মেইন ম্যেনু

৮০ টাকার পুঁজি নিয়ে দেশসেরা করদাতা

kausra1478254259

প্রথম জীবনে ব্যবসায় তার পুঁজি ছিল মাত্র ৮০ টাকা। ব্যবসায়ীক সাফল্যে আজ তিনি দেশের সেরা কর দাতাদের একজন। দেশের নামি-দামি গ্রুপ অব কোম্পানির কর্ণধারদের পেছনে ফেলে এ তালিকায় শীর্ষে রয়েছেন তিনি। জীবনে সঠিক পরিকল্পনা, দীর্ঘ প্রচেষ্টা এবং কঠোর পরিশ্রমী হলে যে ভাগ্যলক্ষ্মী ধরা দেয় এর প্রমাণ রেখে চলেছেন হাকিমপুরী জর্দা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার হাজী মো. কাউছ মিয়া। প্রথম বারের মতো জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) কর্তৃক ঘোষিত ২০১৫-১৬ করবর্ষে সেরা ১০০ জন করদাতার তালিকায় সবার উপরে রয়েছে তার নাম। তিনি রাজধানীর কর অঞ্চল-২ এর সার্কেল-২৭ এর নিয়মিত করদাতা।

সেরা করদাতাদের তালিকায় কাউছ মিয়ার নাম এবারই প্রথম নয়। এর আগে ২০১৪-১৫, ২০১৩-১৪ ও ২০১২-১৩ করবর্ষসহ ব্যক্তি জীবনে মোট ১০ বার সেরা করদাতার তালিকায় নাম লিখিয়ে পুরস্কৃত হয়েছেন তিনি। এর মধ্য ৯ বার সর্বোচ্চ ক্যাটাগরীতে পুরস্কার পেয়েছেন। একবার দীর্ঘমেয়াদি ক্যাটাগরীতে পুরস্কৃত হয়েছেন। শুধু তাই নয়, পাকিস্তান আমলেও ১৯৬৭ সালে তিনি শীর্ষ করদাতা হিসেবে পুরস্কৃত হয়েছেন। তিনি টানা তিনবারসহ সব মিলিয়ে ১০ বার সেরা করদাতা হিসেবে পুরস্কৃত হয়েছেন।

১৯৫০ সালে মায়ের কাছ থেকে নেওয়া মাত্র ৮০ টাকার পুঁজিতে ব্যবসা শুরু করেন কাউছ মিয়া্। শুরু হয় জীবন সংগ্রাম। ব্যবসার পরিসর বাড়াতে টাকার প্রয়োজন হলে পুনরায় মায়ের শরণাপন্ন হন। মা তাকে আরো কিছু টাকা দেন। সব মিলিয়ে আড়াই হাজার টাকায় কাউছ মিয়া চাঁদপুর শহরের পুরান বাজার ট্রাঙ্ক পট্টিতে ৩ টাকা মাসিক ভাড়ায় স্টেশনারি দোকান দেন। এখান থেকেই মূলত তার ব্যবসায়ীক প্রসারের সূচনা। কয়েক বছরের লাভের টাকা দিয়ে এক এক করে ৬টি দোকানের মালিক হন তিনি। এ সময় তিনি লজেন্স, বিস্কুট, বিড়ি, সিগারেট, পাওরুটি ফ্যাক্টরি ও সাবানের সোল এজেন্ট হিসেবে ব্যবসা পরিচালনা করেন।

কাউছ মিয়া নারায়ণগঞ্জের নিতাইগঞ্জে তামাকের ব্যবসা শুরু করেন ১৯৫৫ সালে। ব্যবসা লাভজনক হতে থাকলে ১৯৫৮ সাল থেকে কর দেওয়া শুরু করেন। তবে আজকে যে পণ্যের কারণে তিনি সমধিক পরিচিত সেই হাকিমপুরী জর্দার ব্যবসা শুরু করেন আরো পরে। সাল ১৯৭৬। সে বছর ঢাকায় জব্বার কেমিক্যালের ব্যানারে এই ব্যবসার সূচনা। প্রথমে একটা ছোট কারখানা দিয়ে `শান্তিপুরী জর্দা` নামে এটি বাজারজাত করেন। পরে পণ্যটি নকল হতে থাকায় ১৯৯৬ সালে `হাকিমপুরী জর্দা` নামে এটি বাজারজাত করতে থাকেন।

