বাপ-দাদারা মিষ্টির ব্যবসা করতেন। সেদিকে যেতে মন চায়নি তাঁর। একদিন পত্রিকা দেখে তিনি সেটি বিলি করার জন্য আগ্রহ দেখান। পাড়ার মদন মোহন পাল নামের এক ব্যক্তির মাধ্যমে ভারতের তৎকালীন পত্রিকা লোকসেবকে যোগাযোগ করেন। সেটি ছিল ১৯৫১ সাল।

গৌর চন্দ্র পাল জানালেন, শহরের আদালতপাড়ার আইনজীবী ও প্রভাবশালী দু-একজন পত্রিকা পড়তন। দাম ছিল এক বা দুই আনা। ইংরেজি কাগজ আইনজীবীরা বেশি পড়তন। প্রতিদিন বিকেলে পত্রিকা ট্রেনে করে আসত। সন্ধ্যায় বা তাঁর পরের দিন বিলি করা হতো বলে জানালেন গৌর চন্দ্র।

এরপর ১৯৬০ সালের দিকে দৈনিক আজাদ পত্রিকা আসতে থাকে। পাকিস্তানের ডন, উর্দু ভাষার জং, মাশরিক, হুরিয়াত পত্রিকা আসে। মাসিক সিনেমা পত্রিকা, নূরহাজান পত্রিকাও বিলি করেন। ব্রিটিশ পত্রিকা মিররও আসতে থাকে। উর্দু পত্রিকাগুলো এলাকার বিহারিরা বেশি পড়তেন। এ ছাড়া মর্নিং নিউজ ও দৈনিক করাচি পত্রিকা গ্রাহকের কাছে পৌঁছে দিতেন তিনি।

স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় তিনি পরিবার নিয়ে ভারতে চলে গিয়েছিলেন। দেশে ফিরে আবারও পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত হন। সে সময় ইত্তেফাক, আজাদ পত্রিকা বিলি করেন। পত্রিকা বিলি শেষে শহরের একমাত্র সিনেমা হলে অপারেটরের কাজ করতেন। সেটা ১৯৭৩-৭৪ সালের দিকের কথা।

শহরের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি অফিস, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্কুল-কলেজ, দোকানপাটসহ বিভিন্ন স্থানে পত্রিকা বিলি ও বিক্রি করে কেটে যেত দিনের পাঁচ-ছয় ঘণ্টা সময়। পত্রিকা বিক্রি করে মাস শেষে যা আয় করেছেন, তা পরিবারে ব্যয় করেছেন।

এখন কীভাবে চলেন? প্রশ্ন করতেই বললেন, জমানো অল্প কিছু টাকা দিয়ে চলছেন। বয়স হয়ে গেছে। রান্না করতে পারেন না। খাওয়াদাওয়া সারেন ভাইয়ের ছেলের বাড়িতে।

প্রবীণ হকার হিসেবে গৌর চন্দ্র বেশ পরিচিত বলে জানালেন সংবাদপত্র হকার্স ইউনিট কুষ্টিয়ার সভাপতি জামাল উদ্দীন। তিনি বলেন, ‘গৌরচন্দ্র পাল অনেক দিন ধরে পত্রিকা বিলি করেছেন। তাঁর মতো প্রবীণ হকার কুষ্টিয়ায় নেই। গত বছর অসুস্থতার কারণে তিনি নিয়মিত পত্রিকা বিলি বন্ধ করলেও মাঝেমধ্যে আমার কাছ থেকে কয়েকটি প্রথম আলো নিয়ে বাড়ির আশপাশের এলাকায় হেঁটে হেঁটে বিলি করেছেন।’ কুষ্টিয়া থেকে প্রকাশিত পুরোনো সাপ্তাহিক ইস্পাতের সম্পাদক প্রবীণ সাংবাদিক ওয়ালীউল বারী চৌধুরী বললেন, বলতে গেলে গৌর চন্দ্র পাল কুষ্টিয়ার প্রবীণ হকার। বর্তমানে তাঁর চেয়ে প্রবীণ কেউ নেই।’খবর প্রথম আলো’র।