কাউছ মিয়ার পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, ৩-৪ জন শ্রমিক দিয়ে শুরু হয় হাকীমপুরী জর্দার ব্যবসা। ৬৬ বছর ধরে ব্যবসা করছেন তিনি। এর মধ্যে তামাক ও জর্দার ব্যবসা থেকেই সবচেয়ে বেশি লাভ করেছেন। ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত এটি কুটির শিল্প হিসেবে বিবেচিত ছিল। কিন্তু ১৯৯৯ সালের জুনে জর্দার ওপর ভ্যাটারোপ করা হয়। ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত বছরে হাকীমপুরী জর্দা সরকারকে ভ্যাট দিতো ৩০-৩৫ হাজার টাকা। বর্তমানে প্রতি মাসে ভ্যাট দিচ্ছে ৪০-৪৫ লাখ টাকা। প্রতি মাসে প্রায় ৭ লাখ হাকীমপুরী জর্দা বিক্রি হচ্ছে!

কাউছ মিয়া আজ পর্যন্ত ব্যাংক থেকে ঋণ নেননি। বরং তার দাবি, তার রাখা এফডিআর থেকে কয়েকটি ব্যাংকের শাখা চলে। ৮৬ বছর বয়সি কাউছ মিয়ার জন্ম ১৯৩১ সালের ২৬ আগস্ট। বাবা আলহাজ আব্বাস আলী মিয়াও ছিলেন ব্যবসায়ী। ১১ ভাই ১ বোনের মধ্যে তিনি সপ্তম। ব্যক্তি জীবনে ৮ম শ্রেণি পর্য্ন্ত পড়াশোনা করেছেন। এরপর আর পড়াশোনা করা সম্ভব হয়নি। এ প্রতিবেদকের কথা হয় কাউছ মিয়ার ছেলে সুমনের সঙ্গে। সুমন বলেন, ‘আমার বাবা হাজী মো. কাউছ মিয়া ১৯৫০ সালে স্টেশনারি দোকান দেন। সেখান থেকে আজ এ পর্য্ন্ত এসেছেন। দেশের উন্নয়নের অংশিদার হয়ে নিয়মিত কর দিচ্ছেন। ব্যক্তি জীবনে এ পর্য্ন্ত ১০ বার সেরা করদাতার তালিকায় তার নাম ছিল। শুধু তাই নয়, বাবা টানা তৃতীয় বারের মতো সর্বোচ্চ করদাতা হয়েছেন। দেশের প্রতি তার অসীম ভালোবাসা। এজন্য আমরা গর্বিত।’

এবার এনবিআর ঘোষিত নারী-পুরুষ নির্বিশেষে ১০০ সেরা করদাতার তালিকায় দ্বিতীয় থেকে সপ্তম স্থানে আছেন একই পরিবারের ৬ সদস্য। ড্রাগ ইন্টারন্যাশনাল পরিবারের সদস্য খাজা তাজমহল সেরা করদাতার দ্বিতীয় স্থানে, তৃতীয় স্থানে রুবাইয়াত ফারজানা হোসেন, এরপর যথাক্রমে লায়লা হোসেন, হোসনে আরা হোসেন, এম এ হায়দার হোসেন এবং সপ্তম স্থানে আছেন মোহাম্মদ ইউছুফ। তালিকায় অষ্টম স্থানে রয়েছেন পুরান ঢাকার ব্যবসায়ী প্রকৌশলী খন্দকার বদরুল হাসান। নবম স্থানে আছেন সার ব্যবসায়ী ও সংসদ সদস্য কামরুল আশরাফ খান ও দশম স্থানে আছেন সংসদ সদস্য ও গাজী গ্রুপের কর্ণধার গোলাম দস্তগীর গাজী।

একইভাবে প্রথমবারের মত ২০১৫-১৬ করবর্ষে সেরা তরুণ করদাতা (বয়স অনুর্ধ্ব ৪০) তালিকা করেছে এনবিআর। এ তালিকায় শীর্ষে রয়েছেন কবির হোসেন শিমুল। এনবিআর প্রথমবারের মতো সেরা মহিলা করদাতাদের তালিকাও তৈরি করেছে। এ তালিকার প্রথম স্থানে রয়েছেন খাজা তাজমহল। উল্লেখ্য যে, ব্যক্তি ক্ষেত্রে কমপক্ষে সাড়ে ৪ কোটি টাকার কর প্রদান করলে সেরা করদাতার সম্মাননার জন্য মনোনীত হওয়া যায়।